মনিকা নাহারের ‘ফুড়ুৎকার’ গল্প নিয়ে গল্প

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ২৮ এপ্রিল, ২০১৮ at ১১:৫৯ পূর্বাহ্ণ
31

মাঝে মাঝে ভাঁড়ার ঘরের এককোণে ডাঁই করে রাখা পুরনো পত্রিকার স্তূপ থেকে দু’পাতার একটা সাহিত্য সাময়িকী টেনে হলদেটে পুরনো দৈনিক পাতার মায়ায় ডুবে থাকি কিছুক্ষণ। ২০ জুলাই ২০১২’র তারিখ মুদ্রিত দৈনিক প্রথম আলোর পাতাটিতে মনিকা নাহারের গল্পটা আগে পড়েছি কি? পড়তে পড়তে মনে হলো পড়েছি তো বটেই। আবার পড়বো বলেই পাতাটা রেখে দেওয়া। গল্পের অলঙ্করণে মাসুক হেলাল মাথার চুল থেকে নিতম্বদেশ অব্দি অন্ধকার এক নারী মূর্তির সবটুকু জুড়ে ছন্দোময় টেউয়ে নেমে আসা কয়েকটি নারী মুখ এঁকেছেন। গল্পের চরিত্র ভেবে আঁকা এ চিত্রটি ভারি সুন্দর। কানাডাপ্রবাসী মনিকার এ গল্প (ফুড়ুৎকার) পাঠের অভিজ্ঞতা প্রিয় পাঠক, আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই।

দেশে মোটামুটি গোছের একটা সরকারি চাকরি ফেলে যাওয়া গল্পের কথকচরিত্রের আব্বা যখন কানাডায় রিফুইজি ক্লেইমের প্রাণান্ত চেষ্টায় রত তখন তার আম্মা বাঙালি গ্রোসারের ক্যালেন্ডারে সরষেখেতের ছবি দেখে বর্ষাকালের মতো কাঁদে, শুধু কাঁদে। স্ত্রীকন্যার বেদনার্ত চোখেমুখে পরিবারপ্রধানের তীব্র তিরস্কার যেভাষায় আছড়ে পড়ে তা হচ্ছে, ‘আমাকে নয়, দেশের ৯০ পার্সেন্ট মানুষ ডেকে জানতে চাও, সবাই এক পা বাইরে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর তোমাদের এখানে ভালো লাগে না। ইয়ার্কি মারবে না আমার সঙ্গে।’

১৫ বছর আগে দেশে ১৫টি বসন্ত পার করে যাওয়া এ গল্পের কথক চরিত্রের মুখে আমরা শুনি তার আব্বার কথা একটা ভদ্র চাকরি যোগাড় করতে না পেরে যিনি প্রায় উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন। আসলে তিনি কিছুই পারেন নি। নানা ফন্দি ফিকির করে ক্যাশ টাকায় রেস্টুরেন্টে কাজ করে যে বাঙালিরা দেশে প্লট কেনে তিনি তাদের একজনও হতে পারেন নি। উল্টো এক সময় অকস্মাৎ গর্ভবতী হয়ে পড়া স্ত্রীকে নিয়ে তিনি দারুণ বিব্রত। স্ত্রীকে একরকম না জানিয়ে জন্মের আগেই অ্যাডাপ্টেশন সেন্টারে দত্তক দেওয়ার লিস্টে অনাগত সন্তানের নাম লিখিয়ে এসেছেন তিনি। দিনের পর দিন চাপে রেখে শেষ পর্যন্ত স্ত্রীর সম্মতিও আদায় করেছেন। তারপরেও আম্মাকে সোশ্যাল ওয়ার্কারের প্রশ্নের জবাব দিতে হয়েছে দিনের পর দিন। সমাজকর্মী ফ্রাঁসোয়ার ধারণা এভাবে সন্তান দত্তক দেওয়া বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে মেলে না।

টুকটুকিবিহীন আম্মা বাড়িতে ফিরেছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যে ঘরের এককোণে টুকটুকির বিছানা সাজানোতে এবং পুরনো শাড়ি ছিঁড়ে ওর কাঁথা বানানোতে তার ব্যস্ত হয়ে পড়াটা অস্বাভাবিক মনে হয়। আসলে কিভাবে আম্মা যেন জেনে গেছে যে, লোকাল অ্যাডাপ্টেশন বিশেষ করে একই প্রদেশের মধ্যে হলে সন্তান ফেরত পাওয়ার উপায় আছে। সারাদিন আম্মা তাই ফোনে ব্যস্ত। এই নিয়ে রাগারাগি করে আব্বা একদিন ডাইনিং টেবিলের একটা চেয়ার ভাঙ্গে। তারপর ছুরিকাঁচির খোঁজ করতেই আম্মা তড়িৎগতিতে নাইন ওয়ান নাইনে কল দেয়। অতঃপর বদলে যাওয়া জীবনে আব্বা আর আব্বা থাকেন নি। এ বাড়ির দু’শ গজের মধ্যে পুলিশ কাস্টডিতে থাকা আব্বার ছায়াও তখন নিষিদ্ধ ছিল। একটা দীর্ঘ সময় জুড়ে ক্রাইসিস সেন্টার থেকে সেন্ট্রাল জেল, সেখান থেকে ক্রাইসিস সেন্টারণ্ড এই ছিল আব্বার ঠিকানা।

মনিকার ‘ফুড়ৎকার’ গল্পের বীজঅংশটি আব্বাকেন্দ্রিক। একদা সোনারহরিণের স্বপ্নে বিভোর এক মানুষ কানাডার কিউবেক অঞ্চলে ব্যর্থ এক পরিযায়ী জীবনে অভ্যস্ত হন। ইমিগ্রেশন কানাডায় যাঁর রিফ্যুজি ক্লেইম ঝুলে থেকেছে বছরের পর বছর। শেষ পর্যন্ত দুর্ভাগ্যের ফেরে ডিপোর্টেশন নোটিশ পাওয়া এই পরিবার প্রধানের কিছুই হলো নাণ্ড না কোনও ভাষাশেখা, না একটা চাকরি। আমাদের আলোচনা তাঁকে দিয়ে শুরু হলো বটে, মনিকায় গল্পের শুরুতে কিন্তু তিনি নেই। গল্পটা ঝিরিঝিরি তুষারপাতের এক ঘোর লাগা ছবি দিয়ে শুরু হতে পারতো। কিন্তু গল্পকারের আবেগ যেখানে কাজ করেছে সেখানে গররগরর শব্দ তোলা সসপ্যানের ফুটন্ত পানির উষ্ণভাপ দু’হাতে মেখে নিয়ে কথকচরিত্র আমাদের জানিয়ে দেয় যে তার আম্মার ভাষ্যে এটি ‘কুসুম গরম’ পানি। কিন্তু আমরা জানি ভাপ ওঠা পানি কুসুম গরম পানি নয়। এই ভুলটি মা ও মাতৃভাষার পক্ষে গল্পকারের একটি আবেগী ভুল। অতঃপর তুষারপাতের ‘সুখী, করুণ শিশুতোষ আচ্ছন্ন ঘোরলাগা’ এক ছবির মধ্য দিয়ে গল্পটা যেন উড়ে আসতে থাকে। এ সময় গল্পকারের মগজে ঘাই মারে নরসিংদীর রাস্তাঘাট। অথচ দেশ ছেড়ে এসেছে আজ ১৫ বছর। তার আগে ফেলে আসা পনেরোয় নরসিংদীর নিমফুল, দাগলাগা পানির গেলাস, স্কুলের জংধরা নিঃসঙ্গ টিউব ওয়েল এখনও স্মৃতিতে অটুট। মনে পড়ে আব্বার সরকারি অফিসের মনমরা সিঁড়ি।

ছোট বোন অনু এরই মধ্যে বেরিয়ে যাবার সময় দরজাটা বন্ধ করেনি। সে দরজা বন্ধ করতে গিয়ে তালাবন্ধ করার অনেক দিনের পুরনো অভ্যেসটি মনে পড়ে যায় গল্পকারের। ….প্রথমে কলাপসিবল গেট, সেখানে বড় তালা, ঘটাং। তারপর ভেতরের ছোট গেটে আরেকটি তালা, সামান্য ঘটাং। ঘষায় ঘষায় সাদা হয়ে যাওয়া ঘরের কপাটের সোনালি কড়ায় তালা, কোনো ঘটাং নেই। অনুর মন থেকে চুরিচামারির ভয় ডর একেবারেই উবে গেছে। দরজা তো অদরকারি, জামাজ্যাকেটের বোতামেরই খেয়াল থাকে না ওর। বিদেশ বাসের স্বাভাবিক অভ্যস্ততার স্রোতে অনু ভাসছে। কিন্তু দোটানায় ভুগছে আম্মা ও তার জ্যেষ্ঠ কন্যা, গল্পকার বা গল্পের কথকচরিত্র। মন্ট্রিয়েলে ১৫ বছর পেরিয়ে গেল অথচ পাতা ফুটিয়ে ঘন দুধের চায়ের অভ্যেসটি আম্মা নিজে ছাড়তে পারেন নি, জ্যেষ্ঠ কন্যাটিকেও সে অভ্যেসের বৃত্তে রাখতে চান এমনকি টুকটুকিকেও ধরিয়ে দিতে চান ঘন দুধচা। টুকটুকি সে চা খায় না বলে আম্মার চিন্তা, মেয়েটা মইরা যাবে তো। কথককে তাই বলতে হয়, চা না খাইলে মানুষ মরে না। আম্মার ঘ্যানরঘ্যানর টুকটুকি সংক্রান্ত কথা অনু মোটেই সহ্য করে না। টনটনে জেদি ষাঁড়ের মতো ওর কথার শিং তেড়ে আসাকে আম্মা ভয় পায়। ভয় পাওয়ারই কথা। অনু ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটিতে বায়োলজি পড়ে নিজের খরচে। যেন তেন মজদুরি নয়, রীতিমতো টিচিং অ্যাসিস্টেন্টশিপ করে পড়ে। ওর আইশ্যাডো লাগানোতে বা ফেসবুকটুইটারে জান বাজি রেখে পড়ে থাকাতে কার কী বলার আছে?

মনিকা নাহারের ‘ফুড়ণ্ডৎকার’ যে কোনও মনে লাগা গল্পের মতো শেষ পর্যন্ত জীবনের গল্প তো নিশ্চয়ই। পুলিশ কাস্টডিতে থাকার সময় কয়েকবার বাসার সামনের বাস স্টপে আব্বাকে বসে থাকতে দেখা গেছে। ওরা জানালার পর্দাটা একটু তুলে আবার ফেলে দিত। জানালার কাছে টুল টেনে তার ওপরে দাঁড়িয়ে জানালার উপরের ঘুলঘুলি দিয়ে অপলক আব্বাকে দেখে মন কেমন করে উঠত কথক চরিত্রের। আব্বার হাঁটুর কাছে দুমড়ানো প্যান্ট, খোলা চোখ একঠাঁয় দাঁড়িয়ে দেখতো পায়ে ঝিঁ ঝিঁ লাগা পর্যন্ত। এমন দৃশ্যে টুকটুকি যাতে কৌতুহলী না হয় সেজন্য আম্মা ওর প্রিয় চ্যানেলটি চালিয়ে দিয়ে নির্বিকার ঘরের কাজ করে যেত। অথচ এই আম্মা একদিন আব্বার পছন্দের ছানার জিলিপি বানাতে শ’খানেক লিটার দুধ খরচ করেছে।

কোনওদিন জিলিপি বিটকেলে শক্ত, ফুললোই না। কোনও দিন ফুললো, রংটাও জাঁহাবাজকিন্তু সকালে উঠে দেখা গেল সব ন্যাতানো, চ্যাপ্টা। দৈবক্রমে দু’একবার শিকে ছিঁড়েছেও বটে। তখন আব্বার মতো সুখী মানুষ আর কেউ দেখেনি। আমাদের গল্পকার ইমিগ্রেশন কানাডার মুড সম্পর্কে বলতে গিয়ে আম্মার ছানার জিলিপির প্রসঙ্গ টেনে উভয়ের ‘মুড স্যুইং’য়ে ভোগার কথা বলে। মনিকা বাংলা ট্যাবলয়েডের বিজ্ঞাপনের পাতায় ছাপা প্রতিটি লোকাল মুখের পেছনকার গল্প খুঁজে বেড়ায় নিজের মনে। এ গল্পেও তারও পরিচয় পাই আমরা। প্রবল আত্মবিশ্বাসী শঙ্খসাদা দাঁত আর ঝকঝকে কালো চেহারার সমাজকর্মী ফ্রাঁসোয়াকে গল্প কথকের খুব ভালো লাগে। তার বলতে ইচ্ছে হয়, ‘আমাকে বিবাহ করিয়া ফেলো।’ কিন্তু ফ্রাঁসোয়ার দুষ্টুমিভরা ঘুষি বাগিয়ে আসা চেহারার কথা ভেবে কথাটা আবার পেটে চালান করে দিয়েই গল্পকারের স্বস্তি। দুটোই কিন্তু জীবনের লক্ষণ। কৈশোরের শেষ স্টেশনে পৌঁছে যাওয়া টুকটুকিও গল্প শেষে জীবনের স্বপ্নে বিভোর। এই টুকটুকির সঙ্গে আম্মা সারাক্ষণ নিজের শৈশব, হজমিওয়ালা, চালতার আচার আর কিছু বুড়ির গল্পের চিৎকার গুঁজে দিয়ে ঘণ্টা বাজায়। দ্বিতীয় যে প্রক্রিয়ায় আম্মা জীবন খোঁজে সেটি হচ্ছে রান্না। এক ফুড়ুৎকারে এ জীবন কি উড়িয়ে দেওয়া যায়? বা উড়িয়ে দেবার মতো কি এ জীবন? কিন্তু দিতে তো হয়। তাই বুঝি মনিকার গল্পের নাম ‘ফুড়ুৎকার’। হবে হয় তো! কিন্তু কাজ সেরে ঘরে ফিরে আম্মার বর্ষণক্লান্ত খড়ের চালার মতো ভারি চোখের পাতাদুটো কি এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দেয়া যায়? মণিকা নাহার কি তা পারেন? গল্পটা শেষ পর্যন্ত হাহাকার হয়ে আমাদের ঘিরে থাকে।

x