বকেয়া পৌরকর আদায়ে কাউন্সিলরদের সহায়তা নেবেন মেয়র, তালিকা প্রেরণ

৫৭টি সংস্থার সঙ্গে বৈঠক : মন্ত্রণালয়ে বাজেট করার আগেই বরাদ্দ চেয়ে চিঠি দেয়ার প্রস্তাব

আজাদী প্রতিবেদন

সোমবার , ৮ জানুয়ারি, ২০১৮ at ৪:৩৮ পূর্বাহ্ণ
115

বকেয়া পৌরকর আদায়ে কাউন্সিলরদের সহায়তা নিচ্ছেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। এই লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে যাদের পৌরকর বকেয়া রয়েছে তাদের একটি তালিকা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। মেয়র বলেন, ‘এ তালিকা ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের কাছে পাঠানো হয়েছে। কাউন্সিলররা যেহেতু জনপ্রতিনিধি তাই তাদের এ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কাউন্সিলররা উনাদের (যাদের পৌরকর বকেয়া রয়েছে) ডেকে এনে বকেয়া পৌরকর পরিশোধ করার অনুরোধ করবেন। কারণ আমরা চাচ্ছি না, একবারেই হার্ডলাইনে যেতে। এরপরেও যদি কেউ পৌরকর পরিশোধ না করেন তাহলে হয়তো পরবর্তীতে আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। ট্যাক্স দেয়ার কালচারটা চালু করতেই হবে। এটা ছাড়া চট্টগ্রামের কাঙিক্ষত উন্নয়ন বা পরিকল্পিত উন্নয়ন করা সম্ভব হবে না।’ বকেয়া পৌরকর নিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আয়োজিত বৈঠকে এসব কথা বলেন তিনি। গতকাল সকাল সাড়ে ১১ টায় নগর ভবনে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে পৌরকর পাবেন এমন সরকারি ৫৭টি সংস্থাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল চসিকের রাজস্ব বিভাগ। মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রাহমান বকেয়া পৌরকর সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করেন।

বৈঠকে উত্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯ মন্ত্রণালয়ে ৫৭ প্রতিষ্ঠানের কাছে ১১৮ কোটি ৯৬ লাখ ২৩ হাজার ৬৩৫ টাকা পৌরকর পাবে চসিক। এর মধ্যে ২০১৬২০১৭ অর্থ বছর পর্যন্ত বকেয়া আছে ১১০ কোটি ৬৫ লাখ ৪৯ হাজার ৯১৫ টাকা। চলতি অর্থ বছরের (২০১৭২০১৮) দাবি ৮৩ লাখ ৭৩ হাজার ৭২০ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পৌরকর বকেয়া আছে রেল মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পূর্ব রেলের কাছে। পূর্ব রেলের কাছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন চলতি অর্থ বছর পর্যন্ত (২০১৭২০১৮) ৮৬ কোটি ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৮৫ টাকা পৌরকর পাবে।

বৈঠকে উপস্থিত পূর্ব রেলের প্রতিনিধি প্রকৌশলী লিয়াকত বলেন, সম্প্রতি বকেয়া করের বিপরীতে ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া তিনি দাবি করেন, ‘এসেসমেন্টে রেলের যে স্থাপনার তালিকা করা হয়েছে সেখানে তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই এমন স্থাপনাগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসময় তিনি রেল ও সিটি কর্পোরেশন যৌথভাবে যেন এসেসমেন্ট করে সে প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, যেখানে সমস্যা সেখানে দু’পক্ষের প্রতিনিধি মিলে এসেসমেন্ট করা দরকার।’

এসময় চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রেলওয়ের প্রতিনিধিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনাদের সংস্থার কারণেই আমাদের পারফরমেন্স খারাপ হচ্ছে।’ তিনি বকেয়া পরিশোধে মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ চেয়ে পত্র দেয়ারও পরামর্শ দেন।

চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সামুদ্দোহা বলেন, ‘আপনারা মন্ত্রণালয়ে লিখছেন না কেন? টাকা তো আমার বা আপনার না। আপনারা লিখেন। ওই চিঠির কপি দিবেন। আমরাই তদবির করবো।’ তিনি আরও বলেন, ‘এবার না হয় স্থাপনার ক্ষেত্রে সমন্বয়ের কথা বলছেন। এত বছর দেন নি কেন। এত বছরের গুলো কিভাবে এসেসমেন্ট করা হবে?’

তখন চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘আপনাদের সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যানও তো ক্ষুব্ধ। উনি বলেছেন, আপনারা লিখলে ব্যবস্থা নিবেন। আপনারা লিখেন না কেন? ’

বৈঠকে জেলা পরিষদের সচিব সাব্বির ইকবাল জানান, ৩টি সার্কলের মাধ্যমে চসিক পৌরকর দাবি করে। একটি সার্কেল ছাড়া বাকিগুলো দেয়া হয়েছে। যে সার্কেলে দেয়া হচ্ছে না ওই সার্কেলে ডাক বাংলো রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ডাক বাংলোর পৌরকর দেয়া যাবে না।

কালুরঘাটস্থ চট্টগ্রাম বোর্ড মিল, এফআইডিসি এর প্রতিনিধি জানান, ’৯৪ সাল থেকে তাদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ। তাই পৌরকর দেয়া সম্ভব নয়। চসিকের দাবি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির কাছে ৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা পৌরকর বকেয়া আছে। বিভাগীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের প্রতিনিধি জানান, প্রধান প্রকৌশলীর কাছে চাহিদা পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে পরিশোধ করা হবে। উপস্থিত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, তারাও মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ চেয়ে চাহিদাপত্র দিয়েছেন। বরাদ্দ পেলে পরিশোধ করবেন।

বৈঠকে চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জানান, চমেক হাসপাতালের কাছে পৌরকর বকেয়া আছে ৯ কোটি ৯৭ লাখ ৪৬ হাজার ৪৭ টাকা। এ বিষয়ে আপত্তি আছে জানিয়ে চমেকের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জালাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের স্টাফ এবং আপনাদের স্টাফ মিলিয়ে দেখবেন। চমকের অধ্য ডা. সেলিম জাহাঙ্গীর বলেন, ‘বকেয়া কর আমরা পরিশোধ করেছি। কিন্তু এখন এত টাকা কিভাবে আসল?’ এ সময় মেয়র বলেন, ‘আপত্তি থাকলে আবার দেখতে পারেন।’ বৈঠকে টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ও বিজ্ঞান উন্নয়ন কেন্দ্রের পক্ষে একজন প্রতিনিধি বকেয়া ১৩ লাখ ১৭ হাজার ৫৭ টাকার একটি চেক হস্তান্তর করেন মেয়রের কাছে। বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশনের প্রতিনিধি জানান, ‘২০০৭ সাল থেকে কার্যক্রম নেই। সামর্থ্য নেই তাই দিতে পারছি না।’ তখন চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা প্রশ্ন করেন, ‘বর্তমানে সচল নাকি অচল।’ এর উত্তরে প্রতিনিধি বলেন, ‘অচল বলা যেতে পারে।’ প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশনের কাছে ১৮ রাখ ৯৪ হাজার পৌরকর বকেয়া রয়েছে।

এদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কি কথা হয়েছে বা বৈঠকের অর্জন সম্পর্কে জানতে চাইলে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা চিঠি দেয়ার পর অনেকে বকেয়া পৌরকর পরিশোধ করেছেন। আজকেও একটি প্রতিষ্ঠানের বকেয়া ১৩ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কমিটমেন্ট করেছে, তারা মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দের জন্য লিখেবেন। কেউ কেউ অতিসত্বর পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আমি মনে করি, আজকে যে বৈঠক করেছি তার ইতিবাচক একটা সুফল অতিসত্বর আমরা পাব।’

মেয়র বলেন, ‘উনাদের মন্ত্রণালয়ের (সরকারি সংস্থাগুলোর) বাজেট করার আগেই যেন বরাদ্দ চেয়ে লিখেন সে বিষয়ে বলেছি। কারণ অনেক প্রতিষ্ঠান যথাসময়ে উদ্যোগ না নেয়ার কারণে বকেয়া পরিশোধ করতে পারেনি। এখানে একটি বিষয়, এই যে বকেয়াগুলো আছে সেগুলো শুধু আমার আমলের না। কয়েক বছর আগেরও বকেয়া আছে। ১০ বছর আগের বকেয়াও আছে। আমরা চাচ্ছি সেগুলোসহ আদায় করতে। যেসব বকেয়া নিয়ে বিভাজন আছে সেগুলো নিষ্পত্তি করতে। আমরা সরকারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে শুরু করেছি। পর্যায়ক্রমে সবার সঙ্গে বসব। আমরা চাচ্ছি, সবাই যেন আইন অনুযায়ী পৌরকর পরিশোধ করেন তেমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সিটি কর্পোরেশনের যে দায়িত্ব সেটা বাস্তবায়ন করতে গেলে অবশ্য টাকার প্রয়োজন। টাকা ছাড়া তো সে কাজগুলো আমরা করতে পারব না। এখন সিটি কর্পোরেশন করছে না বলে সমালোচনা করলে হবে না। করার জন্য তো সহায়তা করতে হবে। পৌরকর পরিশোধ করতে হবে।’ এসময় মেয়র যাদের পৌরকর দেয়া উচিত বা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও দিচ্ছে না তাদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করার জন্য মিডিয়াকেও সহযোগিতা করার অনুরোধ জানান।

নগরবাসীর দেয়া পৌরকরের গুরুত্ব তুলে ধরে মেয়র বলেন, ‘প্রতি বছর শুধু খালনালা থেকে মাটি উত্তোলন করতে গিয়েই আমাদের ৮/১০ কোটি টাকা খরচ হয়ে যায়। এর বাইরে আমরা কিছু অতিরিক্ত সেবা দিয়ে থাকি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা খাতে ভর্তুকি দিয়ে থাকি। এই সেবাগুলো কিভাবে অব্যাহত রাখব। তাছাড়া আমরা বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করছি। সেখানে ম্যাচিং ফান্ড দিতে হয়। সরকার দিচ্ছে ৮০ পার্সেন্ট। আমাদের ২০ পার্সেন্ট দিতে হয়। এই ২০ পার্সেন্ট যদি যোগাড় করতে না পারি সেক্ষেত্রে তা প্রকল্প পাওয়ার ক্ষেত্রে তো একধরনের বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এই বাস্তবতাটুকু সবার বুঝতে হবে। এক সময় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন থেকে প্রকল্প নেয়া হতো না। আমি মনে করি, বাস্তবতার কারণেই নেয়া হতো না। ম্যাচিং ফান্ড কোত্থেকে দিবে? তবে বর্তমানে আমরা অনেকগুলো প্রকল্প অনুমোদন করিয়েছি। বাস্তবায়ন পর্যায়ে আছে অনেকগুলো।’

মেয়র আরো বলেন, ‘নাগরিক সেবা নিশ্চিতে আমাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অবশ্যই নগরবাসীর এগিয়ে আসতে হবে। যেভাবে অন্যান্য খাতগুলোর বিল যেমনগ্যাস পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন সেভাবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সরকার নির্ধারিত পৌরকরও পরিশোধ করবেন।’ তিনি বলেন, ‘দেশের আইন অনুযায়ী যাদের উপর পৌরকর প্রযোজ্য এবং আইন অনুযায়ী যাদের উপর পৌরকর ধার্য করা হয়েছে তারা যেন নাগরিক দায়িত্ব নিয়ে ট্যাক্স প্রদান করার জন্য আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসেন। এ বিষয়ে আমি সরকারিবেসরকারি ও স্বায়িত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি।’

রাজস্ব আদায়ে গতিশীলতা আনার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামসুদ্দোহা, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান, প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা নাজিয়া শিরিন, প্রধান প্রকৌশলী লে. কর্ণেল মহিউদ্দিন আহমদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

x