রোগী ও লাশ পরিবহন নীতিমালা কার্যকর ২ এপ্রিল থেকে

আজাদীর এ উদ্যোগ অন্যান্য সেক্টরেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে : মেয়র

আজাদী প্রতিবেদন

শুক্রবার , ২৩ মার্চ, ২০১৮ at ৩:২১ পূর্বাহ্ণ
164

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল এলাকায় ‘রোগী ও লাশ পরিবহন নীতিমালা’ কার্যকর হচ্ছে আগামী ২ এপ্রিল থেকে। ওই দিন থেকে প্রথম তিন মাস পরীক্ষামূলক ভাবে এই নীতিমালাটি চালু থাকবে। দৈনিক আজাদী ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) যৌথ আয়োজনে গতকাল দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে নীতিমালাটি কার্যকরের আনুষ্ঠানিক এ ঘোষণা দেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।
দৈনিক আজাদীর উদ্যোগে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক), চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি), বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ), বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ), চট্টগ্রাম অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতি ও প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সকলের মতামত ও সম্মতিতে নীতিমালাটি প্রণয়ন করেছে চসিক ও চমেক হাসপাতাল।
সিটি কর্পোরেশনের কে বি আব্দুচ ছাত্তার মিলনায়তনে নীতিমালাটি কার্যকরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে গিয়ে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, কোনো ধরনের নিয়ম-শৃঙ্খলা না থাকায় রোগী ও লাশ পরিবহনে এতদিন ধরে হয়রানি-ভোগান্তির শিকার হয়ে আসছিলেন সাধারণ লোকজন। যা অমানবিকও বলা যায়। বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে নিয়ে রোগী ও লাশ পরিবহনে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসকে শৃঙ্খলায় আনতে দৈনিক আজাদীর যে ভূমিকা তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। আজাদী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলেই সংশ্লিষ্ট সকল দফতরের সম্পৃত্ততায় ও সম্মতিতে এ নীতিমালা প্রণয়ন সম্ভবপর হয়েছে। এ উদ্যোগটি অন্যান্য সেক্টরেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আমি আশা করি। নীতিমালাটি প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদও প্রকাশ করেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।
এমন উদ্যোগ গ্রহণ করায় দৈনিক আজাদীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সংবাদ সম্মেলনে চমেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জালাল উদ্দিন বলেন, নীতিমালাটি চূড়ান্ত করতে সংশ্লিষ্ট সব দফতর নিয়ে আমরা বেশ কয়েক দফা বসেছি। সকলেই খুব আন্তরিক ভাবে সহযোগিতা করেছেন। যার ফসল এই ‘রোগী ও লাশ পরিবহন নীতিমালা’। নীতিমালা প্রণয়ন হয়েছে, এখন তা বাস্তবায়নের পালা। এই বাস্তবায়নটাই গুরুত্বপূর্ণ। নীতিমালাটি বাস্তবায়নে গণমাধ্যমসহ সকলের সহযোগিতা চান চমেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জালাল উদ্দিন।
দৈনিক আজাদীর উদ্যোগে সাড়া দিয়ে নীতিমালা প্রণয়নে এগিয়ে আসায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চমেক হাসপাতাল, চমেক, সিএমপি, বিআরটিএ, বিএমএ, অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতি ও প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন দৈনিক আজাদীর পরিচালনা সম্পাদক ওয়াহিদ মালেক।
আন্তরিক ভাবে সহযোগিতা করায় অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দের প্রতি বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে ওয়াহিদ মালেক বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, যাদের জন্যই মূলত এই নীতিমালা, নীতিমালাটি প্রণয়নে তাঁরা (অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতি) খুব আন্তরিক ভাবে সহযোগিতা করেছেন। সর্বাত্মক ভাবে সহযোগিতা করায় সিটি মেয়রের প্রতিও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান দৈনিক আজাদীর পরিচালনা সম্পাদক।
নীতিমালা প্রণয়ন কমিটির সদস্য চমেক অধ্য প্রফেসর ডা. সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, বিএমএ’র সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়সল ইকবাল চৌধুরী ছাড়াও সিএমপি’র সহকারী কমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) মিজানুর রহমান, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি কলিম সরোয়ার, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হাসান ফেরদৌস, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের যুগ্ম-সম্পাদক চৌধুরী ফরিদ, চট্টগ্রাম অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সহ-সভাপতি মো. আমানুল্লাহ চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মো. আকতারুজ্জামান প্রমুখ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ‘লাশ বহনে অমানবিক বাণিজ্য বন্ধে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে দৈনিক আজাদী। চমেক হাসপাতালের সভা কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের জিম্মিদশা থেকে ভুক্তভোগীদের মুক্তির উপায় হিসেবে বেশ কিছু প্রস্তাবনাও তুলে ধরা হয় আজাদীর পক্ষ থেকে।
দৈনিক আজাদীর পরিচালনা সম্পাদক ওয়াহিদ মালেকের সঞ্চালনায় গোল টেবিল বৈঠকে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জালাল উদ্দিন, চমেক অধ্য প্রফেসর ডা. সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) মো. আব্দুল ওয়ারীশ, বিএমএ চট্টগ্রামের সভাপতি ডা. মুজিবুল হক খান, সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়সল ইকবাল চৌধুরী, জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক ডা. মাহফুজুর রহমান, বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সুলতান মাহমুদ, চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সভাপতি আনোয়ার হোসেন লিটন, সাধারণ সম্পাদক মো. আকতারুজ্জামান ও আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টরা অংশ নেন।
চমেক হাসপাতাল এলাকা থেকে রোগী ও লাশ পরিবহনে অ্যাম্বুলেন্স পরিবহনকে (সার্ভিস) নীতিমালার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় গোলটেবিল বৈঠকে। সিদ্ধান্তের আলোকে নীতিমালা প্রণয়নে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জালাল উদ্দিনকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়। আর চমেক অধ্য প্রফেসর ডা. সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, দৈনিক আজাদীর পরিচালনা সম্পাদক ওয়াহিদ মালেক, বিএমএ’র সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়সল ইকবাল চৌধুরী ও বিআরটিএ চট্টগ্রামের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ কমিটির সদস্য।
নীতিমালা প্রণয়নে অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ, নগর পুলিশের প্রতিনিধি, বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করে নীতিমালা প্রণয়ন কমিটি। বেশ কয়েক দফা বৈঠক ও বিস্তর আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মতিতে একটি খসড়া নীতিমালা চূড়ান্ত করতে সক্ষম হয় কমিটি। যা (খসড়া নীতিমালা) গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের নিকট হস্তান্তর করা হয়।
জনস্বার্থে প্রণীত এই নীতিমালা সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের সম্মতিদানের মাধ্যমে চূড়ান্ত হয়।
নীতিমালায় যা আছে:
প্রণীত নীতিমালা অনুযায়ী, চমেক হাসপাতাল এলাকা থেকে রোগী ও লাশ পরিবহনে আগ্রহী অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসকে হাসপাতাল প্রশাসন কর্তৃক নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। কেবল নিবন্ধিত পরিবহনই হাসপাতাল এলাকা থেকে রোগী ও লাশ পরিবহনের সুযোগ পাবে। আর নিবন্ধন পেতে পরিবহনগুলোকে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পালন করতে হবে।
চমেক হাসপাতাল প্রশাসন কর্তৃক রোগী ও লাশ পরিবহনে একটি নিয়ন্ত্রণ ক চালু করা হবে। নিয়ন্ত্রণ কক্ষে হাসপাতাল কর্তৃক একজন কর্মচারী (শিফট ভিত্তিক) নিয়োজিত থাকবেন। পরিবহন সমূহের তালিকা, পরিবহন কোম্পানির ঠিকানা, মালিক/চেয়ারম্যান/ব্যবস্থাপনা পরিচালক/চালকের মোবাইল নম্বর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে সংরক্ষিত থাকবে। তিনটি ক্যাটাগরিতে সিরিয়াল থাকবে (ফ্রিজার ভ্যান, এসি ও নন-এসি)। সিরিয়ালে এসি পরিবহন থাকলেও গ্রাহক যদি এসি পরিবহন নিতে আগ্রহী না হন, সে েতে্র ওই এসি পরিবহন নন-এসির ভাড়ার হারে ট্রিপ দিতে সম্মত হলে এসি বাহনকে নন-এসি সিরিয়াল দেয়া হবে।
গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী হাসপাতালের নির্দিষ্ট স্থানে পরিবহনকে অবস্থান নেয়ার জন্য নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে মোবাইলে চালককে জানানো হবে। কোনো পরিবহন ট্রিপ ভোগ করতে না পারলে তার সিরিয়াল শেষে চলে যাবে। সর্বোচ্চ পাঁচটি পরিবহন হাসপাতালের পার্কিং এ অবস্থান করতে পারবে।
আনজুমান মফিদুল ইসলাম, সিটি কর্পোরেশন এবং অন্যান্য রেজিস্টার্ড অলাভজনক ও সমাজ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের পরিবহন এই নিয়মের আওতায় পড়বে না বলে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে। নীতিমালা বলা হয়েছে, গন্তব্যে যাওয়া-আসার পথে ব্রিজ/ফ্লাইওভার/রাস্তার প্রয়োজনীয় টোল (যদি থাকে) গ্রাহককে পরিশোধ করতে হবে। তিন ক্যাটাগরিতে পরিবহন নিবন্ধনকৃত হবে (নন-এসি, এসি ও ফ্রিজার ভ্যান)। ফিটনেস্‌্‌ নিশ্চিত করার নিমিত্তে বিআরটিএ একজন ইন্সপেক্টর নিয়োগ করবে। শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে গাড়ির নিবন্ধন বাতিল ও কালো তালিকাভুক্ত করা হবে। গ্রাহকের অভিযোগ জানানোর সুবিধার্থে একটি হেল্প লাইন চালু করা হবে বলেও উল্লেখ রয়েছে নীতিমালায়।

x