মাদারবাড়িতেও দিনভর উত্তেজনা, পণ্য পরিবহন ও দোকানপাট বন্ধ রেখে প্রতিবাদ

কদমতলী ট্রাক স্ট্যান্ডের দখল নিতেই হারুনকে খুন

আজাদী প্রতিবেদন

মঙ্গলবার , ৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ at ৪:১০ পূর্বাহ্ণ
800

রাজনৈতিক বিরোধ নয়, বখরা আদায়ের লোভনীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত কদমতলী ট্রাক স্ট্যান্ডের দখল নিতেই পথের কাঁটা প্রতিবাদী যুবক হারুনকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে প্রতিপক্ষ গ্রুপ। এর আগে একাধিকবার ওই ট্রাক স্ট্যান্ডের দখল নেওয়ার চেষ্টা হলেও স্থানীয় প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান হারুনের ব্যক্তি ইমেজ বারবার তাতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া উপলক্ষে গত রোববার ওই স্থানে যে সমাবেশ ও শোভাযাত্রার আয়োজন থাকবে তা আগে থেকেই জানতো কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া ছয় যুবক। সমাবেশ বা মিছিল থেকে হামলা হলে ঘটনাটিকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়া যাবেএ ভাবনা থেকেই তারা ওই সময় ৫ থেকে ৭ মিনিটের মধ্যে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে নির্বিঘ্নে সরে পড়ে। গতকাল ব্যবসায়ী হারুন খুনের প্রতিবাদে ও খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে কদমতলী ও মাদারবাড়ি এলাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে ধর্মঘট পালন করা হয়। পণ্য পরিবহন থেকে বিরত ছিলেন শ্রমিকরা। সকাল থেকে কদমতলীশুভপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায়ও মালিকশ্রমিকরা সব ধরনের পণ্যবাহী পরিবহন চলাচল বন্ধ করে দেন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও বন্ধ রেখে সকাল থেকে মিছিল মিটিং করেন ব্যবসায়ীরা। এ ঘটনায় নিহত হারুনের ভাই হুমায়ূন চৌধুরী বাদী হয়ে গতকাল সন্ধ্যায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (কোতোয়ালী জোন) জাহাঙ্গীর আলম আজাদীকে বলেন, প্রাথমিক খোঁজ খবর নিয়ে আমরা খুনের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের নাম পেয়েছি। তারা আমাদের নজরদারির মধ্যে রয়েছে। তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরপরই আমরা তাদের গ্রেফতার করবো।

প্রসঙ্গত, গত রোববার বিকালে স্থানীয় রাহাত সেন্টারে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের স্বীকৃতি উদযাপনে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের একটি অনুষ্ঠান ছিল। সে সময় নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিচে একটি চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলেন হারুন। মিছিলটি চলে যাওয়ার সময় পেছন থেকে কয়েকজন যুবক হারুনের কাঁধে ও বুকের দুই পাশে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে। তাদের মধ্যে অন্তত তিনজনকে চিনতে পেরেছেন স্থানীয়রা। এলাকায় সন্ত্রাসী হিসেবে তারা পরিচিত এবং থানায় তাদের নামে মামলা রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীর জানান, লিটন, সানি, নূরনবীসহ ছয়জন এ ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেয়। নূরনবী কাছে থেকে তিন রাউন্ড গুলি করে হারুনকে। সে সময় শোভাযাত্রা উপলক্ষে মানুষের সমাগম বেশি থাকায় খুব সহজেই তারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। নিহত হারুনের চাচা চট্টগ্রাম নগর বিএনপির প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক দস্তগীর চৌধুরী। হারুন নিজেও যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

গতকাল দুপুরে সরেজমিনে শুভপুর বাস স্ট্যান্ড এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পরিবহন ব্যবসায়ী হারুন খুনের ঘটনায় এলাকা জুড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। মালিকশ্রমিকরা সব ধরনের পণ্যবাহী পরিবহন চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন। আন্তঃজিলা ট্রাককাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউর রহমান টিপু আজাদীকে বলেন, ‘অঘোষিতভাবে ধর্মঘট চলছে। ব্রোকাররা বলেছেন তারা আজ গাড়ি বুকিং দেবেন না। এটাতে আমাদেরও সম্মতি আছে। যেহেতু একটা হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, খুনিরা গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত তো আমাদের প্রতিবাদ করতে হবে।’ কদমতলী এলাকা থেকে কোনো পরিবহন বন্দরের দিকে যায়নি বলে জানিয়েছেন টিপু। তবে ?অন্যান্য এলাকা থেকে এবং মোবাইলে বুকিংয়ের মাধ্যমে পণ্যবাহী পরিবহন চলাচল করছে বলেও জানান তিনি।

সদরঘাট থানার ওসি (তদন্ত) রুহুল আমিন আজাদীকে বলেন, পরিবহন মালিকশ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করছেন। দোকানপাটব্যবসা প্রতিষ্ঠানও বন্ধ আছে। মিছিল হয়েছে। আমরা অনাকাঙিক্ষত কোনো ঘটনা যাতে না ঘটে, তার জন্য ঘটনাস্থলে আছি। কিছুটা উত্তেজনা থাকলেও অপ্রীতিকর কিছুই হয়নি।’

নগরীর মাদারবাড়ি ট্রাক স্ট্যান্ড এলাকায় কয়েকশ ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি। এসবকে ঘিরে আধিপত্য বিস্তারে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর কারণে যুবদল নেতা হারুনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা ব্যবসায়ীদের। এই হত্যাকাণ্ডের সাথে লিটন নামে যুবলীগ নামধারী এক সন্ত্রাসী সরাসরি জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তারা জানিয়েছেন, লিটন ছাত্রলীগের সাবেক (বহিষ্কৃত) নেতা লিমন গ্রুপের সক্রিয় কর্মী।

স্থানীয় কয়েকজন পরিবহন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, কদমতলী শুভপুর বাসস্ট্যান্ড ঘিরে গড়ে ওঠা শত শত ট্রান্সপোর্ট প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে কয়েক শতাধিক ব্রোকার রয়েছেন। যারা ট্রান্সপোর্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ট্রাক ঠিক করে দিয়ে মাসে দুই থেকে তিন লাখ টাকা আয় করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী জানান, লিমনের অনুসারীরা আগ্রাবাদ এলাকায় চাঁদাবাজি করলেও সম্প্রতি শুভপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় তাদের অধিপত্য বিস্তার করার উদ্যোগ নেয়। এতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় হারুন। ঘর থেকে দুইশ গজ দূরে শাহনাজ ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি নামে ট্রান্সপোর্টের ব্যবসা রয়েছে হারুনের। তার প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে ৫০ থেকে ৬০টি ট্রাক চলাচল করে। গত ২৭ নভেম্বর মোশারফ হোসেন লিটন পরিবহন ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি করলে হারুন তার প্রতিবাদ করেন। এ সময় তার নেতৃত্বে পরিবহন ব্যবসায়ীরা লিটনকে মারধর করে পুলিশে দেয়। পরে ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতার সহযোগিতায় ছাড়া পান লিটন। ওই ঘটনার জের ধরেই রবিবার সন্ধ্যায় পূর্বপরিকল্পিতভাবে হারুনকে হত্যা করা হয় বলে দাবি করেন তারা।

নিহত হারুনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এস টি ট্রান্সপোটে কর্মরত তার এক কর্মচারী ঘটনার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি জানান, কদমতলী মোড়ে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা আনন্দ শোভাযাত্রা ও সমাবেশ করেন। এই কর্মসূচি বেলা ১১টায় হওয়ার কথা শুনেছিলেন তারা। কিন্তু বেলা ৩টায় সমাবেশ শুরু হয়। সমাবেশ শেষে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর গোলাম মোহাম্মদ জোবায়ের, পার্শ্ববর্তী মোগলটুলী ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল কাদের, ফিরিঙ্গী বাজার ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লবের নেতৃত্বে শোভাযাত্রা শুরু হয়। সেই শোভাযাত্রায় ছিলেন সিআরবি জোড়া খুন মামলার আসামি সাইফুল ইসলাম লিমনও। শোভাযাত্রা শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ আগে হারুনের বুকে ও ঘাড়ে গুলি করে চলে যায় ৬ জন সন্ত্রাসী। তাদের ভয়ে কেউ এগিয়ে যেতে সাহস করেনি। সমাবেশ স্থল এবং হারুনের কার্যালয়ের দূরত্ব ৩০ গজের মধ্যে। হত্যার ঘটনায় অংশ নেয়া যুবকরা সিআরবির জোড়া খুনের মামলার আসামি সাইফুল আলম লিমনের অনুসারী বলে দাবি করে ওই কর্মচারী জানান, এক সপ্তাহ আগেও একই যুবকরা হারুনের ওপর হামলা করেছিল।

হারুনের ঘনিষ্ট এক বন্ধু নাম প্রকাশ না করার স্বার্থে আজাদীকে জানিয়েছেন, ‘আনন্দ র‌্যালির নামে এখানে শোডাউন দিয়েছে চসিক মেয়র সমর্থিত একটি অংশ। এর মধ্যে করদাতা সুরক্ষা পরিষদের আন্দোলনকারীদের জবাব দেওয়ার একটি বিষয় আছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘সিটি কর্পোরেশনের নতুন হোল্ডিং টেক্স এসেসমেন্টের সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয় স্থগিত করায় গত শুক্রবার কদমতলী এলাকায় আনন্দ মিছিল করে করদাতা সুরক্ষা পরিষদ। পরিষদের সভাপতি নুরুল আফসারের বাড়িও এই কদমতলী এলাকায়। তাই মেয়র সমর্থিত তিন কাউন্সিলরকে অতিথি করে পাল্টা শোভাযাত্রার এই আয়োজন করা হয়।’ সরেজমিনে ঘুরে ও একাধিক পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মাদারবাড়ি ট্রাক স্ট্যান্ড দখলে রক্তারক্তি পুরনো ইস্যু। অভিযোগ রয়েছে, যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তাদের দখলে থাকে এ স্ট্যান্ড। দখল বেদখল করতে গিয়ে এখানে বিভিন্ন সময় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তারপরও একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি কেউ। চট্টগ্রাম থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় এখান থেকে ভাড়ায় সরবরাহ করা হয় ট্রাককাভার্ড ভ্যান। দিনে ১০১২ হাজার গাড়ি ভাড়ার জন্য ওঠে। এ নিয়ে দালালদের বড় ধরনের সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। পুরো হাট নিয়ন্ত্রণ করে দালালেরা। সদরঘাট থানার ওসি (তদন্ত) রুহুল আমীন আজাদীকে জানান, এ দালালদের নিবন্ধন করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম আমরা পুলিশের পক্ষ থেকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হয় নি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ হাটটি নিয়ন্ত্রণ করছে ৮১০ জনের একটি সিন্ডিকেট। জেলা ভিত্তিক পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করে তারা। একজন দালালের অধীনে রয়েছে ১০১৫ জন মাঠ পর্যায়ের কর্মী। হাট থেকে মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা ভাড়া ধরে। মোট দেড় শতাধিক লোক এই ভাড়া ধরার কাজে নিয়োজিত। দেখা যায়, জেলা ভিত্তিক দালালদের আলাদা আলাদা নির্ধারিত স্থান রয়েছে। পণ্য পরিবহনকারী এজেন্সি ও মালিকেরা এদের থেকে গাড়ি ভাড়া নেয়। একাধিক পরিবহন মালিক জানান, প্রতিদিন সকালে ব্রোকাররা (দালাল) জেলা ভিত্তিক গাড়ির ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়। অর্থাৎ বাজার দর দেয়। কিন্তু ব্রোকাররা পরিবহন মালিকদের দেয়া দরের চেয়ে দুই থেকে তিন হাজার টাকা বেশি ভাড়া হাঁকান। প্রতিটি দালাল ট্রাককাভার্ড ভ্যান প্রতি দুইতিন হাজার টাকা দালালি নেয়। আবার ১০ চাকার গাড়ি প্রতি ৫ হাজার টাকা দালালি নেয়। পরিবহন মালিকেরা লাখ লাখ টাকা পুঁজি দিয়ে লাভবান হতে পারছেন না। অথচ দালালরা কোনো পুঁজি ছাড়াই দিনে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

একাধিক সূত্র জানায়, দালালেরা স্থানীয় সন্ত্রাসীদের ম্যানেজ করে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। সন্ত্রাসীদের গাড়ি প্রতি চাঁদা গুণতে হয়। গাড়ি বেশি হলে চাঁদার হার গাড়িপ্রতি ৫০০ টাকা করে প্রদান করতে হয়। গাড়ি কম হলে ৭৮ শ টাকা হারে গুণতে হয়। দালালদের কাছ থেকে পুলিশ প্রশাসনও মাসোহারা নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। লিমন গ্রুপ এ স্ট্যান্ডটি দখল নেওয়ার চেষ্টা করে চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। এ জন্য স্থানীয় হিসেবে লিটন ও তার গ্রুপকে কাজে লাগায়। লিটন বিভিন্ন সময় চেষ্টা করেছে আধিপত্য বিস্তারের। কিন্তু হারুনের নেতৃত্বে দালালদের গ্রুপটি সংঘবদ্ধ হওয়ায় সুবিধে করতে পারে নি। স্থানীয়রা বলছেন, রোববারের সমাবেশ ও শোভাযাত্রাকে ইস্যু করে হারুনের উপর হামলার সুযোগটা তাই কাজে লাগায় তারা। ট্রাককাভার্ড ভ্যান ভাড়ার হাট নিয়ে মালিক ও দালাল মিলে অন্তত ১০ জনের সাথে কথা হয়। কিন্তু কেউ প্রকাশ্যে নাম বলতে রাজি হননি।

x