বিভীষিকাময় পরিস্থিতি রোধ করতে হবে

শুক্রবার , ৪ মে, ২০১৮ at ৪:২৮ পূর্বাহ্ণ
29

সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা সারা জীবনের জন্য একটি পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে। অনেককে শারীরিক পঙ্গুত্বও বরণ করতে হচ্ছে। পুরো দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ জনের প্রাণহানি ঘটছে বলে জানা যায়। সড়কপথে এ যেন এক অঘোষিত যুদ্ধ চলছে। তা না হলে প্রতিদিন শুধু সড়ক দুর্ঘটনায় এতো লোক মরবে কেন? পৃথিবীর আর কোনো দেশে কি সড়ক দুর্ঘটনায় এতো লোক মারা যায়? একটি দৈনিকের ভাষ্যেসড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যায় পৃথিবীর শীর্ষে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। আর এ দুর্ঘটনার ৫২% ঘটছে মহাসড়কে। বাংলাদেশের সড়কপথে কী বিভীষিকাময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে তা পত্রিকায় প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনে চোখ বুলালেই আঁচ করা যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশ জুড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়েই চলছে। উল্লেখিত দৈনিকের হিসাব অনুযায়ী, গত ৪৩৪ দিনে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। গবেষণা বলছে, বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই তরুণ ও কর্মক্ষম ব্যক্তি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) গবেষণা অনুসারে, দেশের সড়কমহাসড়কে প্রাণ যাওয়া মানুষের ৫৪ শতাংশই ১৬ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। আর ১৫ বছরের নিচের শিশু সাড়ে ১৮ শতাংশ। এই দুই শ্রেণিকেই দেশের ভবিষ্যৎ ও অর্থনীতির মূল শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত ২০১৫ সালের বৈশ্বিক প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার আর্থিক ক্ষতি দেশের মোট দেশজ জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) .৬ শতাংশের সমান।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে উদ্বিগ্ন দেশের আইন কমিশন। কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক সম্প্রতি বলেছেন, দুর্ঘটনা কী পরিমাণে বেড়েছে! কারও হাত চলে যাচ্ছে, পা চলে যাচ্ছে, মাথা চলে যাচ্ছে। এভাবে কোনো সভ্য দেশ চলতে পারে না। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ট্রাফিক আইন কার্যকর করা দরকার বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে আইন পরিবর্তন করা প্রয়োজন বলেও তাঁর মত। সোমবার চারটি বিষয় নিয়ে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের সঙ্গে এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কাছে এসব কথা বলেন খায়রুল হক। সুপ্রিম কোর্টের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আইন কমিশনের চেয়ারম্যানের বৈঠকে আর্থিক বিরোধ, সালিশ আইন, ট্রাফিক আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক বলেন, ট্রাফিক আইন নিয়ে চিন্তাভাবনা করার কথা বলেছি। ট্রাফ্রিক আইন পরিবর্তন করা প্রয়োজন বলে মনে করি। কিন্তু তা নির্ভর করে, যদি দেশের লোক মনে করে, পরিবর্তন দরকার। আর যদি মনে করে, দরকার নেই, তা হলে হবে না। মানুষ মরতেই থাকবে। খায়রুল হক বলেন, ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ৪ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৪০০ টাকা জরিমানা। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে যদি এ অবস্থা হয়, তা কেউ লাইসেন্স নেওয়ার তেমন গরজ বোধ করবে না। আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, দুর্ঘটনা রোধে দরকার আইন পরিবর্তন, আইনের যথাযথ প্রয়োগ। শাস্তি বাড়িয়ে হবে না। আইন প্রয়োগের প্রয়োজন আছে। মনোভাব পরিবর্তনেরও প্রয়োজন আছে।

আইন কমিশনের চেয়ারম্যানের বক্তব্য শুধু সময়োপযোগী নয়, গুরুত্বপূর্ণও। দুর্ঘটনা রোধে আইনের পরিবর্তন যেমন দরকার, তেমনি প্রয়োজন আইনের যথাযথ প্রয়োগ।

সড়কে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণে আধুনিক স্পিড ক্যামেরা স্থাপন, মহাসড়কে নজরদারির জন্য স্থায়ী লোকবল নিয়োগ, চালকদের জন্য পর্যাপ্ত উন্নত ড্রাইভিং স্কুল স্থাপনসহ বেশ কিছু সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য কাজ করতে হবে। সড়ক নিরাপদ রাখতে সরকার ও চলাচল করা ব্যক্তিদের দায়িত্ব সমান। নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবাই সচেতন হলে দুর্ঘটনা কমানো যাবে। সামাজিক দায়িত্ববোধ ও আইনের শক্ত প্রয়োগ সড়ক দুর্ঘটনা রোধে নিয়ামক হিসেবে কাজ করতে পারে।

x