রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর কুমুদিনী

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ৫ মে, ২০১৮ at ৬:১২ পূর্বাহ্ণ
18

২৫শে বৈশাখ, ১৪২৫ আসন্ন। মনে হয় মাত্র সেদিন তাঁর সার্ধশত জন্মবর্ষ পালন করেছি আমরা, এর মধ্যে কেটে গেল আরও ৭টি বছর। বলতে গেলে এই ৭ বছরে আমাদের চোখের উপর দ্রুতগতিতে কী সব, কত সব তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেল বিশ্বজুড়ে অথচ জন্মের ১৫৭ বছর পরেও তিনি তাঁর জায়গাতে স্থির দাঁড়িয়ে আছেন অকম্প, অনড়, অটল হিমালয়। আমাদের শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতির জন্য তাঁর সকল অবদান আমরা শিরোধার্য করেছি। তাঁর ধ্যানেজ্ঞানে, স্বপ্নকল্পনায় নারী কিভাবে এসেছে, কতটা মর্যাদা পেয়েছে রবীন্দ্র কাব্যে নারী বিষয়ক আলোচনায় তাঁর চর্বিতচর্বন যথেষ্ট হয়েছে। কিন্তু রবীন্দ্র কথাসাহিত্যে, গল্পে, উপন্যাসে, গীতি ও কাব্যনাট্যে ব্যক্তিত্বে, দার্ঢ্যে, মর্যাদায় নারীকে অভিষিক্ত করার রবীন্দ্রপ্রয়াস নিয়ে আলোচনার প্রচুর অবকাশ রয়েছে এখনও।

সামাজিক সমস্যা হিসেবে ধর্ষণ আজ প্রকট রূপ নিয়েছে। দাম্পত্য ধর্ষণ সেভাবে আলোচনায় আসছে না ঠিকই কিন্তু পারিবারিক বা সাংসারিক বিষয়াদিতে রোজগেরে নারী ধৈর্যেস্থৈর্যে অটল থেকে নির্বিবাদে সকল অন্যায় মেনে নিয়ে আর সংসার করতে পারছে না। ফলে সংসার ভাঙছে। বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে বালিকারা নিজেরাই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। প্রশাসন ওদের পক্ষে কাজ করছে। বাল্যবিবাহ বন্ধ হওয়ার পর আঠারো পেরুনো বিয়ের বয়স এবং সেই সঙ্গে শিক্ষার আলো পাওয়া মনমানসিকতায় সচেতন মেয়েটির টনটনে সংসারজ্ঞান থাকুক বা না থাকুক পিতৃতান্ত্রিক মনমানসিকতার সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব অনিবার্য হয়ে ওঠা স্বাভাবিক। সুতরাং বদলে যেতে হবে অন্য পক্ষকে। উপরি পরিবর্তন নয়, পরিবর্তনটি আসতে হবে স্বভাবের গভীর থেকে। এ বিষয়গুলি নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা বিস্ময়কর। ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসে ঊনিশের কুমুদিনীর এবং বাল্যবিবাহে সুখী দাম্পত্যের উদাহরণ তার জা ‘মোতির মা’র ভাবনা নিয়ে গল্প হোক আজ।

সেই সেকালের জমিদার তনয়া কুমু আশৈশব ‘জন্মএকলা’। অল্পবয়সে কুলীন ঘরে সংসার ধর্মে নিবেদিত চার দিদির ছায়া কুমুর জীবনে যেমন ছিল না তেমনি সঙ্গিনীমহলেও তার তেমন কেউ ছিল না। ফলে ‘কল্প তপোবনে মানস সরোবরের কূলে’ ‘জন্মএকলা’ কুমুর বাস। পিতা মুকুন্দলালের অন্দরমহল ও বাহিরমহলে ছিল বিস্তর ব্যবধান। বাইরের মহলে তাঁর মজলিশী সমারোহের কিছু তামসিক আয়োজন মা নন্দরানী মেনেই নিয়েছিলেন কারণ তিনি জানতেন, ‘বাইরের দিকে স্বামীর তানের দৌড় যতদূরই যাক তিনি হচ্ছেন ধুয়ো; ভিতরের শক্ত টানটি তাঁরই দিকে।’ কিন্তু বৈঠকখানার আয়োজন যেদিন বজরায় চলে গেল নন্দরানী কঠিন হলেন। বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে না পেয়ে অনুতপ্ত মুকুন্দলাল শয্যা নিলেন। নন্দরারাণীও আর সংসারের হাল ধরলেন না। দুজনের আকস্মিক প্রয়াণে তাদের জ্যেষ্ঠ সন্তান বিপ্রদাসের উপরে যখন সংসারের ভার পড়ল তিনি দেখলেন ঋণের চোরাবালির উপর দাঁড়িয়ে থাকা বিষয়আশয় বাঁচানোর আশা অতিশয় ক্ষীণ। দাদাকে একলা ফেলে ছোট ভাই সুবোধ সে ঋণ আরও ভারি করে বিলেত পাড়ি দিলেন। উদ্দেশ্য, ব্যারিস্টারি পড়ে এসে সম্পত্তি উদ্ধার করতে হবে। নূর নগরের বিশাল বাস তুলে ছোট বোনটিকে নিয়ে বিপ্রদাস কলকাতায় বাগবাজারের বাসায় উঠলেন। এ সময় দৈবচক্রে বিপ্রদাসের ঠিকঠাক হওয়া বিয়েটা হলুদের দুদিন আগে কনের আকস্মিক জ্বরবিকার জনিত মৃত্যুর কারণে আর হলো না। তখন বোনটিকে দাদা আপন বিদ্যায় যথাসাধ্য শিক্ষিত করে তোলার ভার নিলেন। কুমু দাবা খেলে, ব্যাকরণ শেখে, ফটোগ্রাফিতে হাত পাকায়, পিস্তল অভ্যেস করে। দাদার কাছে এসরাজ শেখাটা তার এতটাই পাকা হলো যে বিপ্রদাসকে বলতে হলো, ‘আমি হার মানলুম।’ অন্যদিকে, ভাই সুবোধের ক্রমবর্ধমান অর্থচাহিদা শেষ পর্যন্ত যখন তার নিজের সম্পত্তির অংশের বিক্রি করা টাকার দাবিতে দাঁড়ালো তখন বিপর্যস্ত বিপ্রদাসের ঘরে ঘটক এলো কুমুর সম্বন্ধ নিয়ে। এই সম্বন্ধের সূত্রে উঠে এল চাটুজ্যে ও ঘোষাল পরিবারের সুদূর অতীত।

একদা এই ঘোষাল পরিবার ‘পর্তুগীজদের তাড়ায়’ বা ‘সমাজের ঠেলায়’ সুন্দরবনের দিক থেকে এসে নূর নগরের শেয়াকুলি গ্রামে বসতি গড়েছিল। ওদের জাঁকজমক ও ঠামঠমকের স্পর্ধা চাটুজ্যেদের সয়নি। মামলামোকদ্দমায় ওদের সর্বনাশের পরে যেটুকু বাকি ছিল তার উপরে সমাজের খাঁড়ায় শেষ কোপটা বসিয়ে দেয় চাটুজ্যেরা। রটিয়ে দেওয়া হলো যে ওরা ওদের ভঙ্গজ ব্রাহ্মণ পরিচয় ঘুচিয়ে নিজেদের কেউটে বলে দাবি করছে। কলঙ্কমোচনের উপযুক্ত প্রমাণ বা দক্ষিণার অভাবে ভিটে বাড়ি ফেলে ঘোষালদের সরে যেতে হলো রজবপুরে। সেখানে আনন্দ ঘোষালের পুত্র মধুসূদনের ব্যবসায়িক বুদ্ধি ও কপালের জোরে কারবারের প্রভূত উন্নতি হয়। তাদের রজবপুরের কারবারের অফিস কোলকাতায় স্থানান্তরিত হয়। একদা চাটুজ্যেদের দাপটে নূরনগর থেকে বিতাড়িত ঘোষালদেরই বংশধর এই মধুসূদন রাজা বাহাদুর থেকে মহারাজা খেতাব পেতে চলেছে। আজ চাটুজ্যেদের সম্পত্তি তার কাছেই বাঁধা পড়েছে ঋণের দায়ে। এবং উনিশের কুমুদিনীর সে আজ পানি প্রার্থী যদিও বয়স তার পঞ্চাশের কোঠায়।

বিপ্রদাসের মন এ বিয়েতে সায় দেয়নি। কিন্তু দাদাকে দ্বিধামুক্ত করে কুমু সব দায় নিজের উপর তুলে নিল। দাদার নির্মল স্নেহ ও উদার মনমানসের আবেষ্টনীতে মানুষ হয়েছে কুমুদিনী। সংসারের কদর্য রূপ সে দেখেনি। মায়ের প্রতি বাবার ব্যবহারে ত্রুটি সে দেখেছে। চরিত্রের স্খলনও দেখেছে। কিন্তু ‘ঔদার্যে বৃহৎ, পৌরুষে দৃঢ়, হীনতাকপটতার বহু উর্ধ্বে ছিলেন তিনি।’ তাছাড়া ‘দূরকালের পৌরাণিক আদর্শের একটা মর্যাদাবোধ’ পিতার মধ্যে ছিল। প্রাণের চেয়ে মান বড়ো, অর্থের চেয়ে ঐশ্বর্যণ্ড পিতার সকল কাজে সেটাই প্রমাণিত হতে দেখেছে কুমু। সুতরাং বরণের সব আয়োজন প্রস্তুত ছিল তার দেহেমনে। কিন্তু মনে যাকে অধিষ্ঠিত করে রেখেছে বাইরে তাকে পেল না কুমুদিনী। রূপ বা বয়স কুমুর পক্ষে বাধা হতো না। সে শিক্ষা তার ছিল। ঘোষালেরা সদব্রাহ্মণ নয় বলে দিদিরা কেউ এ বিয়েতে আসার অনুমতি পায়নি। তাতেও খেদ ছিল না কুমুদিনীর। কিন্তু মধুসূদনে সত্যকার ‘রাজা’ কোথায়? বরপক্ষে যৌতুকের প্রয়োজন ছিল না। সেইসঙ্গে ছিল না ন্যূনতম সৌজন্যবোধ। প্রজাদের আত্মসম্মান তো দূরের কথা, স্বয়ং বিপ্রদাসের সম্মান, সুরুচি ও আভিজাত্যে ঘা দেবার মতো কাজ অকাতরে করে যেতে মধুসূদনের বাধেনি। বিপ্রদাস শেষ ভরসা মানেন বোনকে। তুই বললে এখনও বিয়েটা ভেঙে দিতে পারি। ‘ছিঃ ছিঃ সে কি হয়?’ ণ্ড ছিল কুমুর উত্তর। অভদ্রতাকে রাজোচিত জ্ঞান করে মধুসূদন বিপ্রদাসের অভ্যর্থনা অগ্রাহ্য করেছে। প্রজারা নিজেদের মানরক্ষার জন্য মরিয়া হয়ে যা করেছে কুমুর কানে তার কিছুই পৌঁছুতে দেয়নি বিপ্রদাস। কিন্তু দাদার জ্বরকাশি ও তীব্র বুকে ব্যথা অগ্রাহ্য করে বাসি বিয়ের কালরাত্রিটা পার হবার আগেই, ‘প্রথা নয়, প্রেম নয়, প্রয়োজন নয় শুধু দম্ভ দেখাবার জন্য জোর করে যাত্রার আয়োজনের মুখে কুমু দুটো দিন ভিক্ষে চেয়েছে। মধুসূদনের উত্তর ছিল, ‘সব ঠিকঠাক হয়ে গেছে।’ ঔপন্যাসিকের ভাষায়, ‘ এমন বজ্রে বাঁধা একপক্ষের ঠিকঠাক, তার মধ্যে কুমুর মর্মান্তিক বেদনারও একতিল স্থান নেই।’ অথচ দাদা ও অন্যান্য আত্মীয়দের সঙ্গে মধুসূদনের চূড়ান্ত অভদ্রতার সঙ্গে ইংরেজ বন্ধুদের সঙ্গে ভদ্রতায় গদগদ, অবনম্র স্বামীকে সে মেলাতে পারেনি। তারপরেও ঘুম ভেঙে স্বামীর মুখে তাকায়নি ‘পাছে মন বিগড়ে যায়।’

কুমুর ফুলশয্যার দিনে মোতির মা (কুমুর মেজ জা) কুমুকে নিয়ে আকাশ পাতাল ভেবেছে। বালিকা বধূকে স্বামীর সংসার বিনা বিচারে গিলে খায়। ফুলশয্যা তাদের জন্য খেলা বৈ তো নয়! কিন্তু এ মেয়ের পক্ষে সে তো বিড়ম্বনা। নিজের বেলায় যে রহস্য ‘মোতির মা’ বোঝে নি আজ কুমুদিনীকে দেখে তা বুঝেছে। বুঝেছে যে একরকম জাতিভেদ আছে ‘যা সমাজের নয়, যা রক্তের’ণ্ড সে জাত কিছুতে ভাঙা যায় না। এবং এই রক্তগত অসামঞ্জস্য মেয়েদেরই মর্মান্তিকভাবে মারে, পুরুষকে নয়।

মধুসূদনের পক্ষে রবীন্দ্রনাথের কিছু ওকালতি রয়েছে। মধুসূদন এতকাল ঘরের বৌঝিদের দেখেছে। তারা ঘরকন্না করে, কোঁদলকানাকানি করে, তুচ্ছ কারণে কান্নাকাটিও করে। স্ত্রীকে সে এর ব্যতিক্রম ভাবেনি। সুতরাং আচরণ বা ব্যবহার স্ত্রীকে পাবার পথে বাধা হতে পারে বা এ থেকে স্ত্রীকে হারাবার মতো কঠিন সমস্যার উদ্ভব হতে পারে ঘুণাক্ষরে এমন সে কখনও ভাবেনি। আমাদের ঔপন্যাসিক আপন স্বভাবে মধুসূদনকে মাঝে মাঝে খানিকটা অন্যরকম করে দিয়েছেন সেখানে কুমুকে দেখে তার মনে হয় ‘ও যেন ভোরের শুকতারার মতো, রাতের জগত থেকে স্বতন্ত্র, প্রভাতের জগতের ওপারে।’ এমন ভাবনায় আক্রান্ত মধুসূদনকে নিয়ে কুমুকে অন্যরকমভাবে বিব্রত ও বিপর্যস্ত হতে হয়েছে। দাদার উপদেশমতো ‘আপনার ভিতরে আপনি সহজ’ থাকাটা তার পক্ষে দুরূহ হয়ে ওঠে। নিজের সঙ্গে লড়াই করে কুমু নিজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অনাকাঙিক্ষত, অপ্রত্যাশিতকে জয় করার বা সয়ে নেবার শক্তি সে প্রার্থনা করে তার প্রাণের ঠাকুরের কাছে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না। কথায় কথায় স্ত্রীর নূরনগরী চাল এবং দাদার প্রতি কটাক্ষ কুমুকে বিবাগী করে তোলে।

বিপ্রদাসের বাড়াবাড়িরকম অসুস্থতার সংবাদে মধুসূদনের সম্মতি সাপেক্ষে ভাইকে দেখতে গিয়ে কুমু যেন নিজেকে নতুন করে খুঁজে পায়। বিপ্রদাসও কুমুকে আর কোনও স্তোকবাক্যে ভোলাতে রাজি নয়। কুমু যখন ওই বিরুদ্ধ পরিবেশে তিলে তিলে ক্ষয়ে যেতে আর রাজি নয়, বিপ্রদাসও যখন বোনকে আর মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে ইচ্ছুক নন তখন ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের মতো জানা গেল যে কুমু সন্তানসম্ভবা। বিপ্রদাস কুমুকে ফিরে যাবার পরামর্শ দেয় সন্তানের স্বার্থে। কুমু দাদার পরামর্শ মতো স্বামীর ঘরে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নেয় বটে কিন্তু পরিষ্কার জানান দিয়ে যায় যে সংসারে এমন কিছু আছে যা হারানো বা খোয়ানো উচিত নয় এমনকি সন্তানের জন্যেও নয়। ওদের সন্তান ওদের হাতে তুলে দিয়ে কুমু আবার ফিরবে দাদার কাছে।

উপন্যাসের শুরুতে কুমুর সন্তান অবিনাশ ঘোষালের বত্রিশতম জন্মদিনের খবর পেলেও কুমুকে আমরা তার পাশে পাইনি। রবীন্দ্রনাথের ১৫৭ বছর পরেও এ কুমুদিনী সহজগোচর নয়।

x