বিচ্ছিন্ন ভাবনা…

ত্রিয়মা রায়

শনিবার , ২৮ এপ্রিল, ২০১৮ at ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ
5

নারী ঘরে করেন এমন কাজের আর্থিক মূল্য গত অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশের সমান। চলতি মূল্যে টাকার অঙ্কে তা ১০ লাখ ৩৭ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। স্থায়ী মূল্যে এটা পাঁচ লাখ ৯৪ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রাথমিক হিসাবে, ওই বছর চলতি মূল্যে জিডিপির আকার ছিল ১৩ লাখ ৫০ হাজার ৯২০ কোটি টাকার। গবেষণায় বলা হয়েছে- একজন নারী প্রতিদিন গড়ে একজন পুরুষের তুলনায় প্রায় তিন গুণ সময় এমন কাজ করেন, যা জাতীয় আয়ের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয় না। একজন নারী এমন কাজ করেন প্রতিদিন গড়ে ৭ দশমিক ৭ ঘণ্টা। আর পুরুষ করেন মাত্র আড়াই ঘণ্টা। একজন নারী প্রতিদিন গড়ে ১২ দশমিক ১টি কাজ করেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এ কাজের গড় সংখ্যা ২ দশমিক ৭। জাতীয় আয়ে নারীর যে পরিমাণ কাজের স্বীকৃতি আছে, তার চেয়ে ২ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক ৯ গুণ কাজের স্বীকৃতি নেই।’ ণ্ডসাম্প্রতিক সময়ে প্রথম আলো পত্রিকায় এ তথ্য প্রকাশিত হয়।

বেসরকারি সংস্থা সিপিডির এই তথ্যটা পড়ার পর অনেক কিছু নিয়ে নতুন করে আমায় ভাবতে শেখাল। নারীরাও ‘আশরাফুল মাখলুকাত’। সৃষ্টির সেরা জীব। তাকেও দেয়া হয়েছে মানুষ হিসেবে সর্বোচ্চ মেধা, যোগ্যতা। রাহমানুর রাহিম তাঁকেও সৃষ্টি করেছেন সর্বোচ্চ সুন্দর অবয়বে। তাঁকেও দেয়া হয়েছে, চিন্তাশক্তির দিক থেকে মানুষ হিসেবে পূর্ণ স্বাধীনতা। কিন্তু বাস্তবতা? ভাবলেই গা শিউরে ওঠে।

অনেকেই আছে যাদের অল্পবয়সে বিয়ে হয়ে যায়, তারপর হতে তাঁরা সংসার স্বামীশ্বশুরশাশুড়ির মন যুগিয়ে চলতে ব্যস্ত হয়ে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রথমে তাদের শিক্ষাজীবনকে ত্যাগ করতে হয়, কারণ তখন শ্বশুর বাড়ির লোকেরা মনে করে বৌমা এত পড়ে কী করবে? স্বামী সন্দেহে থাকে যেণ্ড বাহিরে গিয়ে বৌ না জানি কোন ছেলে বন্ধুর সাথে মিশবে, তখন নিত্যদিনের অশান্তি হতে মুক্তি পাবার জন্য মেয়েটি নিজে থেকেই লেখাপড়া বন্ধ করে দেয়। কারণ নারীদের ত্যাগেই সংসারে সুখ আসে। অতঃপর শুরু হয় মেয়েটির নিজের বাবামা, ভাইবোন আত্মীয়স্বজন হতে দূরে সরে যাবার পালা। কারণ মেয়ের কোন বাড়িই থাকেনা আসলে। তার অধিকার থাকবে কী?

বেগম রোকেয়া যথার্থই বলেছেনণ্ড‘আমরা পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণী হই- ‘আমাদের বাড়িও’ হয়। কিন্তু তাহা হইলে কি হয়,- বাড়ীর প্রকৃত কর্তা স্বামী, পুত্র, জামাতা, দেবর হ’ন। তাঁহাদের অভাবে বড় আমলা বা নায়েবটি মালিক! তাই বলি, গৃহ বলতে আমাদেরই একটা পর্ণকুটির নাই। প্রাণী জগতে কোন জন্তুই আমাদের মতো নিরাশ্রয়া নহে। সকলেরই গৃহ আছে- কেবল নাই আমাদের।”

নারী তাঁর সব আশাআকাঙক্ষাস্বপ্ন ত্যাগ করে চলে সংসারে সুখী হবার সংগ্রামে। তবুও কি সে সুখী হয়? সকাল হতে রাত পর্যন্ত সে পরিশ্রম দিবে সংসারে। সে সবার আগে ঘুম থেকে উঠবে কিন্তু ঘুমাবে সবার পরে। সে নিজ হাতে সব রান্না করবে কিন্তু খাওয়ার সময় খাবে সবার পরে। তবেই সে হবে একজন আদর্শ মা তথা নারী। শ্রম দিতে দিতে তাঁর নিজস্ব জীবন বলতে কিছুই থাকবে না। তাঁর যথার্থ কোনো মূল্যায়ন সে এই সমাজে পাবে না। তাঁর নিজের জীবনের প্রতি তাঁর কোনো অধিকার থাকবে না, নিজের জীবনের সময়ের ভিতর হতে নিজের জন্য খরচা করার সময় থাকবে না। আর তার এই শ্রমের কোন মূল্য থাকবে না।

একটি টাকার জন্য সে ফকিরেরও অধম। সে হাত পাতবে অন্যের অনুগ্রহের কাছে। মেয়েটি যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায় বাইরের আলো বাতাসে শ্বাস নিতে চায় তা হলে সে হচ্ছে খারাপ মেয়ে! ধীরে ধীরে ভালো থাকার, সুখে থাকার অভিনয়ে সে পটু হয়ে উঠবে এবং এটাই যেনো নিয়ম। আর যদি কোন মেয়ে তাঁর নিজস্ব পাওনার জন্য বা নিত্য অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এর প্রতিবাদ করে তবে তাঁকে হারাতে হতে পারে তাঁর শ্রম দিয়ে গড়া সংসার। এমনিভাবে বিয়ের পর সে সম্পত্তি তো পায়- কিন্তু হারায় নারীর ভাইয়ের আদর। নিজ বাবামা’র আদরভালোবাসা।

আবার নানা ঘটনার পরিক্রমায় কখনো কখনো কাউকে কাউকে হয়তো একসময় বাবার বাড়ি ফিরতে হয়। কারো কপালে জুটে যৌতুকের আগুন। অনেকে আবার মৃত্যুর স্বাদ নিয়ে এই জীবন থেকে পালিয়ে যায়। আর যাঁরা এই সংসারের মায়া ত্যাগ করতে পারে না তারা স্বামীশ্বশুর বাড়ির লোকের গালমন্দ মারধর খেয়ে সন্তানদের মুখ পানে চেয়ে সংসার জীবন পার করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে নিজের সন্তানরাও বড় হয়ে মাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করছে।

যে মহিলাটি নিজের সকল সুখ স্বপ্ন ত্যাগ করে সংসারকে টেনে নিয়ে চলে, বৃদ্ধ বয়সে সে হয়ে যায় সন্তানের ঘাড়ের বোঝা। নিজের পেটের সন্তানের থেকেও তাকে নানা অবহেলা ও গালিগালাজ শুনতে হয়। কারণ, একজন মেয়ের নিজস্ব কোন বাড়ি থাকে না, সে চিরকাল বাবার বাড়ি, শ্বশুর বাড়ি, স্বামীর বাড়ি, ছেলের বাড়ি থেকেই জীবন পার করে। যাঁর নিজের কোনো ঠিকানা নাই তাদের শ্রমেরও মূল্যায়ন হয় না। এইই হলো নারী জীবন। এখানে- এই নারী জীবনে জিজ্ঞাসা অনেক। উত্তর কই? কে দেবে?

x