বর্ষা ঝুঁকিতে লাখো রোহিঙ্গা কাটা হচ্ছে ৩৩ টি পাহাড়

জাবেদ ইকবাল চৌধুরী, টেকনাফ

বুধবার , ২৫ এপ্রিল, ২০১৮ at ৫:৩৮ পূর্বাহ্ণ
27

আসান্ন বর্ষা মৌসুমে মারাত্মক বিপর্যয়ে পড়তে পারে পাহাড়ে বসবাসরত রোহিঙ্গারা। মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গা টেকনাফ ও উখিয়ার বেশ কিছু পাহাড়ের উচু পাদদেশে বসবাস করছে। এসব পাহাড় কেটে ও ন্যাড়া করে ঝুপড়ি ঘর তৈরী করেছে তারা। প্রশাসন বলছে ঝুঁকি মোকাবেলায় সব প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে অধিক ঝুঁকির মধ্যে থাকা রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নিতে প্রায় ৫’শ একর বনভূমি চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: নিকারুজ্জামান চৌধুরী। তবে বন বিভাগ বলছে সব অলিখিতভাবেই দখলের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বাস্তবায়ন চলছে।

মিয়ানমারে রাখাইনে জাতিগত সহিংসতার জের ধরে গত বছর ২৫ আগস্টের পর থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে কক্সবাজার জেলার দুটি উপজেলাতে। এ দুই উপজেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চল ছাড়াও পাহাড়গুলো কেটে মরুভূমিতে পরিণত করা হয়। পাহাড়াগুলোতে গড়ে তুলেছে বসতি। এনজিওগুলো তৈরী করেছে রোহিঙ্গাদের জন্য টয়লেট, স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ। বন ভুমিতে তৈরী করা হয়েছে হাসপাতাল, অফিস, বাজার থেকে শুরু করে সবকিছু। কিন্তু গড়ে তোলা হয়নি আশ্রয় কেন্দ্র। এখানে বসবাস করছেন দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। এর মধ্যে দেড় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে। এরা পাহাড়ের চূড়ায় ও ঢালু বা নিম্নাঞ্চলে বসবাস করছেন। ভারী বর্ষনে তাদের ভূমিধস ও বন্যায় পহ্মাবিত হওয়ার মারত্নক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এরা। উখিয়া উপজেলা প্রশাসন ইতিমধ্যে এক লাখ রোহিঙ্গাকে চিহ্নিত করেছে , যারা কি না অধিক ঝুঁকিতে বসবাস করছে। তাদেরকে ইতিমধ্যে সরিয়ে নেওয়ার কাজও শুরু করেছে। এ ছাড়া ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রস্তুত করা হচ্ছে প্রায় ৫’ একর বনভূমি।

গত শনিবার (২১ এপ্রিল) উখিয়ার বালূখালী, কুতুপালং ও মধুছড়ার পশ্চিম পাহাড়ে গিয়ে দেখা ৩৩ টি পাহাড় কেটে সমান করা হচ্ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসুচি (ডব্লিউএফপি) ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) ব্যানারে তৈরী করা হচ্ছে মাটি ভরাট, রাস্তা নির্মাণ ও স্থাপনা তৈরীর কাজ। প্রতি পাহাড়ে একজন মাঝি ও ৫০ জন রোহিঙ্গা শ্রমিক দৈনিক ৪ শত টাকায় পাহাড় কাটার কাজ করছে। পাহাড় কাটার কাজ তদারকি করছে ডব্লিউএফপি কার্য সহকারী হাফেজ ছালেহ। তবে এ বিষয়ে তিনি কথা না বলে এড়িয়ে যান। এ ছাড়া আইওএম সেখানে ৪০/৫০ টি মাটি কাটার গাড়ি ব্যবহার করে সাবাড় করছে পাহাড়। একটি সুত্রে জানা গেছে কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা রোহিঙ্গাদের আসন্ন ঝুঁকি মোকাবেলার নামে প্রায় ৮৪ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকারি পাহাড় কেটে সমতল ভূমি তৈরী করে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসুচির কমিউনিকেশন অফিসার শেলি টাকরাল বরেন, আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকি মোকাবেলায় নির্ধারিত স্থাপনা নির্মাণ কাজ দ্রুতগতিতে চলছে। তিনি সরকারের দুর্যোগ মোকাবেলায় গৃহীত উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, বিপন্ন রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া এবং পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে সাথে নিয়ে সমস্যা সমাধানে অনেক দূর এগিয়েছে বাংলাদেশ। বিভিন্ন সংস্থা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ঝুঁকি মোকাবেলা, খাদ্য নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করছে।

পাহাড় কাটা বিষয়ে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো: আলী কবির জানান, রোহিঙ্গারা এ পর্যন্ত কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের ৫ হাজার ৫১৩ একর জমি দখলে নিয়ে অবস্থান করছে। প্রতিমাসে বন বিভাগের জমি বেহাত হচ্ছে, কাটা হচ্ছে পাহাড়। এ বিষয়ে প্রতিমাসে আমরা জমি পরিমাপ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য উর্ধতন কতৃপক্ষকে জানাচ্ছি। তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা ছাড়া এ পর্যন্ত বন বিভাগের কি পরিমাপ জমি রোহিঙ্গাদের জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হবে তা লিখিত নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। অলিখিতভাবে এসব কার্যক্রম চলছে বলেও জানান তিনি।

জাতি সংঘের হিসেবে অন্তত দেড় লাখ রোহিঙ্গা আসন্ন বর্ষা মৌসুমে এসব ঝুঁকিতে রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারী উদ্যোগে ঝুঁকিতে থাকা বেশ কিছু রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে (একটি পাহাড়ে) সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

এছাড়াও সরকারি ও বেসরকারী পর্যায়ে রোহিঙ্গাদের ‘দূর্যোগ প্রস্তুতি বিষয়ক প্রশিক্ষণ’ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কক্সবাজারের বর্ষা মৌসুমে টানা বৃষ্টিপাতের রেকর্ড পুরানো। এখানে টানা এক সপ্তাহ বা ১৫ দিন বৃষ্টি হয় এমন নজির বেশি। ফলে এ সময়ে পাহাড়ি এলাকায় ভূমি ধ্বস ও বন্যার পহ্মাবন প্রতি বছরের ঘটনা। বিশেষ করে এ বছর যেহেতু উখিয়ার কুতুপালং, বালূখালী, টাইংখালী, টেকনাফের উনছিপ্রাং, লেদা, জাদিমোড়া ইত্যাতি এলাকায় ব্যাপক পাহাড় কাটা হয়েছে। এছাড়া পাহাড়ি ছড়া বা খালগুলো কোথাও কোথাও বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে ওই সব এলাকায় পানি দ্রুত নিষ্কাশন না হয়ে জলাবদ্ধতার সমুহ সম্ভবনা রয়েছে। এতে বর্ষা মৌসুমে শিশুরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকবে। তাদের খেলার মাঠ, চলাফেরা পথ নিরাপদ থাকবেনা।

বন বিভাগের একটি সুত্র বলছে দুই উপজেলায় প্রায় ৫ হাজার একর ভূমি দখল করে রেখেছে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। কৃষিজমি, পাহাড় বন উজাড় করে নির্মিত এই বসতি স্থানীয়দের জন্য বিরাট ঝুঁকি তৈরী করেছে।

উখিয়ার তাজনির মার খোলা এলাকার রোহিঙ্গা যুবক হাফিজ জানান, বর্ষা মৌসুম নিয়ে আমরা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছি। যদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হয় প্রাণহানি ঘটবেই তা অনেকটা নিশ্চিত। তিনি বর্ষা মৌসুমের ঝুঁকিমুক্ত করার জন্য শিশু বান্ধব পরিকল্পনার কথাও বলেন। বালূখালী এলাকার রোহিঙ্গা যুবক মো: আবদুল্লাহ বলেন, এমনিতে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে প্রথম এক জায়গায় থেকেছি। সেখান থেকে সরিয়ে অন্য জায়গায় নেওয়া হলো। এখন আবার পাহাড় ধসের কথা বলে সরিয়ে যাওয়ার জন্য বলা হচ্ছে। পরিবারে ৪ জন শিশু সন্তান রয়েছে। এভাবে নড়াতো মরার সমান। ”

বালুখালী আইওএম হাসপাতালের পার্শ্বে গত রবিবার ৯টি পরিবারকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে হাসপাতালটি ঝুঁকির মধ্যে রয়ে গেছে। এই এলাকার জাহেরা বলেন, বার বার আমদের সরানো হচ্ছে । এ যে কত কষ্টের তা বুঝানো যাবে না। এভাবে কি আমাদের জীবনটা শেষ হয়ে যাবে। মিযানমার থেকে পালিয়ে এসে এখানেও অশান্তি।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত এনজিও ফোরামের প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার কর্মী মোঃ মুমিনুর রহমান, সরিয়ে আনা রোহিঙ্গাদের স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমে পারিকল্পিত বাঁধের মাধ্যমে পানি ধরে রেখে ঝুঁকি মোকাবেলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। অন্যথায় পানির লেয়ার কমে যাওয়া শুধু রোহিঙ্গারা নয়, স্থানীয়রাও ঝুঁকিতে থাকবে বলে মনে করেন তিনি। সিপিপি (ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসুচি) প্রশিক্ষক গোলাম মোস্তফা বলেন, দূর্যোগ মোকাবেলায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য প্রতিনিয়ত হাতে কলমে মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। বাড়িঘর শক্ত করে তৈরী করার জন্য কৌশলও শেখানো হচ্ছে। এ ছাড়া বর্ষাকালীন প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও বিভিন্ন সংস্থা রোহিঙ্গাদের মাঝে বিতরণ করছেন বলেও জানান তিনি।

টেকনাফস্থ ২ বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্ণেল আছাদুদ জামান চৌধুরী বলেন, ঝুঁকি মোকাবেলায় রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের বর্ষা মৌসুমের আগে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া দরকার। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ নিকারুজ্জামান চৌধুরী রবিন, ঝুঁকিতে থাকা রোহিঙ্গাদের নিরপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য নতুন করে ৫ শ একর ভুমি নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে কাজ চলছে। ইতিমধ্যে তাঁদের এই স্থানে স্থানান্তর করা হচ্ছে। এ ছাড়া পাহাড়ি এলাকার খাল ও ছড়াগুলোও খনন করে পানি চলাচলের উপযোগী করা হচ্ছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মেকাবেলায় করনীয় ঠিক করতে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির বেশ কয়েকটি সভাও অনুণ্ঠিত হয়েছে। সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

কক্সবাজার জেলা ত্রান ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো: মাছুম কবির নজরুল ইসলাম বলেন, কক্সবাজারের সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সাথে সহজে ঝুঁকি মোকাবেলা করা যায় সে জন্য আগাম কাজকর্ম চলছে। এ জন্য দেশি ুবিদেশে এনজিও গুলোকেও কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য বলা হয়েছে। এদিকে বর্ষাকাল যত ঘনিয়ে আসছে উখিয়া টেকনাফে বসবাসরত এই রোহিঙ্গাদের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠাও ততই বাড়ছে।

x