বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সাফল্য সর্বোচ্চ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে

সোমবার , ১৪ মে, ২০১৮ at ৫:৫১ পূর্বাহ্ণ
90

মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন সফল হল বাংলাদেশের। বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে বিরল এই সম্মান অর্জন করল বাংলাদেশ। হাজারও জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে, সকল আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণিত করে গত শুক্রবার বাংলাদেশ সময় রাত ২টা ১৪ মিনিটে এদেশের মানুষের স্বপ্নের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ডানা মেলে মহাকাশে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার উৎক্ষেপণ স্টেশন থেকে ৩৬ হাজার কিলোমিটারের দূরের নিজস্ব কক্ষপথে ছুটে যায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। বাংলাদেশের ইতিহাসে যোগ হয় সাফল্যে আরো একটি দিকচিহ্ন।
মহাকাশ অভিযানে কেবল ধনী ও প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর দেশ নয়, বরং প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া দেশও অংশ নিচ্ছে। কারণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এখন কোন একটা বা দুটা দেশে সীমাবদ্ধ নেই। আন্তঃরাষ্ট্রীয় যোগাযোগ ও সহযোগিতায় বিশ্বের নানা দেশ যৌথভাবে এখন মহাকাশ অভিযানে অংশ নিচ্ছে। মঙ্গলগ্রহে পাঠানো হচ্ছে মানুষহীন মহাকাশ যান। নিকট ভবিষ্যতে মঙ্গলপৃষ্ঠে পদচিহ্ন রাখবে মানুষ। মনে করা হচ্ছে, মঙ্গলগ্রহ হতে পারে মানবজাতির দ্বিতীয় বাসস্থান বা আবাসভূমি। শনি গ্রহের উপগ্রহ টাইটানে জীবনের সন্ধান করছেন বিজ্ঞানীরা। বসবাসেরও স্বপ্ন দেখছেন ও দেখাচ্ছেন। মিশন পাঠানো হয়েছে প্লুটোতেও। বাংলাদেশও যুক্ত হলো মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর উৎক্ষেপণে সাফল্য লাভ করে। এটি হচ্ছে, সৌরজগতে লাল-সবুজ পতাকা ওড়ানোর প্রথম পদক্ষেপ, একটি মাইলফলক ও স্বপ্নময় অভিযাত্রার সূচনা। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে রেকর্ড সংখ্যক স্যাটেলাইটের সফল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করছে পাশের দেশ ভারত। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার ভারতের সহায়তা নিতে পারে। এ সংক্রান্ত দক্ষ জনবল তৈরি থেকে শুরু করে লাভজনক ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও আয়ত্ত করা সম্ভব।
৫ হাজার কোটি টাকার অনুমোদিত মূলধন নিয়ে ‘বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি’ লিমিটেড গঠন করা হয়েছে স্যাটেলাইট ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করার জন্য। শান্তিকালীন সময়ে যোগাযোগ, ইন্টারনেট সেবা, স্পেস রিসার্চ, আবহাওয়ার পূর্বাভাসসহ নানা কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব এর মাধ্যমে। তবে এজন্য প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা। জানা যাচ্ছে, এ উপগ্রহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অংশ থেকে মিয়ানমার, ভারত, পাকিস্তান ও আফ্রিকার কিছু দেশ পর্যন্ত ‘কভারেজ’ করতে পারবে। দেশীয় ব্যবহারের পরও মোট ক্ষমতার প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যান্ড উইডথ ফাঁকা থাকবে, যা দেশে কিংবা বিদেশে বিক্রি করা যাবে। এটিকে লাভজনক করতে হলে এখনই পরিকল্পনা তৈরি করা দরকার। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা, টেলিমেডিসিন সেবা ও দূর নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রসারের ক্ষেত্রে একে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা আগেই গ্রহণ করা উচিত। স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণের ও বিপণনের কাজটি করতে হবে দক্ষতার সঙ্গে। এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে হবে।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট স্থাপনের মাধ্যমে স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য আমাদের অন্য কোন দেশের ওপর আর নির্ভরশীল হতে হবে না। বর্তমানে দেশের সব স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে স্যাটেলাইট ভাড়া করে সম্প্রচার চালাচ্ছে। ফলে ভাড়া বাবদ অনেক অর্থ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিটিআরসি’র উচিত হবে টিভি চ্যানেলগুলোর কর্তৃপক্ষকেও এর সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে অবগত করা এবং আনুমানিক কবে নাগাদ বঙ্গবন্ধু চ্যানেলের মাধ্যমে সম্প্রচার প্রক্রিয়া চালানো সম্ভব হবে তার একটা আগাম বার্তা পৌঁছে দেওয়া। কারণ প্রতিটি টিভি চ্যানেলই কোন না কোন স্যাটেলাইট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ। বেশির ভাগ চুক্তির মেয়াদ দুই থেকে পাঁচ বছর। বিটিআরসি’র আরো একটি কাজ করতে হবে, সেটি হচ্ছে এমনভাবে মূল্য নির্ধারণ করা, যাতে ব্যবহারকারীরা লাভবান হতে পারে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট দুর্যোগ মোকাবেলা ও ব্যবস্থাপনায় অনেক ভূমিকা রাখবে। এছাড়া জাতীয় নিরাপত্তার কাজেও এ স্যাটেলাইটকে কাজে লাগানো যাবে। আশা করি, ব্যয়বহুল এ প্রকল্পের যথাযথ ও পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করা হবে।

x