বাবুর বৈশাখ

বিপুল বড়ুয়া

বুধবার , ৯ মে, ২০১৮ at ৭:০৬ পূর্বাহ্ণ
25

মা খুব ভোরে ঘুম থেকে ডেকে দেয় বাবুকে। ‘কী নতুন বছরের প্রথম দিন না! এতোক্ষণ ঘুমোতে হয়? কখোন শিলা ঘষে স্নান করবিনতুন জামাকাপড় পরবিকপালে চন্দনের ফোঁটা দিবিহালখাতায় বসবি না দাদাদের সাথে।’

আরো কতো কিছু বলে মা। বাবুর আর অতসব শোনা হয় না। এক লাফেই বিছানা ছাড়া। তাইতো কতো কাজ পড়ে আছে

আর ডানে বাঁয়ে দেখে না বাবু। মার হাত হতে লাল টকটকে শিলাটা নিয়ে এক ছুটে টুনিপুকুর, শিলা ঘষে বেশ করে কটা ডুব দিয়ে সোজা বাসা।

মা বসে আছে নতুন বছরের জামা কাপড় নিয়ে। আর কি তর্‌ সয় বাবুর? ঝটপট শার্টপ্যান্ট পরেমাথার চুল আঁচড়েকপালে শ্বেত চন্দনের ফোঁটা দিয়ে তবে দোকানে বসা।

সবাই হাসে বাবুর ছুটোছুটি দেখে। সুধন মামাজসুদা হাসে। কাল দোকানে গদীঘরে ম্যালালালনীলসাদা কাগজের ফুলঝালর লাগিয়েছে, এ ছবিসে ছবি মুছে সাফসুতরো করেছে। বড় পাল্লাশিলবাটখারায় সুতো দিয়ে বিহু ফুল বেঁধেছে। কী যে হৈচৈ করেছে বাবু। আর আজ সকাল সকাল এসে পড়েছে দোকানে।

বাবু দেখে দোকানের ক্যাশবাক্স আজ বেশ ঝকঝকে তকতকে। সুধন মামা গদীঘর ফুলমালা কাগজের শিকল লথ দিয়ে বেশ করে সাজিয়েছে। চালডাবকলাভর্তি থালা আনা হয়েছে গদীতে। বড় বাতিধূপ সলা জ্বলছে। দারুণ সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। থালায় কড়কড়ে দুটাকার নোটের তোড়া। ঢুলী আসবেহরগৌরি সেজে শিবের গাজন আসবে। আসবে অনেক দুঃখী মানুষও। সবাইকে দু’চার টাকা করে দিতে হবেওরা যা দেয় তা হাসিমুখে নেবে। কোনো বাড়তি ওজরআপত্তি কেউ করবে না। বাবুর অতসব দেখে খুবই ভালো লাগে।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে জমে ওঠে দোকানের বিকিকিনি। হৈ চৈ মালপত্রের ম্যালা মাপজোখ। ফাইস্যাছুরিলইট্যাআনলিবজরি কিংবা সোনাদিয়ারাঙাবালির তেলি ফাইস্যা জমজমাট বেচাকেনা। খরিদদারদের জন্য ভেতর থেকে আসছে প্লেটে প্লেটে মিষ্টিনিমকিগ্লাসে গ্লাসে সরবতকোক। বাবু খুশিতে অবাক হয়ে সব দেখে।

অতসবেও কিন্তু বাবুর মন ঠিক ঠিক ভরে না। বাবু দেখেঅবাক হয়ে দেখেশিবের গাজনের বাঘছালপরা হাতে ত্রিশূলসারা গায় রঙচঙ মাখামাথায় বিশাল জটা গায় খেলনা সাপ পেঁচানো ভয় লাগানো হরগৌরিকে। ঢোলবাজনাঢুলীর কতো কতো দল। টুকরো টুকরো গান বামাক্লারিওনেটে তুলে কী দারুণভাবে গেয়ে যায় তারা। তার কিছু কিছু গান বাবু আবছায়া বুঝে নেয়সুরের দোলায় চিনেও নেয়।

পহেলা বৈশাখের এই আনন্দময়উচ্ছ্বাসমুখর সকাল বাবুকে যেনো কোথায় কোন অন্য ভুবনে নিয়ে যায়। দোকানে দোকানে মিষ্টির মচ্ছবসবার পরনে নতুন জামাকাপড়দোরে দোরে ছোট ছোট নিমফলনিম পাতার হালকা সুবাসবিহু ফুলের নীল শাদা সলাজ চাউনিযেনো প্রতিদিনকার সাধারণ জীবনযাত্রাকে হঠাৎ করে বদলে দিয়ে যায়।

বাবু পরম মমতায় কারো হাতে মুঠো চালকারো হাতে কড়কড়ে নতুন নোট তুলে দিয়ে দারুণ খুশি হয়ে পড়ে।

বাবু দেখে গদী সাইত করে সেজদা লাল ঢাউস জবেদা খাতায় প্রণাম করে শ্বেতরক্ত চন্দনের ফোঁটা একেরুপোর চাঁদিটাকা দিয়ে ছাপ দিচ্ছে। পীরআউলিয়াদেবদেবীর নাম খাতায় লিখে নতুন বছরের হিসাব শুরু করছে অপার শ্রদ্ধায়। আনন্দে যেনো বাবুর বুক ভরে উঠে।

বাবু যেনো পহেলা বৈশাখের অপার আনন্দে নিজকে কোথায় হারিয়ে ফেলে। বেজে চলেছে ঢোলঢাকের রকমারি বাজনাবাঁশিতে নানা গানের প্রাণকাড়া সুর, শিবের গাজনের মোহনীয় জৌলুশ, কটাটাকাদুমুঠো চালের জন্য ডানে বাঁয়ে কার কার হাত পেতে হেসে ফেলা।

এখানে কোনো খিটিমিটি নেইনেই চোখ রাঙানি কিংবা কোনো অদৃশ্য দেয়াল টানা। পহেলা বৈশাখ বাঙালিকে যেনো এক মধুর প্রাপ্তির উঠোনে এসে দেয়। আর বাবুমনপ্রাণ ভরে উপভোগ করে সবার সাথে মিলে মিশে যেনো বৈশাখের সে অনাবিল আনন্দ!

x