ভাবনার পাহাড়

সালেহীন আরশাদী

মঙ্গলবার , ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ at ৪:৫৪ পূর্বাহ্ণ
60

ঘর থেকে বেড়িয়ে পাহাড়ে যাওয়া মানেই আমার সেন্স অফ সিকিউরিটি ভুলে, কমফোর্ট জোন থেকে দূরে গিয়ে

খুবই সাধারণ ভাবে জীবনযাপন করা। এই লাইফ স্টাইলের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। যারা নিয়মিত এই লাইফ স্টাইল চর্চা করে থাকে তাদের কাছে ধীরে ধীরে এই ম্যাটেরিয়ালিস্টিক পৃথিবীর অর্থ পাল্টে যায়।

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

এখন কে তাদের বোঝাবে ঐ দূরের দূর্গম পাহাড়ে যেখানে কেউ থাকে টাকে না সেখান থেকে গাছ কেটে আনায় আসলে আমাদের ক্ষতিটা কি হচ্ছে। গাছ কেটে ফেলার কারণে যে প্রস্রবণগুলো একে একে মরে যাচ্ছে সেটা তো তারা দেখতে পাচ্ছে না, বুঝতেও পারছে না। পানির অভাবে ঝিরিগুলোও যে একে একে মরে যাচ্ছে সেটা তারা কিভাবে বুঝবে যতক্ষন পর্যন্ত না তারা বাকতলাইয়ের পানিশূন্য মলিন ভেজা দেয়াল দেখবে। তারা তো মার্চের কাঠফাটা গরমে হুট করে তাজিংডং থেকে মধ্য দুপুরে শিপলাম্পি পাড়ায় হাজির হয়ে দেখেনি পানির অভাবে পুরো গ্রামের মানুষ কতটা কষ্ট পাচ্ছে। তাদের এই গাছ কাটা, ঝিরি থেকে পাথর তোলা, পাহাড় কাটার কারণেই যে গত বছর বন্যা হল, অতিবৃষ্টিতে পাহাড় ধ্বসে এতগুলো মানুষ মারা গেল, থানচি উপজেলার বিস্তির্ণ এলাকা জুড়ে খাদ্যাভাব দেখা দিল, এসব তারা কিভাবে বুঝবে। তাদের চোখ থেকে ভোগবাদী সমাজের এই বিভ্রান্তিকর সুখের পর্দা তো এখনও সরে যায় নি!

তিন.

আমাদের পাহাড়গুলো দেশের অন্যান্য জায়গার তুলনায় সবচেয়ে বেশী নিরাপত্তা ভোগ করে। সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ডের বাইরে পুলিশ র‌্যাবসহ সব নিয়মিত বাহিনী দিয়ে পুরো পার্বত্য অঞ্চল বেষ্টন করে রাখা আছে। এর পরেও আমি ঠিক বুঝতে পারি না প্রশাসনকে একেবারে নাকের ডগায় রেখে কিভাবে এইধরনের বেআইনী কাজগুলো দিনের পর দিন ধরে চলতে পারে? এতগুলো আর্মি ক্যাম্প ফাঁকি দিয়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে কিভাবে কাঠের লগ পাচার হতে পারে। কিভাবেই বা সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে তৈরি করা রুমা বাজার থেকে বগা লেকের ৩০ফিট চওড়া রাস্তা তৈরিতে রুমা খালের পাথর ব্যবহার করা হয়।

তখনই উত্তর মিলে এটা চাহিদা। আমার চাহিদা, তোমারও চাহিদা, সবটা মিলে আমাদের সম্মিলিত চাহিদা। আর কে না জানে বাজারে চাহিদা থাকলে যোগান দিতেই হবে, যেকোন উপায়েই তা হোক না কেন।

আমার সবচেয়ে বেশি অবাক লাগে সভ্যতার অগ্রগতি মানেই নাকি এইসব চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়া। এটি এমন এক সামাজিক ব্যাধি যার চিকিৎসা করাতে কেউ চায় না। তাই তো কেউ কখনো বলে না আমরা আমাদের চাহিদা গুলো কমিয়ে ফেলি। কেন আমরা বুঝতে পারিনা রামপাল আর রূপপুর বানানো হচ্ছে আমাদেরই বাড়তি চাহিদার যোগান দেয়ার জন্য। কেউ কেন বলে না আমরা কাঠের আসবাব ব্যবহার করা বন্ধ করে দেই। মাটিতে বিছানা করে শুই। কেউ বলে না বিদ্যুতের ব্যবহার টা একটু কমিয়ে ফেলি, এসিটা অহেতুক ব্যবহার না করি। সবাই শুধু সুখ নামের এক আলেয়ার পিছে ছুটছি। আমাদের শেখানো হয়েছে এটা না পেলে, সেটা না পেলে আমি সুখী হবই না। এসব নতুন নতুন প্রযুক্তি ও পণ্য আমাদের জীবন দ্রুত করে দিচ্ছে, আরও সহজ করে দিচ্ছে। আমাদের কায়িক শ্রম কমে যাচ্ছে। আমরা অকর্মন্য হয়ে পড়ছি। আর এই অকর্মন্যতাই নাকি সভ্যতার অগ্রগতি।

কিন্তু আমরা বুঝতেই পারি না আমাদের জীবন যত দ্রুত হবে ততই তাড়াতাড়ি তা শেষ হয়ে যাবে। ধ্বংসের মধ্য দিয়েই যে সভ্যতা পূর্ণতা পায় সেটা তো ইতিহাসই সাক্ষী দেয়। এই দ্রুত থেকে দ্রুততম জীবন, উন্নয়ন, অগ্রগতি, সুখের জীবন যে একটা বিভ্রান্তি তা আমরা কেউই বুঝে উঠতে পারি না। আর তাই তো আমরা এইসব অপ্রয়োজনীয় ও অহেতুক চাহিদাগুলোকে ত্যাগ করে সরল ও সাধারণ জীবন যাপন করার কথা কল্পনাতেও আনতে পারি না।

ঘর থেকে বেড়িয়ে পাহাড়ে যাওয়া মানেই আমার সেন্স অফ সিকিউরিটি ভুলে, কমফোর্ট জোন থেকে দূরে গিয়ে খুবই সাধারণ ভাবে জীবনযাপন করা। এই লাইফ স্টাইলের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। যারা নিয়মিত এই লাইফ স্টাইল চর্চা করে থাকে তাদের কাছে ধীরে ধীরে এই ম্যাটেরিয়ালিস্টিক পৃথিবীর অর্থ পাল্টে যায়। খুব প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া অহেতুক বিলাসী চাহিদা কমে যায়। পুঁজিবাদী এই সমাজ কাঠামো থেকে ততই নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার তাগিদ চলে আসে। খুব অল্পতেই তখন চাহিদা মিটে যায়। চাহিদা মেটানোর জন্য তখন দুশ্চিন্তা করতে হয় না। জীবন সরল ও স্বচ্ছ হয়ে উঠে। অহেতুক জটিলতা দূর হয়ে জীবনে প্রশান্তি চলে আসে, আর এটাই তো জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিৎ।

চার.

মাঝে মাঝেই আমার মনে হয় এই যে এত এত পড়ালেখা জানা শিক্ষিত আমলারা আছেন আমাদের সরকারে, তারা কেউ কি এই বিষয়গুলো অনুধাবন করেন না? এই জিনিসগুলো খারাপ হচ্ছে, এই জিনিসগুলো ভাল হচ্ছে, এটা করলে এই ক্ষতি হবে, ওটা করলে এই লাভ হবে, কিভাবে এই সমস্যাগুলোর সমাধান করা সম্ভব, এই বিষয়গুলো কেন তারা মন দিয়ে দেখেন না? এগুলো তো এতটাও জটিল কিছু নয়, শুধু সদিচ্ছাটুকু দরকার। এইসব প্রশ্নের জন্যেও একটি উত্তরই সামনে আসে, তারাও ঠিকভাবে এইসবের গুরুত্ব ঠিকভাবে অনুধাবন করেন না। পাহাড়ে গেলে ঠিক কি হয় এটাই তো তারা এখনও বুঝে উঠতে পারেননি।

পাহাড়ে ঘুরলে একসময় অন্তর্দৃষ্টি খুলে যায়। সমাজের চাপিয়ে দেয়া ঠুলি খুলে ফেলা যায়। হাবিজাবি প্রয়োজনীয়তা কমে যায়। এই ভোগবাদী ও বৈষয়িক চাহিদাগুলো দিন দিন কমতে থাকে। প্রকৃতিকে উপভোগ করার পাশাপাশি এর সম্পর্কে সংবেদনশীলও হয়ে ওঠে। তাই আমি খুব পরিষ্কারভাবে বলতে পারি, এই সমস্যাগুলো পুরোপুরি বুঝে উঠতে আর আসন্ন এই বিপর্যয় থেকে আমাদের রক্ষা করতে হলে আমাদের পাহাড়কে খুব কাছ থেকে জানতে হবে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, আমরা আজকাল আমাদের দেশের পাহাড়েই যাবার অধিকার রাখি না।

কেন আর কি কারণে আমি আমার নিজ দেশের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে যাবার অনুমতি পাই না সেটার সুস্পষ্ট কোন কারণ এখনও আমার জানা নেই। স্থানীয় প্রশাসন আমাদের বলে থাকে পাহাড়ের এই অঞ্চলগুলো আমার জন্য নাকি নিরাপদ নয়। কিন্তু যারাই আমাদের পাহাড়গুলোতে অল্প বিস্তর ঘুরাঘুরি করেছেন তারা মাত্রই বুঝতে পারবেন এই ধরনের দাবীর পিছনে সত্যিকার অর্থে তেমন কোন কারণ নেই। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে পাহাড়ের চাইতে নিরাপদ জায়গা আর দুটি পাইনি। আর পাহাড়ে যতটুকুই বিপদের সম্ভাবনা থাকে তা সমতলে তার চাইতে কয়েকগুণ বেশিই হবে। তাই সমতলেই আমি সবসময় অস্বস্তিতে থাকি।

মাঝে মাঝে ভাবি আমি যেন সেই বেআইনী কাজগুলো দেখে না ফেলি, দেখে এসে হইচই না করতে পারি সেই কারণে সুকৌশলে আমাদের পাহাড় থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে না তো? এই যে আমাদের তরুণেরা যে পাহাড়ে যাওয়া শুরু করেছিল তাদের যে এভাবে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হল সেটার কারণ আমি বুঝে উঠতে পারিনি এখনও।

ইন্ডিয়া, নেপাল, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, পুলিশ বাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীর রীতিমত পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ হয়। তাদের মধ্য থেকে চৌকস দল নিয়মিত পর্বতারোহণ করে থাকে। আমাদের দেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোতে এই ধরনের স্পোর্টসের চল কেন নেই এটাও আমাকে বিস্মিত করে।

পাঁচ.

আমি আইজাক আসিমভের অসম্ভব রকম ভক্ত। তার ফাউন্ডেশন সিরিজের এনসাইক্লোপিডিয়া গ্যালাকটিকার সাইকো হিস্টোরির থিওরিটা আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি। এই থিওরি অনুযায়ী, বিরাট সংখ্যক মানুষ একই সাথে যখন কোন কিছু ভাবে বা চিন্তা করে সেটাই একসময় গিয়ে ভবিষ্যতকে নিয়ন্ত্রণ করে।

দুঃখজনক হলেও সত্যি, বর্তমানে এই ২০১৭ সালেও আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের কাছে পাহাড় মানেই হচ্ছে আতঙ্ক। বেশিরভাগ মানুষই ভাবে সেখানে একদল জংলি, অসভ্য ও বুনো লোক থাকে। তারা জামা কাপড় পড়ে না, আজগুবি সব খাবার খায়, শিকার করে, বাইরের মানুষকে সহ্য করতে পারে না, বাঙালি দেখলেই ক্ষতি করে। পাহাড়ের মানুষদের জীবনধারা, সংস্কৃতি ও বৈচিত্রময় সভ্যতা সম্পর্কে আমাদের অনেকের কোন ধারণা নেই। পাহাড়সমতলের মানুষ একে অপরকে যদি ভালভাবে জানতেই না পারে তাহলে এই সমস্যা কি করে সমাধান করা সম্ভব?

খুব অল্প কদিন হল আমাদের দেশের তরুণরা ঘর থেকে বের হচ্ছে, দেশবিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছে। নানা রকম সমাজ, সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হচ্ছে। ধীরে ধীরে তাদের সামনে সৃষ্টির রহস্যগুলো উন্মোচিত হচ্ছে। এই অল্প কয়েক বছরে পাহাড় অনেকের জীবনই পাল্টে দিয়েছে। সেই সংখ্যাটা একেবারেই ফেলনা নয়। যতদিন যাচ্ছে পাহাড়ে যাবার প্রবণতা ততই বাড়ছে।

আমি জানি রাতারাতি কোন কিছুই পরিবর্তিত হবে না। কেউ যাদুমন্ত্রবলে সবকিছু আবার সুসজ্জিতভাবে সাজিয়ে দেবে না। এর জন্য দীর্ঘদিন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। এই প্রজন্মের তরুণরা যখন এই উচ্ছল জীবনধারাকে বেছে নিয়ে নিয়মিত এর চর্চা করে যাবে ততই আমাদের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হবে। সবার মনে যখন একসাথে এই হাহাকার উঠবে তখনই অবস্থার পরিবর্তন হতে বাধ্য। এই প্রজন্মের তরুণতরুণীরা একদিন সরকারের নীতি নির্ধারক পর্যায়ে যাবে। তখনই অবস্থার পরিবর্তন হবে, তার আগে নয়।

সরকারের উচিত সম্ভাবনাময় ও সম্পদশালী আমাদের এই বিশাল পার্বত্যভূমিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য একটি কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া। দেশের সংরক্ষিত বনগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও নিয়ন্ত্রিত অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমকে প্রোমোট করা। পর্যটকদের দৃষ্টি সবসময় একটি দর্পণের মত কাজ করে। গ্রহনযোগ্য কোন কারণ ছাড়া এভাবে পর্যটকদের পার্বত্য অঞ্চলে প্রবেশ করতে না দিলে সেখানকার প্রকৃত চিত্র কখনোই প্রকাশ্যে আসবে না। তাছাড়া নিয়ন্ত্রিত পর্যটন এই বিশাল অনগ্রসর এলাকার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদা গুলো নিশ্চিত করে একটি কাঠামোগত টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। তাই বলে সাজেকের মত অপরিকল্পিত কোন আধুনিক বস্তি হোকএটাও আমি চাই না। বিভিন্ন দিক গবেষণা করে এমন একটি মডিউল বানাতে হবে যেন সেখানকার প্রকৃতির উপর, স্থানীয় মানুষের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির উপর কোন রকম বিরুপ প্রভাব না পড়ে। এই আন্তর্জাতিক পর্বত দিবসে তাই আমার একটাই চাওয়া, পাহাড়ে যাওয়া সকলের বোধ জাগ্রত হোক।

x