রমজানে ওজন নিয়ন্ত্রণ আইন শিথিলের প্রস্তাব

চেম্বারের মতবিনিময় সভায় পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিতে উদ্বেগ ।। বেশি মুনাফার প্রবণতা পরিহার করতে হবে ।। নিরাপত্তার প্রয়োজনে মার্কেটে সিসিটিভি স্থাপনের তাগিদ।। মোবাইল কোর্ট চলমান রাখার ওপর জোর।। রাস্তায় গাড়ি পার্কিং ও ফুটপাতে বাজার বসানো যাবে না

আজাদী প্রতিবেদন

বৃহস্পতিবার , ১৭ মে, ২০১৮ at ৪:৫৭ পূর্বাহ্ণ
212

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেছেন, মহাসড়কে ওজন নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকরের ফলে ব্যবসায়ীদের পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেছে। একটি ট্রাকে আগে যেখানে ১৮২০ টন পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হতো এখন সেখানে ১৩ টনের বেশি পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে না। দেশে মহাসড়ক আরো আছে, কিন্তু কোথাও এই ধরনের ওজন নিয়ন্ত্রণ আইন নেই। আমি ইতোমধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সচিবের সাথে কথা বলেছি। অন্তত রমজান মাসে যেনো ওজন নিয়ন্ত্রণ আইন শিথিল করা হয়। ওনারা আমাকে আশ্বস্ত করেছেন। আগামী দুই তিনদিনের মধ্যে আশা করি এটি আপাতত স্থগিত হয়ে যাবে। ওজন নিয়ন্ত্রণ আইনের কারণে গাড়ি ভাড়া বেড়ে গেছে। তাই পণ্যের দামও কেজিতে ৪৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। কেউ তো আর লোকসান দিয়ে ব্যবসা করবে না।

গতকাল বুধবার দুপুরে আগ্রাবাদের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের বঙ্গবন্ধু কনফারেন্স হলে রমজানে নিত্যপ্রয়াজনীয় ভোগ্যপণ্যের মূল্য, যানজট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

রমজানে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, আল্লাহর রসূল (.) ব্যবসাকে হালাল ও সুদকে হারাম ঘোষণা করেছেন। কিন্তু আমাদের দেশে কিছু কিছু ব্যবসায়ী রমজান মাসেই বেশি মুনাফা করে। এই ধরণের প্রবণতা পরিহার করতে হবে। এর বাইরে প্রশাসন তো রুটিন মাফিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছেই। তবে আমি মনে করি ব্যবসায়ীদেরকে এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। বাজারে যাতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি না হয় সে ব্যাপারে ব্যবসায়ী নেতাদের নজর রাখতে হবে। আপনারা জানেন, বিশ্বের সব দেশে বিভিন্ন উৎসবে পণ্য বিক্রিতে মূল্যছাড় দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে ঘটে উল্টো ঘটনা। চেম্বার সভাপতি বলেন, প্রতি বছরের ন্যায় এবারও চট্টগ্রাম চেম্বারের উদ্যোগে ন্যায্য মূল্যে ৪০ টাকা দরে চিনি এবং ৩৮ টাকা দরে চাল বিক্রি করা হবে। আমরা বেশি দামে এসব পণ্য কিনে ভর্তুকি মূল্যে সেইসব সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করি। সবাই হয়তো পাবে না। কিন্তু অন্তত নিম্ন মায়ের কিছু মানুষ এতে উপকৃত হবে। আশা করব প্রতিটি করপোরেট হাউস এ ধরনের উদ্যোগ নেবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, রমজানে শপিং সেন্টারগুলোতে মানুষের চলাচল বেড়ে যায়। স্বাভাবিকভাবে নিরাপত্তার প্রশ্নটি সামনে চলে আসে। আমি মার্কেটের নেতৃবৃন্দ ও পুলিশ প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ করবো, যেসব মার্কেট এখনো সিসিটিভি ক্যামরার আওতায় আসেনি, সেইসব মার্কেটে নিরাপত্তার স্বার্থে যেনো সিসিটিভি ক্যামরা স্থাপন করা হয়।

তিনি বলেন, হোটেল রেস্টুরেন্টগুলোতে পঁচাবাসী খাবার পরিবেশন না করার জন্য আমি মালিকদের আহ্বান জানাচ্ছি। এছাড়া চট্টগ্রাম নগরীতে যানজট নিরসনে ট্রাফিক বিভাগকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ জানান তিনি। অপরদিকে রমজানে জেলা প্রশাসন পরিচালিত মোবাইল কোর্ট কার্যক্রমের জন্য একটি গাড়ি সরবরাহের আশ্বাস প্রদান করেন চেম্বার সভাপতি।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিএমপি’র ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মাসুদউল হাসান বলেন, অনেক ব্যবসায়ী বিক্রিত পণ্য ফেরত নিতে চান না। আমাদের কথা হচ্ছেবিক্রিত পণ্য অবশ্যই ফেরত নিতে হবে। অনেক মার্কেটের বড় বড় শো রুমে অবশ্যই আলাদা পণ্য ফেরতের কাউন্টার আছে। আমরা চাই না, পণ্য ফেরত নেয়া না নেয়া নিয়ে কোনো ধরণের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হোক। তাই প্রতিটি মার্কেটে ব্যবসায়ীদেরকে অবশ্যই বিক্রিত পণ্য ফেরত নিতে হবে।

যত্রতত্র পার্কিং করা যাবে না উল্লেখ তিনি আরো বলেন, শপিংমলে নির্ধারিত স্থানে গাড়ি পার্কিং করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই রাস্তার ওপর গাড়ি পার্কিং করা যাবে না। রমজানে যানজট নিরসনে নগরের সড়কের পাশে গাড়ি পার্কিং করা যাবে না। ফুটপাতে ইফতার বাজার বসানো যাবে না। তবে হান্ডি রেস্টুরেন্টের মতো বড় জায়গা থাকলে তারা ইচ্ছে করলে ইফতার বিক্রি করতে পারবে। এছাড়া সড়কে কোনো হকার বসতে পারবে না।

সিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার আরো বলেন, দূরপাল্লার কোনো বাস সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নগরীতে প্রবেশ করবে না। এছাড়া বেলা ১১টা থেকে পণ্যবাহী গাড়ি রাত ৮টা পর্যন্ত নগরীতে প্রবেশ করতে পারবে না। মহাসড়কে ঈদের সময় পণ্যবাহী গাড়ি চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকবে। এ সময় বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বেসরকারি কন্টেনার ডিপোর গাড়ি যাতে বন্দরঅফডক চলাচল করতে পারে সে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

রমজানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রমজানে যেহেতু মানুষ সারা রাত ধরে কেনাকাটা করে, তাই এসময় ব্যাগ টানা ও ছিনতাইকারীদের উপদ্রব বেড়ে যায়। এছাড়া মার্কেটে বখাটের উৎপাতও রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য মাঠে থাকবে। ব্যবসায়ী ভাইদের একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, বর্তমান সময়ে মাদক একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন পন্থায় পণ্যবাহী গাড়িতে মাদকইয়াবা পাচার হচ্ছে। এখন গাড়ির চাকায় ম্যাগনেট লাগিয়ে ইয়াবা আনা হচ্ছে। কাঠ ছিদ্র করে ফাঁকা বাক্স তৈরি করে ইয়াবা আনছে। গোপন খবরের ভিত্তিতে আমরা সেইসব আটকও করছি।

জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজার কমিটির সাথে সমন্বয় সাধন করে নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে। প্রত্যেকটি মার্কেটে মূল্য তালিকা টাঙানো বাধ্যতামূলক। আমরা ইতোমধ্যে নিত্যপণ্যের বাজারে গিয়ে ব্যবসায়ীদের বারবার সতর্ক করেছি। খুব শিগগিরই আড়তগুলোতে আমরা বিশেষ অভিযান পরিচালনা করবো।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রে সৈয়দ মোরাদ আলী বলেন, জেলা প্রশাসন ব্যবসায়ীদের শত্রু নয়। তবে আমরা যখন জরিমানা করি তখন শত্রু হয়ে যাই। ব্যবসায়ীদের ট্যাক্সের টাকায় আমাদের দেশ পরিচালিত হয়। আমদের চেয়ে আপনাদের (ব্যবসায়ীদের) অবস্থান আরো ওপরে। রমজানে দ্রব্যমূল্য যাতে বৃদ্ধি না পায়, সেটি ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদেরও খেয়াল রাখতে হবে। আপনারা স্ব স্ব অবস্থান মনিটরিং করবেন। এসময় অন্যদের বক্তব্য রাখেন চেম্বারের সহসভাপতি সৈয়দ জামাল আহমেদ, পরিচালকদের মধ্যে এম এ মোতালেব, খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ ছগীর আহমদ ও চেম্বার পরিচালক অঞ্জন শেখর দাশ, সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ, সিটি কর্পোরেশনের সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর আবিদা আজাদ, বিএসটিআই’র উপপরিচালক শওকত ওসমান, চট্টগ্রাম জেলা দোকান মালিক সমিতির সভাপতি সালেহ আহমেদ সুলেমান ও মহানগর সভাপতি সালামত আলী, টেরীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আহমদ হোসেন, কাজীর দেউড়ি কাঁচা বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুর রাজ্জাক, আন্ত:জিলা মালামাল পরিবহন সংস্থা ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী জাফর আহমেদ, প্রাইম মুভার ওনার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবু বক্কর সিদ্দিক, ফলমণ্ডির সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর, ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইসপ্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসেন, পাহাড়তলী বণিক কল্যাণ সমিতির সহসভাপতি জাফর আলম ও সাধারণ সম্পাদক এস এম নিজাম উদ্দিন এবং চট্টগ্রাম ফ্রেশ ফুড ভেজিট্যাবলস এসোসিয়েশনের মাহবুব রানা প্রমুখ।

এ সময় অন্যদের উপস্থিত ছিলেন চেম্বার পরিচালক এ কে এম. আকতার হোসেন, কামাল মোস্তফা চৌধুরী, জহিরুল ইসলাম চৌধুরী (আলমগীর), মো. অহীদ সিরাজ চৌধুরী স্বপন, সরওয়ার হাসান জামিল ও মো. আবদুল মান্নান সোহেল প্রমুখ।

x