মুশতারী আপার অশীতিতম জন্মদিনে

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ১৩ জানুয়ারি, ২০১৮ at ৭:২০ পূর্বাহ্ণ
30

তবে একটা কথা খুব পরিষ্কার জানি যে, একটা জীবন, দীর্ঘ জীবন তাকে বলাই যায়, এ জীবনে যুদ্ধ আর ফুরালো না আপনার। সংসার নিয়ে, পেশাগত জীবন নিয়ে একরকম যুদ্ধ। দেশের কাছে দায়বদ্ধতার অন্যরকম যুদ্ধ। মাঝখানে নিজের একান্ত একটি লেখক সত্তার তাড়না আপনাকে টেনে টেনে নিয়ে গেছে আরেক যুদ্ধক্ষেত্রে। তাই বলতে ইচ্ছে করে গৎবাঁধা একটা জীবনের মানুষ আপনি নন। একটা নির্ভেজাল নারীজীবন আপনি কখনোই যাপন করেননি। মানুষের জন্য জীবনের ঘাটে ঘাটে অবদান রাখা জীবন আপনার। মুশতারী আপা, সালাম আপনাকে।

শুভ জন্মদিন মুশতারী আপা। শুভ, শুভ, শুভ জন্মদিন। আজ প্রিয় স্বদেশের প্রতিটি ঘর ভালোবাসার ঘর এবং প্রতিটি ঘর আজ অবারিতদ্বার; আপনার জন্য। আজ আপনার অশীতিতম জন্মদিন। মধুর একটি ভুল সংশোধনসাপেক্ষ প্রিয় পাঠক, এ আজ আজ নয়, আগামী ১৫ ই জানুয়ারির কথা বলছি। ভুলটি ইচ্ছাকৃত; সেদিন এ পাতাটি পাবো না। তাই নারীপাতার বিশাল হৃদয় থেকে আপনার জন্য আগাম উষ্ণ শুভেচ্ছা, জন্মদিনের।

নানা পরিচয়ে সবিশেষ পরিচিত বেগম মুশতারী শফিকে চেনেন না এমন কেউ আছেন কি? অন্তত শহীদ জায়া হিসেবে তাঁর নাম শত হাজারবার শুনেছি আমরা। অথচ নিজেই তিনি এক বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীন বাংলা বেতারের শব্দসৈনিক বেগম মুশতারী শফীর মূল যুদ্ধটি কলমের। অতএব তাঁর যুদ্ধটি ন’মাসে শেষ হয়নি। তিনি এখনও যোদ্ধা, নিরন্তর যোদ্ধা। আদিঅন্ত বাংলাদেশের অফুরাণ স্বপ্নসম্ভাবনার সকল মুক্তি তাঁর আরাধ্য। তাঁর যুদ্ধের তাই শেষ হলো না আজও।

মাত্র ১১ বছর বয়সে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় মুকুলের মাহফিলে গল্প লেখার মধ্য দিয়ে তাঁর লেখকজীবনের সূচনা। মাত্র ১৬য় শুরু বিবাহিত জীবনে একের পর এক সন্তানের মা হয়েছেন। শিশুর কলকাকলিতে ভরা সংসার কিন্তু তিনি স্বপ্ন ভোলেননি। গড়েছেন ‘বান্ধবী সংঘ’ এই চট্টগ্রামে, গত শতাব্দীর ষাটের দশকে। সংঘের মুখপাত্র হয়ে এল বান্ধবী পত্রিকা (মাসিক)। ১৯৬৯এ বাড়ির গাড়িঘরে সম্পূর্ণ নারীকর্মী পরিচালিত ‘মেয়েদের প্রেস’ থেকে সে পত্রিকা ছাপার কাজটিও শুরু হলো। কিন্তু ততদিনে অগ্নিগর্ভ স্বদেশ রোষে ফুঁসে উঠেছে। এদেশের অগ্নিকন্যারা যাঁরা সেআগুনে আহুতি দেবেন মুশতারী শফী যে তাদেরই একজন।

১৯৭১। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ অনেকের মতো তাঁকেও এলোমেলো, উথালপাতাল করে দিল। ভুলে গেলেন মুশতারী আপা যে তিনি থাকেন এক অবাঙালি অধ্যুষিত এলাকায়। থাকেন জোড়ায় জোড়ায় শ্যেনশুকুনী দৃষ্টির সার্বক্ষণিক প্রহরায়। অনায়াসে সতীর্থজন তাঁর বাড়িতেই মজুদ করে অস্ত্রভর্তি ভারি ভারি বাক্স। মুশতারী লজেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স্বপ্ন বোনা হয় দিনের পর দিন। অতঃপর স্বামী হারান তিনি। হারান একমাত্র ছোট ভাইটিকে। লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় একটি পরিবার। অনিশ্চিতের পথে পা বাড়ান তিনি। আজ আশিতে পা দিয়ে জানি না, সেই দিনগুলোকে হুবহু দেখতে পান কিনা তিনি। জানি না, সেসব দিন মনে এলে কি মনে হয় আপনার, কেমন লাগে। তবে একটা কথা খুব পরিষ্কার জানি যে, একটা জীবন, দীর্ঘ জীবন তাকে বলাই যায়, এ জীবনে যুদ্ধ আর ফুরালো না আপনার। সংসার নিয়ে, পেশাগত জীবন নিয়ে একরকম যুদ্ধ। দেশের কাছে দায়বদ্ধতার অন্যরকম যুদ্ধ। মাঝখানে নিজের একান্ত একটি লেখক সত্তার তাড়না আপনাকে টেনে টেনে নিয়ে গেছে আরেক যুদ্ধক্ষেত্রে। তাই বলতে ইচ্ছে করে গৎবাঁধা একটা জীবনের মানুষ আপনি নন। একটা নির্ভেজাল নারীজীবন আপনি কখনোই যাপন করেননি। মানুষের জন্য জীবনের ঘাটে ঘাটে অবদান রাখা জীবন আপনার। মুশতারী আপা, সালাম আপনাকে।

কিছুদিন আগে, বিগত বছরের (২০১৭) শেষপ্রান্তে ঢাকা থেকে তাসমিলা হোসেন মালেকা বেগমসহ আরও অনেককে সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রামের সুধীজনদের ডেকে আপনাকে সকলের মধ্যমণি করে চমৎকার একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে (বিস্তার আর্টস কমপ্লেক্সএর সহযোগিতায়) অনন্যা সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত করে গেলেন। সেদিনের দৈনিক পত্রিকাগুলোতে ওদের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল ‘মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রবন্ধ স্মৃতিকথা, সৃজনশীল সাহিত্য রচনা ও সাহিত্য সংগঠক হিসেবে বিশেষ অবদান রাখায় এ পুরস্কার পাচ্ছেন তিনি।’ এ বিজ্ঞপ্তি আমাদের অনেকের চমকে ওঠার কারণ হলো। তাই তো! মূলত তিনি তো লেখক। লেখকই হবার কথা ছিল তাঁর। দীর্ঘ, দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম বেতারকেন্দ্রের পেছনের সংকীর্ণ কটি সিঁড়ি টপকে করিডোর ধরে এগিয়ে যাবার মুখে হাতের ডানে টানা কক্ষটির টানা টেবিলের মাঝখানের চেয়ারটায় বসে সারাক্ষণ যাকে কাগজকলমে ডুবে থাকতে দেখেছি তিনি লেখার কাজটিই তো করতেন। তখন ভাবতাম দাপ্তরিক কাজ।

আজ বুঝি শুধু অফিসের কাজ নয়, ওখানেই কাজের ফাঁকে নিরলস চলতো তাঁর সাহিত্য চর্চা। একদিন হাতে তুলে দিলেন তাঁর গল্পগ্রন্থ, (সম্ভবত প্রথম) ‘জীবনের রূপকথা’। তারপর বেতারে তাঁকে নিয়মিত দেখার চোখদুটো কবে থেকে আবার না দেখায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে তাও মনে পড়ে না। হঠাৎ একদিন, বেশ অনেকদিন পরে একদিন, হাতে এল তাঁর ‘একাত্তরের চিঠি, জাহানারা ইমামকে’। সঙ্গে আমন্ত্রণপত্র, সম্ভবত প্রকাশনা অনুষ্ঠানের। বিশালায়তন সে গ্রন্থ (পত্র সংকলন) পাঠের ক্লান্তি ভোলার নয় এই ভেবে যে এত শ্রম, এত ছোটাছুটি ওই বয়সে সম্ভব হলো কি করে? আসলে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল আন্দোলন তো আমাদের মুক্তিযুদ্ধেরই অংশ। এ যুদ্ধটির সঙ্গেও জড়িত ছিলেন মুশতারী আপা সর্বতোভাবেণ্ডধ্যানেজ্ঞানে, মনেপ্রাণে এবং মাঠেময়দানে। এবং অতঃপর অনন্যা সাহিত্য পুরস্কারের সঙ্গে প্রাপ্ত সাহিত্যিক স্বীকৃতি।

বেগম মুশতারী শফী সাহিত্যিক। একজন সাহিত্যিকের যে কটি গুণ থাকা বাঞ্ছনীয় তার সবই তাঁর আছে। আছে নিজস্ব বর্ণনাভঙ্গি, ভাষারীতি এবং নিজস্ব বিশ্লেষণ প্রক্রিয়া। তাঁর অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, অন্তর্দৃষ্টি ও চিন্তাশক্তির জন্য জীবন ভিন্ন অন্য কিছু বা আর কারও দ্বারস্থ হবার প্রয়োজন তাঁর হয়নি। না উচ্চশিক্ষা, না ব্যাপক অধ্যয়ন। তাঁর শস্যক্ষেত্র, তাঁর চাষবাস, তাঁর ফলানো ফসল তাঁকে প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। মূলত ঔপন্যাসিক তিনি। লিখেছেন উপন্যাস এবং রাজনৈতিক উপন্যাস। গল্প বা কাহিনী মুখ্য বিষয় নয় তাঁর উপন্যাসে। ভাবনার প্রতিটি স্তরে রাজনৈতিক চেতনার সচেতন প্রয়োগ তাঁকে বিশিষ্ট করেছে, আমাদের করেছে বিস্মিত। আমরা যারা রাজনীতিঅর্থনীতি বুঝিনা বা ওসব নিয়ে ভাবিনা বলে নানা কারণে পাশ কাটিয়ে যাই তাদের পড়তে হবে ‘একদিন এবং অনেকগুলো দিনের মতো উপন্যাস, পড়তে হবে ‘অকাল বোধনে’র মতো উপন্যাস। ‘একদিন এবং অনেকগুলো দিনে’র মসিউর রহমান এবং ‘অকাল বোধনে’র উম্মে কুলসুম একই ভাষার, একই ভাবনাচিন্তার মানুষ; মানুষ তারাণ্ডপুরুষ বা নারী চরিত্রে কিছুই আলাদা হয় না। বেঁচে থাকার জন্য ক্ষুণ্নিবৃত্তির প্রয়োজন আছে। তবে খাবারের জন্য তাঁর চরিত্ররা বাঁচেনা। ভোগ্য বস্তু, হোক তা আহার্যবস্তু, হোক বিলাসব্যসনের যেকোনও আয়োজনণ্ডতিনি এসবে সময়ক্ষেপণ করেননি। একজন নারী ঔপন্যাসিক রান্নাঘর বা রান্নাবান্না নিয়ে বা মেয়েদের সাজপোশাক নিয়ে মোটেই ভাবিত নন, এও এক বিস্ময়।

উপন্যাসে অসাম্প্রদায়িক বাতাবরণ তৈরিতে তাঁর তুলনা নেই। আমরা সিরাজুল মজিদ মামুনের ভরাট কণ্ঠস্বরে খবর পাঠ শুনছি। পাশের ঘরে বা বাড়িতে কেউ শুনছেন শারদোৎসবে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের জলদমন্ত্র উচ্চারণে স্তোত্রপাঠ। বাইরের রাজপথ তখন হয়তো োগান মুখর: ছয় দফা মেনে নাও, নিতে হবে/নইলে গদি ছাড়তে হবে। তারপর স্বাধীন স্বদেশ। দ্রুত বদলে যাওয়া সময়। সন্ত্রাস কবলিত ছাত্ররাজনীতি। ছাত্র খুনের সূচনা। শিশু ধর্ষণের ঘটনা। একের পর এক বেঈমানেরা ক্ষমতায়-‘এক বেঈমান তো দেশটাকে খৎনা করিয়ে ছাড়লো।’ এভাবেই তাঁর উপন্যাস জীবন্ত, জ্বলন্ত সময়ের হাত ধরে এগিয়ে যায়। গল্প তো নিশ্চয়ই থাকে। থাকে রোমান্টিকতা, বিষাদ, হাহাকার সবকিছু যা থাকে মানুষের জীবন জুড়ে। তাঁর উপন্যাসে তিনি স্বয়ং আছেন টুকরো টুকরো হয়ে।

প্রচুর গল্প লিখেছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের গল্প, একুশের গল্প শিরোনামের গ্রন্থও আছে তাঁর। কাছে থেকে বা দূরে যেতে দেখা গ্রামীণ জীবন, বস্তি জীবনে গ্রাম ছেড়ে আসা মানুষের সুখদুঃখের অতি সাধারণ গল্পকে মানবিকতার স্পর্শে আর্দ্র করে তুলেছেন তিনি। বেতারে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। সাড়ে তিনশ টাকার টেম্পরারি কাজে জীবন ক্ষয় করা কর্মচারীদের দেখেছেন। দেখেছেন ৩০০ টাকা চুক্তিতে ক্যাজুয়াল চাকরি করা সুরসাধক সেতারবাদক আলী আহমদকে। এদের গল্প লিখেছেন তিনি। বন পলাশীর আত্মাহুতির মতো গল্প যেখানে পাহাড়, বনবনানী, সেখানকার সকাল দুপুরসন্ধ্যার রোমান্টিক সৌন্দর্য পাঠককে অন্যরকম এক নেশায় বুঁদ করে রাখে।

মুশতারী আপার সাহিত্যকর্ম জুড়ে রয়েছে স্বদেশ, দেশের মাটি ও মানুষ। দেশের রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধ তাঁর সাহিত্যিকর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মেয়েদের উপর যেযুদ্ধটা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেটা যে রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় এবং সমাজতান্ত্রিক কত জটিলতা তৈরি করেছে আজকের গবেষকগণ তা প্রমাণ করছেন। বেগম মুশতারী শফীর সাহিত্যে নারী চরিত্ররা নানান জায়গায় দাঁড়িয়ে এই কাজটিই করে গেছে নিরন্তর। তাঁর সাহিত্যকর্মে নিজেকে তিনি নিঃশেষে নিংড়ে নিয়েছেন। চাই যে সুস্থদেহেণ্ড মনে আরও কিছুদিন থাকুন তিনি আমাদের সঙ্গে, আমাদের জন্য। মুশতারী আপা শতায়ু হোন।

x