মীরসরাইয়ে মৌ চাষে স্বাবলম্বী

মাহবুব পলাশ, মীরসরাই

শনিবার , ৬ জানুয়ারি, ২০১৮ at ৫:৩৮ পূর্বাহ্ণ
36

মীরসরাইয়ে মৌ চাষে কপাল খুলছে যুবকদের। এখানকার বেশ কয়েকজন তরুণ যুবক মৌ চাষে স্বাবলম্বী হওয়ায় তাদের দেখাদেখি অন্যরাও আগ্রহী হচ্ছেন এতে।

উপজেলার প্রায় ১৪ জন উদ্যোক্তা এই পেশায় যুক্ত আছেন। এছাড়াও ছোট পরিসরে আরো অনেকে মৌ চাষ করছেন। এদের মধ্যে উপজেলার জোরারগঞ্জ থানার দেওয়ানপুর গ্রামের মৃত আমিনুর রহমান প্রকাশ লালু মিয়া চৌধুরীর ছেলে খাবির ইবনে আমিন চৌধুরী স্থাপন করেছেন এক অনন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স করা এই যুবক অনেককে উদ্বুদ্ধ করেছেন এই পেশায় সম্পৃক্ত হতে। খাবির বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করার পর কিছুদিন নগরীর ইপিজেডের একটি জুতোর কোম্পানিতে কিছুদিন চাকুরি করেন। পরে চাকুরি ছেড়ে দিয়ে নিজ উদ্যোগে বাড়ির আঙ্গিনায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘আসা মৌ চাষ প্রকল্প’। বর্তমানে এই প্রকল্পে মোট মৌ কলোনির সংখ্যা ৯০টি। এই প্রকল্পের পরিধি জয়পুর থেকে ওয়াহেদপুর পর্যন্ত। এখানকার একটি কলোনি থেকে সপ্তাহে বসন্ত (এপ্রিল১৭ জুন) ঋতুতে মধু আহরিত হয় ১ কিলো ৭৫০ গ্রাম। আর অন্যান্য ঋতুতে ১ কিলোগ্রাম (শুধুমাত্র যে মৌ বাক্সে ১ লক্ষ ২০ হাজার মৌমাছি থাকে)। ভরা মৌসুমে এই প্রকল্প থেকে মাসে মধু আহরিত হয় তিন মণ। অন্যান্য মাসে আড়াই মণ মধু উৎপাদন হয়। আহরিত এই মধু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলসহ বিদেশেও বিক্রি করা হয়। এখানকার ১ কিলো মধুর দাম ১২শ’ টাকা। সে হিসেবে মধু বিক্রি করে খাবিরের প্রতি মাসে আয় হয় প্রায় ৩০৩৫ হাজার টাকা।

মৌমাছি প্রতিপালনে কিভাবে উদ্বুদ্ধ হলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি মাস্টার্স শেষ করার পর কিছুদিন চাকুরি করেছিলাম। পরে চাকুরি ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে এসে শখের বশে কবুতর পালন করি। ঐ সময় ১৩৭ জোড়া কবুতর ছিল। আর এই কবুতর থাকার জন্য একটি বড় বাক্স ছিল। একদিন হঠাৎ দেখলাম ঐ কবুতরের বাক্সে কয়েক হাজার মৌমাছি। সিদ্ধান্ত নিলাম মৌমাছি প্রতিপালন করার মাধ্যমে মধু উৎপাদন করব। আমার এই সিদ্ধান্তের কথা শুনে আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে নাকি করবে মৌচাষ! পরে অবশ্য মা সব মেনে নেন। আমার মৌচাষে অভিজ্ঞতা না থাকায় বিসিক থেকে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। পরে ভারতের ব্যাঙ্গালোরে দ্বিতীয় প্রশিক্ষণ নিয়ে ১৯৯৫ সালের নভেম্বর মাসে নিজের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করি ‘আসা মৌচাষ প্রকল্প।’

বর্তমানে খাবির চৌধুরী বেকার যুবক ও মৌচাষে আগ্রহী ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। এ পর্যন্ত রাজশাহী ও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৩৫০ জন প্রশিক্ষণার্থী প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন বলে জানান তিনি। খবির জানান, একজন প্রশিক্ষাণার্থী ৭ হাজার টাকা দিয়ে এক সপ্তাহ বা ১ মাস অথবা ৩ মাস মেয়াদী প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন। মীরসরাইয়ে উল্লেখযোগ্য ১৪ মৌচাষীর মধ্যে খাবির চৌধুরীর মৌ কলোনির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ মৌ চাষ সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

তিনি আরো বলেন, যে কেউ বাউন্ডারিযুক্ত বাড়ির আঙ্গিনায় স্বল্প খরচে মৌচাষ করতে পারেন। একটি আদর্শ মৌবাক্স (বাচ্চা ঘর ও মধু ঘর) এই দুই বাক্স মিলে চৌদ্দটি ফ্রেমের সমন্বয়ে সৃজনি কাঁঠাল কাঠ ব্যবহার করে পরিপূর্ণ একটি মৌ কলোনি তৈরিতে খরচ পড়বে ৭ হাজার ৮শ’ টাকা। একজন প্রশিক্ষিত ব্যক্তি ১৫ হাজার টাকা খরচ করে একটি কলোনিতে সপ্তাহে মাত্র ৩০ মিনিট সময় দিয়ে মাসে ৫৬ হাজার টাকা আয় করতে পারেন। যারা শিক্ষিত হয়েও কর্মসংস্থানের অভাবে বেকার জীবন যাপন করছেন তারা কম খরচে মৌচাষ করে মধু ও মোম উৎপাদনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়ে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে পারেন।

x