মাতৃত্বকালীন ছুটিতে বিভাজন

আনোয়ারা আলম

শনিবার , ২৮ এপ্রিল, ২০১৮ at ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ
9

একজন নারী কর্মজীবনে প্রবেশ করেন অনেক আশা ও প্রত্যাশা নিয়ে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বড় সংকট হয়ে আসে তার মা হওয়া। প্রথমত: মাতৃত্বকালীন সময় এবং পরবর্তীতে যুক্ত হয় আরো বিচিত্র প্রতিবন্ধকতা। তথা সন্তানের দেখভাল পরিচর্যা নিরাপত্তা বা কোথায় বা কার কাছে রেখে আসা ইত্যাদি। পরম বিস্ময়ের ব্যাপার মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে কার্পণ্য কিন্তু উন্নত অনুন্নত অনেক দেশে। যেমন চীনে মাতৃত্বকালীন ছুটি তিনমাস তবে এ সময়ে বেতন পাবেন অতি অল্প। যুক্তরাষ্ট্রে তিন মাস ছুটি হলেও অনেক প্রতিষ্ঠান বেতন দিতে বাধ্য নন! তবে ব্রিটেনে সবচাইতে বেশি তথা নয় মাস সাথে ৯০ শতাংশ বেতন। ভারতে এই সেদিনও ছিল তিনমাস কিন্তু এটি বাড়ানো হয়েছে। এ বিষয়ে ভারতের অ্যাসোসিয়েটেড চেম্বারস অব কমার্সের জরিপ বলছে, ‘সন্তান হওয়ার পরে সে দেশের এক চতুর্থাংশ নারী চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। তবে উন্নত দেশগুলোতে বিজ্ঞানসম্মত এবং আধুনিক দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে আর জাপানেতো শিশুর বয়স এক বছর হওয়ার পরেই তাদের উপযোগী বিশেষ স্কুলে দিতে হয় বাধ্যতামূলকভাবে। মাতৃত্বকালীন ছুটির বিষয়ে বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর অনীহা সম্ভবত: সবচাইতে বেশি। এর পেছনে কারণগুলো সহজেই অনুমেয়। একটা সময়ে বাংলাদেশে মাতৃত্বকালীন ছুটি ছিল প্রসবের আগে পরে চল্লিশদিন। যে কারণে অনেক মাকে মাতৃত্বের প্রাধান্যে চাকরিকে বিদায় জানাতে হয়েছেব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার চিত্রটাও একই। বর্তমানে এটির গুরুত্ব অনুধাবন করে সময় বেড়েছেবাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ৪৫ ধারা অনুযায়ীঅন্তঃসত্ত্বা শ্রমিক সন্তান প্রসবের আগে ৮ সপ্তাহ এবং প্রসবের পরের ৮ সপ্তাহ ১৬ সপ্তাহ পূর্ণ মজুরিতে ছুটি পাবার অধিকার রাখেন আর এ ছুটি ভোগ করা যাবে সর্বোচ্চ দুবার।

২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে সরকার সার্ভিস রুল সংশোধন করে সরকারি নারী কর্মকর্তাদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস করেছে। তবে এ বিধান শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চাইলে এ বিধানটি অনুসরণ করতে পারে। এক্ষেত্রে আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো এ বিধি অনেকেই অনুসরণ করে।

তবে মজার ব্যাপার এ বিধি জারীর পরে ২০১২ সালের ১২ জুলাই বিজিএমইর পরামর্শ ‘নারীদের এ ছুটি জন্মহার বাড়াতে পারে।’ (সূত্র: bdnews24.com) প্রশ্নটা এসে যায় পোশাক নারী কর্মী যাদের অবদানে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে দ্বিতীয় স্থানে দেশতাদের ক্ষেত্রে কতজন এ ছুটিভোগ করেন? নাকি অনেকে চাকরিচ্যুত হন? কিছুদিন আগে দৈনিক প্রথম আলো কর্তৃক আয়োজিত ‘নির্মাণ শিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনা বিষয়ে গোল টেবিলে নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটির বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে।

ছয়মাস পর্যন্ত নবজাতক শিশুকে শুধুমাত্র মাতৃদুগ্ধ পানের গুরুত্ব বিষয়ে প্রচারমাধ্যমগুলো সক্রিয়, চিকিৎসকদের পরামর্শতো আছেই। মনোবিজ্ঞানীরাও বলছেনশিশুর পরিপূর্ণ শারীরিক ও মানসিক বিকাশে এ সময়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। একইসাথে একটি তথ্যসূত্র বলছে এক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্নভাবে মাতৃদুগ্ধ পানে অবাঞ্চিত গর্ভধারণের ঝুঁকিও কম থাকে।

মাতৃত্বকালীন ছুটির ক্ষেত্রে শ্রম আইনে বলা হচ্ছেযদি নিয়োগকর্তা জানেনতার অধীনস্থ কেউ অন্তঃসত্ত্বা তাহলে তাকে ভারী কাজ করানো যাবে নাশ্রম আইনের ৪৯ ধারায় আছে-‘সন্তান প্রসবকালে বা আট সপ্তাহের মধ্যে যদি মা মারা যানতবে সন্তান বেঁচে থাকলে মায়ের মনোনীত যিনি তাকে মাতৃত্বকালীন ভাতা দেওয়া হবে। ৫০ ধারায় আছেসন্তান প্রসবের ৬ মাস আগে বা প্রসবের আট সপ্তাহ পরে যথাযথ কারণে কোন নারী শ্রমিককে বরখাস্ত বা অপসারণ বা চুক্তির অবসান ঘটলেও ঐ নারী শ্রমিক তার মাতৃত্বকালীন ভাতা থেকে বঞ্চিত হবেন না।

প্রশ্নটা এসে যায়এ ক্ষেত্রে বিভাজন কেন? – সংবিধানও আইনের চোখে সব নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার সমান যেখানেসেখানে এ বৈষম্য কেন? এক্ষেত্রে সুযোগ নিচ্ছে কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। দিন কয়েক আগে একটি বিখ্যাত বিউটি পার্লারের অন্তঃসত্ত্বা নারী কর্মীকে ছুটির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেজানা যায় চারমাস একই সাথে এ কর্মীর প্রতি সবার আচরণও সহানুভূতিশীল। কিন্তু গভীর আক্ষেপে বলতে হয়সঠিক গবেষণা ও জরিপে জানা যাবে এ নগরীর তথাকথিত বিখ্যাত ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ছুটির ক্ষেত্রে প্রশাসনের অমানবিক ও অনমনীয় মনোভাব। ছুটির মেয়াদ দু’মাসএকই সাথে প্রতি মুহূর্তে আশংকা চাকুরিচ্যূত হবার। এক্ষেত্রে বোধগম্য ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেন এর অবস্থা সেখানে তাদের নগণ্য পারিশ্রমিক নিয়েও প্রশ্ন আসে।

মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রত্যেক নারীকর্মীর মানবিক অধিকার। মাতৃত্বের প্রতি এটি রাষ্ট্রের ও সমাজের সম্মান বোধ। এক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক এ বৈষম্য নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরিদু’খাতে শ্রম আইনের সমব্যবহার করতেই হবে। একই সাথে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানবিক আচরণে এগিয়ে আসা উচিত। একজন দক্ষ ও মেধাবী নারী কর্মীকে তো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান হারাতে পারেন। আর আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত দিবাযত্ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার অলিখিত বিধান আছেযে প্রতিষ্ঠানে ৩০ জনেরও অধিক নারীকর্মী আছেন। এটির প্রয়োগ হলে একজন নারী কর্মী তাঁর সর্বোচ্চ শ্রম ও মেধা প্রয়োগে আন্তরিক হতে পারবেন। কারণ নবজাতক শিশুকে নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে আসার অনেকের যেমন ভাগ্য মিলে নাআবার যারা রেখে আসেন তাদের ভেতরেও স্বস্তি থাকে না। আর মা ও শিশুর এ সময়ে নিবিড় আত্মিক বন্ধন ব্যাহত হয়ণ্ডযা শিশুর পরবর্তীকালীন সময়ে অনেকক্ষেত্রে সমস্যা হয়। অতএব মাতৃত্বকালীন ছুটির বিধি সমান প্রয়োগে সবাই আন্তরিক হবেন এটিই প্রত্যাশা।

x