রক্তের ফেরিওয়ালা ‘উই ক্যান’

জীবন বাঁচাতে ৭ বছরে ১৩০০ ব্যাগ রক্ত দান

আকাশ আহমেদ, রাঙ্গুনিয়া

সোমবার , ৩০ এপ্রিল, ২০১৮ at ৫:৫৫ পূর্বাহ্ণ
30

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে দুই বছরের সামিয়ার শরীরে থ্যালাসেমিয়া ধরা পড়ে। চিকিৎসকের পরামর্শ মতো তাকে বাঁচাতে নিয়মিত রক্ত দিতে হবে। চিন্তিত হয়ে পড়েন মাবাবা। তাঁরা এক পর্যায়ে সন্ধান পান চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার ‘উই ক্যান’ সংগঠনের সংগঠক সুমন সালামের। সংগঠনটির পক্ষ থেকে সামিয়াকে নিয়মিত রক্ত দেওয়া হচ্ছে। তার মতো গত সাত বছরে চার শতাধিক মানুষকে রক্ত দিয়ে জীবন বাঁচিয়েছেন এ সংগঠনের সদস্যরা।

ফুটবে হাসি বাঁচবে প্রাণ, স্বেচ্ছায় করুন রক্ত দান’ এই আহ্বানে ২০১০ সালে ‘উই ক্যান’ (আমরাই পারি) ব্লাড ডোনেট গ্রুপের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ৩৭ জন ব্লাড ডোনার নিয়ে সংগঠনটি শুরু করেন সুমন সালাম নামে এক যুবক। তখন তিনি ছাত্র ছিলেন। তবে সক্রিয়ভাবে সংগঠন পরিচালনা করেন তিনি। শুরুতে শুধু রক্তদান করলেও ক্রমশ সংগঠনটির কর্মকাণ্ডের পরিধি বাড়তে থাকে। রাঙ্গুনিয়ার বিভিন্ন রক্ত ডোনেট সংগঠন তাঁদের সাথে সমন্বয় করে কাজ করে যাচ্ছেন। গত ৭ বছরে তাঁরা অসংখ্য মানুষকে রক্তদান করার পাশাপাশি শীতার্ত মানুষের মাঝে বস্ত্র বিতরণ, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ, বৃক্ষরোপণসহ নানামুখী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন।

সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সুমন সালাম জানান, ২৭ বছর আগে তাঁকে জন্ম দেওয়ার পর তাঁর মা রক্তশূন্যতায় ভুগছিলেন। তাঁকে নিয়মিত রক্ত দিতে হতো। আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে রক্ত দেওয়ার পরও তিনি রক্ত শূন্যতায় ভুগছিলেন। রক্ত জোগাড় করা তখন খুব কঠিন ছিল। মায়ের মুখ থেকে বিষয়টি শুনে তাঁর ব্লাড ডোনেট গ্রুপ করার বিষয়টি মাথায় আসে। সামিয়ার মতো ৪ বছর ধরে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত আরো একজনকে রক্ত দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন তিনি। নাম প্রকাশ না করার শর্ত দিয়েছেন রক্তগ্রহীতা।

সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচানোর লক্ষ্য নিয়ে ২০১০ সালের ২১ এপ্রিল ‘উই ক্যান’ ব্লাড গ্রুপের যাত্রা শুরু হয়। এটি একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সংগঠনের বর্তমানে রক্তদাতা সদস্য ৫০ জন। এলাকার কোথাও কোনো অসুস্থ রোগীর জরুরি রক্তের প্রয়োজন হলে ছুটে যান এ সংগঠনের সদস্যরা। রাঙ্গুনিয়াসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিমাসে গড়ে বিভিন্ন রোগীকে ১৫ ব্যাগ রক্ত সরবরাহ করেন তাঁরা। এভাবে গত ৭ বছরে অন্তত ১ হাজার ৩ শ’ ব্যাগ রক্ত দিয়েছে সংগঠনটি। রক্ত পেয়েছেন গর্ভবতী মা, থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগী, ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী, দুর্ঘটনার শিকার বিভিন্নজন।

তিনি বলেন, সংগঠনটি এখন ফেসবুক পেজের মাধ্যমে তাদের কর্মকাণ্ডের প্রচারণা চালায়। সারাদেশে তাদের নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠেছে। এই নেটওয়ার্ক যোগাযোগের মাধ্যমে বর্তমানে দেড় শ’ যুবক নিয়মিত রক্তদান করে যাচ্ছে।’ এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে ব্লাড গ্রুপিংয়ের মাধ্যমে রক্ত সংগ্রহ করেন তাঁরা।

সংগঠনের সদস্য আবদুল্লাহ মোরশেদ জানান, চট্টগ্রাম পলিটেকনিক্যালের থ্যালাসেমিয়া রোগী এক শিক্ষার্থীকে দুই বছর ধরে রক্তদানে সহায়তা করে আসছে। যখন তাঁর দরকার তিনি রক্তদাতা সংগ্রহ ও তাঁর রক্তদানে সহযোগিতা করেন। তিনি মানুষের রক্তদানে সহায়তা করতে পারলে মনে প্রশান্তি পান বলে জানান।

সংগঠনের অন্য সদস্য শাহনেওয়াজ টিপু বলেন, মানুষ যখন রক্তের জন্য খুব বিপদে পড়ে যান তখন আমরা এগিয়ে যাই জীবন বাঁচাতে। কারো জীবন বাঁচাতে পারলে, মুখে হাসি ফোটাতে পারলেই আমাদের চেষ্টা সার্থক বলে মনে হয়। শুধু রক্তদান নয়, সংগঠনের সদস্যরা বিভিন্ন সামাজিক কাজেও অংশগ্রহণ করেন।

রক্ত পেয়ে উপকৃত উপজেলার মরিয়মনগরের বাসিন্দা শওকত হোসেন জানান, তাঁর স্ত্রীর অপারেশনের জন্য ৪ ব্যাগ রক্ত দেন এই সংগঠনের সদস্যরা। তিনি বলেন, তাঁদের দেওয়া রক্ত না হলে আমার স্ত্রীর জীবন বাঁচানো কঠিন হত।

উপজেলার পূর্ব কোদালা গ্রামের মোবারক হোসেন জানান, ব্লাড ক্যান্সারের কারণে ঢাকার একটি হাসপাতালে তাঁর রক্তের প্রয়োজন হলে ‘উই ক্যান’ সংগঠনের দুই সদস্য তাঁকে দুই ব্যাগ রক্ত দেন। তিনি বলেন, এই সংগঠনের ব্লাড ডোনেট গ্রুপের সদস্যদের সাথে পরিচিত হওয়ার পর আমি বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের জন্য অনেকবার রক্ত নিয়েছি তাঁদের কাছ থেকে। কারো রক্তের প্রয়োজন হলে আমি তাঁদের সাথে যোগাযোগ করতে বলি।

মরিয়মনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) মো. সেলিম বলেন, সংগঠনের বেশির ভাগ রক্তদাতা সদস্য আমার এলাকার। এলাকার কারো রক্ত প্রয়োজন হলে তাঁদের খবর দেওয়া হয়। রক্ত দিয়ে তাঁরা অনেকেই মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আলী শাহ বলেন, এলাকায় মানুষের জরুরি রক্তের প্রয়োজন হলে সংগঠনটির সদস্যরা ছুটে যান। যে কোনো গ্রুপের রক্ত তাঁরা সংগ্রহ করে দেন কিংবা রক্তদাতা খুঁজে দেন। তাঁদের এসব কর্মকাণ্ড সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

x