বুদ্ধি প্রতিবন্ধী সেবায় এগিয়ে আসুন

প্রকৌশলী জয়কেতু বড়ুয়া

সোমবার , ১৯ মার্চ, ২০১৮ at ৫:২৭ পূর্বাহ্ণ
13

চক্ষু কর্ণ নাসিকা জিহ্বা ত্বক ও মন ইন্দ্রিয়াদি সহকারে শরীরের অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পরিপূর্ণভাবে বর্তমান যাদের আছে তারা স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে চিহ্নিত। এসব ইন্দ্রিয়াদির কোন একটা যাদের বিকল তারা প্রতিবন্ধী। সাধারণত: মূক বধির অন্ধ পঙ্গু এদেরকেই আমরা প্রতিবন্ধী বলে জানতাম। কিন্তু সবচেয়ে হতভাগ্য প্রতিবন্ধী হল মানসিক প্রতিবন্ধী যাদের বলা হয় বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। যারা চোখে দেখতে পায় না তারা অন্ধ প্রতিবন্ধী, যারা শুনতে পায় না এবং ভালভাবে কথা বরতে পারে না তারা শ্রবণ প্রতিবন্ধী যারা পঙ্গু তারা শারীরিক প্রতিবন্ধী। আর যারা বুদ্ধিবৃত্তির বিঘ্নতার কারণে বুদ্ধির স্বল্পতা হেতু স্বাভাবিক কাজ কর্ম করতে পারে না তাদের বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বলা হয়। এদের সম্বন্ধে আমাদের ধারণা এখনও সুস্পষ্ট নয়। এদের অনেকে মানসিক রোগ বলে আখ্যায়িত করেন। বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের কিছু না কিছু শারীরিক কিংবা বাচনিক বৈকল্য থাকে। তারা অনেকে কম কথা বলে, অনেকে স্পষ্ট কথা বলতে পারে না, কেহ চুপচাপ থাকে, কেহ খুব অস্থির থাকে, খুব সহজে কথা ভুলে যায়, এক কথা অনেক বার বলে, চোখে চোখে তাকাতে পারে না, হাত দিয়ে বা কাগজ কাপড় দিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখে, এমন কিছু করে যা সাধারণ ছেলেমেয়েরা করে না। সমবয়সীর তুলনায় বুদ্ধিমত্তা অনেক কম এবং বোকা মনে হয়। কথায় কাজে আচরণে হাঁটা চলায় লেখাপড়ায় অনেক পিছিয়ে থাকে। সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে একবার ভেবে দেখুন যে ঘরে একজন প্রতিবন্ধী ছেলে বা মেয়ে আছে যারা পায়খানা করে জল নিতে পারে না জুতার ফিতা বাঁধতে পারে না, জামার বোতাম লাগাতে পারে না হাজার চেষ্টায়ও লেখাপড়া শিখতে পারে না। সব সময় অন্যভাই বোনদের সাথে ঝগড়া রাগারাগি মারামারি করে অনেকে অন্যের সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করতে পারে না সেই পরিবারের বাবামাভাইবোন কী অপরিসীম দুঃখ কষ্ট বেদনা ভোগ করেন।

বুদ্ধি প্রতিবন্ধীর মধ্যে মৃদু মধ্যম গুরুতর তিন প্রকার বুদ্ধি প্রতিবন্ধী রয়েছে। মৃদু এবং মধ্যম যারা তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কিছু লেখাপড়া খেলাধূলা গান বাজনা শেখানো যায় এবং তারা মোটামুটি সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। যারা গুরুতর তারা বয়স হলে পাগলের পর্যায়ে চলে যায়। WHO ‘হু’ এর জরিপ মতে মোট জনসংখ্যার ১০% প্রতিবন্ধী তন্মধ্যে ৩% বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। সাধারণত: স্বামীস্ত্রীর রক্তের আর এইচ এর সমস্যা, ক্রমোজমের বিকৃতি, মায়ের অপুষ্টি, সংক্রামক রোগ টাইফয়েডে আক্রান্ত আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে, ক্ষতিকর ওষুধ সেবন, মানসিক চাপ, আয়োডিনের অভাব, অপূর্ণ অবস্থায় জন্ম এবং ভুল চিকিৎসা ও সন্তান প্রতিবন্ধী হতে পারে।

১৯৭১ সালের ২৩ শে ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মানসিক প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিয়ে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয় উক্ত ঘোষণাপত্রে মানসিক প্রতিবন্ধীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ স্বাস্থ্য পুনর্বাসন, সামাজিক অধিকার, অভিভাবকত্বের অধিকার এবং অন্য সব নাগরিকের মত সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। ঢাকায় ১৯৭৭ সালে কয়েকজন পিতামাতা, কয়েকজন বিশেষজ্ঞ এবং সমাজ দরদী ত্যাগী গুণীজনের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ মানসিক প্রতিবন্ধী কল্যাণ ও শিক্ষা সমিতি নামে বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের বিশেষ শিক্ষা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যাতে সমাজে অন্য লোকের মত স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে সমর্থ হয় এর প্রচেষ্টায় সরকারি নিবন্ধনযুক্ত স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের সব জেলায় এর শাখা রয়েছে এবং বর্তমান সরকারের আনুকূল্যে এর যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য সংস্থাও এর পৃষ্ঠপোষকতা করছে। বর্তমান প্রতিবন্ধী বান্ধব প্রধানমন্ত্রী প্রতিবন্ধী এবং অটিষ্টিক ছেলেমেয়ের জন্য প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনসহ অনেক সরকারি পদক্ষেপে সার্বিকভাবে প্রতিবন্ধী ও অটিষ্টিকদের জন্য নিরলসভাবে কাজ করছে। এই সমিতির বর্তমান নাম society for the welfare of the inteuectually disabled এক কথায় SWID সমাজ দরদী মানব দরদী বিত্তশালী নাগরিক এই স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে। মূক বধির অন্ধ ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান এদের সেবায় নিয়োজিত রয়েছে। বয়স্ক গুরুতর বুদ্ধি প্রতিবন্ধীর জন্য হোস্টেল জাতীয় প্রতিষ্ঠান বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন রয়েছে যাতে করে ভুক্তভোগী পরিবার কিছুটা শান্তিতে থাকতে পারে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, মুক্তিযোদ্ধা।

x