ভাষাবিদ অধ্যাপক মাহবুবুল হক নিভৃতচারী ভাষার জাদুকর

সফিক চৌধুরী

শনিবার , ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ at ৬:১৯ পূর্বাহ্ণ
87

ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমাদের মধ্যে বাংলা ভাষা আর সর্বস্তরে তার প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা, বক্তৃতা-বিবৃতির অন্ত থাকে না। যদিও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘ভাষা-শিক্ষায় সাম্প্রদায়িকতাম্ব লেখায় লিখেছিলেন, ‘ভাষামাত্রেরই একটা মজ্জাগত স্বভাব আছে, তাকে না মানলে চলে না।ম্ব তার মানে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রয়োগ করলেই হবে না, সেই ভাষার ব্যবহার হতে হবে ব্যাকরণের যথাযথ নিয়ম মেনে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, বাংলা ভাষার সঠিক ব্যাকরণ জানা ও ভাষার যথাযথ প্রায়োগিক জ্ঞান সম্পন্ন লোকের সংখ্যা অতি নগণ্য। অথচ বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভের পর বাংলাকে বিশ্বের সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষে আমাদের দরকার বাংলা ভাষার পাণ্ডিত্য সম্পন্ন মানুষ। বাংলা ভাষার সেই অল্প সংখ্যক পাণ্ডিত্য সম্পন্ন মানুষের একজন অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক যিনি একাধারে গবেষক, ভাষাবিদ, অধ্যাপক, প্রবন্ধকার, বিতর্ক সংগঠক, কলাম লেখক আর সর্বোপরি দীর্ঘদিন বাংলা ভাষা, বানান রীতি-নীতি, বাংলা ব্যাকরণ ও প্রাথমিক ও উচ্চ শিক্ষা নিয়ে কাজ করা একজন বহুমাত্রিক মহান শিক্ষক।
চবিম্বর প্রাক্তন অধ্যাপক মাহবুবুল হক স্যারের জন্ম ১৯৪৮ সালের ৩ নভেম্বর। তাঁর জন্মস্থান ফরিদপুর জেলার মধুখালিতে। তবে শৈশব থেকে তিনি বেড়ে ওঠেছেন চট্টগ্রামে। অধ্যাপক মাহবুবুল হক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৯ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৭০ সালে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে পিএইচডি ডিগ্রিও অর্জন করেছেন একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। নিভৃতচারী কর্মযোগী ও ভাষাবিদ মাহবুবুল হক স্যার এ বছর প্রবন্ধে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। স্যারের এই পুরস্কার প্রাপ্তি যতটা না তাঁকে আনন্দিত আর গর্বিত করেছে, তার চেয়ে বেশি আনন্দ আর গর্বিত করেছে তাঁর দেশ বিদেশে ছড়িয়ে থাকা হাজারো গুণমুগ্ধ স্বজন, বন্ধু, শুভার্থী আর স্নেহাস্পদ শিক্ষার্থীদের।
বহুগুণে গুণান্বিত অধ্যাপক মাহবুবুল হক শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রায়োগিক বাংলা ও ফোকলোর চর্চা, গবেষণা, সম্পাদনা, অনুবাদ ও পাঠ্যবই রচনা করে সমাদৃত সকলের কাছে। বিশেষজ্ঞ হিসেবে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডসহ নানা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত তিনি। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের বেশ কয়েকটি বাংলা পাঠ্য বইয়েরও রচয়িতা অধ্যাপক মাহবুবুল হক। তাঁর চল্লিশটিরও বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশ, ভারত ও পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে। প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম প্রণয়নে সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে তাঁর। এছাড়াও যুক্তিবাদী সমাজ গঠনের প্রত্যয়ে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই চিটাগং ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির উপদেষ্টা ও মডারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
মাহবুবুল হক স্যারের সংস্পর্শে যিনিই এসেছেন, তিনিই তাঁর সাথে পরিচিত হয়ে দেখেছেন তীক্ষ্ন জ্ঞান, উদারতা আর বিনয় স্যারকে অন্য অনেকের চেয়ে করেছে ব্যতিক্রম। বাংলাকে সঠিকভাবে চর্চা ও ভাষাকে ভালোবেসে তাকে ধারণ করার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য বাংলা জ্ঞান নির্ভর শিক্ষা প্রসারে ব্রত রয়েছেন নিভৃতচারী অধ্যাপক মাহবুবুল হক। স্যারের সাথে পরিচয়ের সুবাদে দেখেছি স্যার কথা বলেন একটু কম, কিন্তু তিনি যখন বলেন তখন যে কোন আড্ডায় সকলেই তাঁর গুণমুগ্ধ শ্রোতা।
অধ্যাপক মাহবুবুল হক বাংলা ভাষার অনন্য এক দিকপাল। তিনি আমাদের গর্ব, তিনি তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। ভাষা নিয়ে তাঁর কর্মে কী নেই, ভাষার নানাদিকের সবটুকুই পাওয়া যায় তাঁর লেখা ও কর্মে। সে যাই হউক, আমাদের বর্তমান সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থা আজ নানাভাবে জরাগ্রস্ত, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য আজ অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত। কিন্তু ভাষার প্রতি এই দীনতা না কাটলে এবং বাংলাকে সঠিকভাবে ধারণ করতে না পারলে অন্য ভাষা কখনোই আমাদের এগিয়ে নিতে পারবেনা। কারন আমরাতো জানি, যে কোন জাতির এগুতে হলে আগে চাই তাঁর নিজ ভাষার গাঁথুনি, তারপর অন্য ভাষার চর্চা। অধ্যাপক মাহবুবুল হক স্যারের বাংলা একাডেমি পদক আমাদেরকে সেই জরা কাটিয়ে জাগরণের নতুন সম্ভাবনা দেখিয়েছে। তাই এমন দিনে আলোর পথযাত্রি স্যারের প্রতি একটিই অনুরোধ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াসে আপনি এগিয়ে যান। আপনার গুণমুগ্ধ স্বজন, বন্ধু, শুভার্থী আর স্নেহাস্পদ শিক্ষার্থী সকলে আছে আপনার সাথে।
কারণ আপনিই আমাদের শিখিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়, খুলে যাবে এই দ্বারস্ত জানি জানি তোর বন্ধনডোর ছিঁড়ে যাবে বারে বারম্ব।

x