বোবা পাথর ও মা

সৈয়দ ইবনুজ্জামান

শুক্রবার , ৪ মে, ২০১৮ at ৫:৫০ পূর্বাহ্ণ
68

বাবলি! সোনা আমার! একবার মা বলে ডাক!

বাবলি কেবলই চোখের পানি ঝরায়। তার যে মা ডাকার বড়ই শখ! পিংকির মা ডাক শোনার বড় ইচ্ছেই বাবলিকে ফেলে দেয়া সদ্য নবজাতক অবস্থায় ডাস্টবিন থেকে এ পরিবারে ঠাঁই করে দিয়েছে। এ পরিবারে ঠাঁই পেলেও পরিবারের একজন বলে অনেকেই তাকে মানে না। এ নিয়ে যে পিংকির কম কষ্ট নেই তা নয়। স্বামী সারাদিন অফিস শেষ করে রাত করে বাড়ি ফেরে। বাবলিই তার একমাত্র সম্বল। বাবলির মুখ থেকে মা ডাক শোনার জন্য সাত বসন্ত কাটিয়ে দিলো। বাবলিকে মা ডাক শেখাতে গিয়ে পিংকির পোষা ময়নাটাও মা ডাক শিখে গিয়েছে। ময়নার ডাকে পিংকির মন ভরেনা। অপূর্ণ মাতৃত্ব নিয়ে সে প্রতিদিনই চোখের পানি ঝরায়। বাড়িতে তার শাশুড়ি আর ভাসুরের পরিবার থাকে। পরিবারটা যৌথ তবে আশ্চর্য হলেও সত্য যে, বাবলি কথা না বলতে পারলেও দিব্যি কানে শোনে। মায়ের কথা মতো দুপুরে পড়তে বসে। মা বকুনি দিলে ফুঁপিয়ে কাঁদে। শাশুড়ি যে তাকে ডেকে চলেছে এ দিকে তার হুশ নেই।

বলছি, সারাটাদিন ওই বেজন্মাটাকে নিয়ে বসে থাকলে চলবে? সন্ধ্যার নাস্তার কি কিছুই হবেনা?

কাঁদতে হবে না সোনা আমার! তুই শুধু জীবনে একটিবার মা বলে ডাকিস তাতেই আমার দুঃখ ঘুচে যাবে। বাবলি মাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায়। আরো আদর পেতে চায়।

হয়েছে সোনা! মার তো অনেক কাজ। তুই পড়তে বস।

বাবলির বয়স সাত। এই সাত বছরেই সে মার কাজে সাহায্য করে আবার পড়ালেখাও করে। বাবলি ভাবে ময়না পাখি সব কথা বলতে পারে। ঘরের এককোণেই ময়না পাখিটা খাঁচায় বন্দী থাকে। ময়না পাখির সাথে বাবলি খেলে। প্রতিবারই বাবলি হেরেও যায়। ময়না পাখির মামা ডাকে সে হার মেনে নেয়। চাঁদের বুকে ঘর বাঁধার স্বপ্ন অনেক কিন্তু চাঁদের বুকে ঘরই বা কয়টা। বাবলি তবুও কথা বলার চেষ্টা কর্‌ে একটাই শব্দ, মা!

২য় পরিচ্ছেদ

বলি, ওটাকে নিয়ে এত ঢং না দেখালে কি চলে না?

মা দেখবেন আমাকে একদিন সত্যি ও মা বলে ডাকবে।

কেন বাপু! ওটাই কেন? তোমার কপালে মা ডাক নেই এই আমি বলে রাখলাম।

শাশুড়ি কথা শুনিয়ে দিয়ে চলে যায়। নীরবে আবারও কাঁদে পিংকি। বাবলি রান্না ঘরে ঢুকে মার চোখের পানি মুছে দেয়। ইঙ্গিতে জানতে চায় কি হয়েছে?

কিছু হয়নি সোনা!

বাবলি বুঝতে পারে প্রকাশ করতে পারে না। বোবা পাথরের দীর্ঘশ্বাস কেবল বোবা পাথরই বোঝে। রক্ত মাংসের প্রাণীরা নয়। বাবলিকে নিয়ে পিংকি ঘরে চলে যায়। আজ বাড়িতে মেহমান আসার কথা। তাই সুন্দর করে সাজানো হচ্ছে। পিংকির ভাসুরের মেয়েকে বরপক্ষ দেখতে আসবে। এ বাড়ির সব অনুষ্ঠানে বাবলি আর তার মায়ের যোগ দেয়া মানা। বন্ধ্যা বলেই বাবলির মা আর বেজন্মা বলেই বাবলির মানা। তাই এসব অনুষ্ঠানে তারা সামনে আসতে পারেনা। এতে নাকি অমঙ্গল হয়। মেহমানরা সামনের রুমে বসে আছে। মেয়ে দেখা চলছে। বাবলি আর তার মা পর্দার পাশে দাড়িয়ে আছে। বাবলি একটা ছোট বল নিয়ে খেলছে।

একদিন আমার সোনাটাকেও লাল টুকটুকে বউ সাজাবো

বাবলি লজ্জায় মায়ের আঁচলে ঠাঁই নেয় তাতে বলটা গড়িয়ে সামনের রুমে চলে যায়। মায়ের মানা শর্তেও বাবলি বলটা নিয়ে আসতে যায়।

ওমা! কি সুন্দর ফুটফুটে মেয়ে! তোমার নাম কি?

বাবলি চুপ থাকে। পিংকি দৌড়ে এসে বলে, ও আমার মেয়ে, কথা বলতে পারেনা।

আহা! এমন মেয়ে কিনা কথা বলতে পারেনা!

শ্বাশুড়ি আর জা এদিকে রেগে আগুন। মেহমানদের একজন বললেন, আপনাদের ঘরে যে এমন একটা চাঁদের টুকরো আছে আগে যে বললেন না? এমন প্রশ্নে তারা ইতস্তত হয়ে তা এড়িয়ে যায়। সেদিন বাবলি আর পিংকিকে তেমন একটা কথা শুনতে হয়নি। কিন্তু যেদিন খবর এলো যে, বিয়েটা হচ্ছেনা, শাশুড়ি আর পিংকির জা তাদের আর ছাড়লো না। শাশুড়ি চেচাতে থাকলো।

এই যে মা ওয়ালী। এবার ক্ষান্ত হলেন তো বিয়েটা যে ভাঙলো। তাতে আপনি আর ওই আপদটা খুশি তো! মিষ্টি আনো গো! মিষ্টি আনো! ওনাদের আজ খুশির দিন। কত করে বললাম যে ওই বেজন্মা আর এ অপয়া তুমি সামনে এসো না। না শুনলেনা। এবার শান্তি হয়েছো তো!

মা! আমি অপয়া?

এবার শাশুড়ির সাথে পিংকির জা ও যোগ হলো।

তো নয়তো কি? কোন পাপ করেছ কে জানে! তোমার পাপের জন্যই মা হতে পারোনি। মা ডাক শুনতে পারোনি, আর পারবেওনা।

ভাবী! এভাবে বল না! আমি মা! বাবলি আমার মেয়ে।

ওটার কথা ফের মুখে এনেছ দেখছি। একবারইতো বললাম, তোমার কপালে মা ডাক নেই। ঘর থেকে বাবলি দৌড়ে ছুটে চলে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে।

সোনা আমার! মানিক! একটাবার মা বলে ডাক!

বাবলি অনেক চেষ্টা করেও পারেনা। শেষে ময়না পাখির মা ডাক শোনা যায়। শাশুড়ি হেসে দেয়।

ওই ময়না পাখির মা ডাক নিয়েই শান্ত থাকো। বলি, ডাক্তার তো আর কম দেখাওনি। লাভ হলো? হবেও না!

শাশুড়ি আর জা চলে গেলে পিংকি বাবলিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে। বাবলিও কাঁদে। কিছু বলতে চায়, পারেনা। কষ্ট থেকেও কষ্ট প্রকাশের না পারার যন্ত্রণা যে বড়ই তীব্র। আয়নার সামনে দাড়িয়ে বাবলি প্রতিদিন চেষ্টা করে কথা বলার কিন্তু পারেনা। পিংকি তা দেখেও কিছু বলে না, আঁড়ালে শুধু কাঁদে। নারীর কষ্ট বোঝ দায় মায়ের কষ্ট বোঝা যে আরো বেশি দায়।

৩য় পরিচ্ছেদ

আর দুদিন বাদেই একুশে ফেব্রুয়ারী। বাবলি ভালো নাচে। তাই এবার মা একটা বড় অনুষ্ঠানে বাবলিকে সাথে নিয়ে গেল। নিবন্ধনের সময় বাবলিকে তার নাম জিজ্ঞেস করা হয়। বাবলি বলতে চেষ্টা করে কিন্তু পারেনা। আয়োজকরা পিংকিকে প্রশ্ন করে, আপনার মেয়ে কি বোবা?

জ্বি।

দেখুন, এটা কোন প্রতিবন্ধীদের অনুষ্ঠান নয়। আপনি আসুন প্লিজ!

অনেক অনুরোধের পরও আয়োজকরা রাজী হয়না। ভাষার মাসে ভাষারই কদর থাকবে, বোবা পাথরের নয়। হৃদয় যে কথা বলে তা আর কজনই বা বোঝে। রিক্সা দিয়ে আসার সময় মাকে জড়িয়ে ধরে বাবলি খুব কাঁদে। পিংকিও আর কান্না ধরে রাখতে পারেনা। মা মেয়ে দুজন দজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। ঘরে ফিরলে শাশুড়ি জানতে চায় কোথায় যাওয়া হয়েছিল।

মা! বাবলিকে একটা নাচের অনুষ্ঠানে নিয়ে গিয়েছিলাম।

তা কি হলো?

পিংকি চুপ থাকে।

আমি জানতাম এ বেজন্মা বোবাটা কিছুই করতে পারবেনা।

মা! কথায় কথায় ওকে বেজন্মা বলবেন না। ও আমার মেয়ে।

মেয়ে না ছাই! যার জন্মের ঠিক নেই তাকে বেজন্মা বলবো না তো কি বলব? মা ডাক শোনার এতই শখ তো ওই ময়না পাখির ডাক শোনো। ওটাইতো মা মা ডাকতে পারে।

পিংকি কোন কথা না বাড়িয়ে বাবলিকে নিয়ে নিজের রুমে চলে যায়। রাতে বাবলিকে মা আকাশের তারা দেখাচ্ছে। জানালার ফাঁক দিয়েই আকাশটা দেখা যায়। ভরাট চাঁদ যেন তাদের আলোকিত করে রেখেছে। বাবলি ইঙ্গিতে জানতে চায়, তারারা কি কথা বলতে পারে?

নারে সোনা! পারেনা।

বাবলি ইঙ্গিতে বলে, তাহলে আমিও তারার দেশে চলে যাব। আমিও তো কথা বলতে পারিনা। পিংকি অজানা আতঙ্কে বাবলিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।

কোথাও যাবি না মা! তুই আমার কাছেই থাকবি।

৪র্থ পরিচ্ছেদ

এদিকে পিংকির স্বামীর চাকরিটা চলে যায়। শ্বাশুড়ি তেলে বেগুনে আগুন।

আগেই বলেছিলাম ওই বেজন্মার জন্য সংসারে কুদিন আসবে। এবার হলো তো! আর রাখা যাবেনা এই আপদকে।

পিংকির স্বামী বলে ওঠে

মা! শুধু শুধু ওর দোষ দিচ্ছ কেন?

কেন দিবো না বলতো? একের পর এক অশান্তি ধরেই আছে। এখন তোর চাকরিটা গেল। তাও বলছিস ওর কি দোষ! আমি বাপু একে আর রাখবো না।

তোমার যা খুশি করো। আমি চললাম।

এই রাতে কোথায় চললিরে বাপ!

যেদিকে দুচোখ যায়!

হায়! হায়ঞ্জ! ছেলেটা আমার চলে গেল।

পিংকি বাবলিকে শক্ত করে ধরে বসে আছে। শ্বাশুড়ি হেঁচকা টানে বাবলিকে ফেলে দেয়। বাবলির মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে। পিংকি শাশুড়ির পা ধরে।

মা! দয়া করুন! ও বাচ্চা, ও এখন কোথায় যাবে?

শাশুড়ি বাবলির চুল ধরে টেনে রুমের বাইরে ফেলে দিয়ে পিংকিকে ভেতরে আটকিয়ে দরজায় খিল দিল। বাবলির পুরো জামা রক্তে ভিজে যায়। বাবলিকে বের করে দেয়া হয়। বাবলি বাসার সামনে ফুটপাতে শুয়ে থাকে আর রক্ত ঝরতে ঝরতে দূর্বল হতে থাকে সে। সারারাত চেষ্টার পর পিংকি দরজার খিল ভেঙে রাস্তায় বেরিয়ে দেখে বাবলি ফুটপাতে শুয়ে আছে আর পুরো শরীর রক্তে ভেজা। বাবলিকে জড়িয়ে ধরে পিংকি কাঁদতে থাকে। পিংকি মায়ের কানে কিছু বলার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছেনা।

কিছু বলতে হবে না মা!

বাবলি তবুও চেষ্টা করছে! বোবা পাথরের আকুতি কে বা বোঝে! ক্ষীণ স্বরে বাবলি মায়ের কানে বলল, মা! এরপর মুখ ফোটা বোবা পাথর মৃত হলো। পিংকির মাতৃত্ব আজ পূর্ণ হলো বটে তবে তা রক্তাক্ত হলো। বাবলিকে বাকরুদ্ধ পিংকি শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে। তবে সে আর চোখ খুলবেনা, কারণ নিষ্ঠুর পৃথিবী থেকে অদেখা পৃথিবীটাই বোধ হয় শ্রেয়।

x