রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ও জাতিসংঘ ভূমিকা

সোমবার , ৭ মে, ২০১৮ at ৪:২৭ পূর্বাহ্ণ
42

প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সফর করেছে জাতিসংঘের পাঁচ স্থায়ী সদস্যসহ নিরাপত্তা পরিষদের সব সদস্য দেশের প্রতিনিধিরা। তাঁদের উদ্দেশ্য হলো বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান খোঁজা। অভিযুক্ত দেশ মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে বিতাড়িত নাগরিকদের সসম্মানে নিরাপদে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার উপায় বের করার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে জাতিসংঘের ২১টি দেশের প্রতিনিধিদের এই উপস্থিতি। এই দলে ছিলো স্থায়ী সদস্য দেশ চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য। এ ছাড়া ছিলো নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য বলিভিয়া, আইভরি কোস্ট, গিনি, ইথিওপিয়া, কাজাখস্তান, কুয়েত, নেদারল্যান্ডস, পেরু, পোল্যান্ড ও সুইডেন। শুধু ১৫টি স্থায়ী সদস্য দেশই নয়, সঙ্গে ছিলো আরো ছয়টি দেশের প্রতিনিধিও (বার্বাডোজ, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো, মিসর, জর্ডান, সুইজারল্যান্ড)

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফর একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও এই সফরের পরেই পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হবেতা বলা যাবে না বা আশাও করা যাবে না। কেননা, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিদলই বলেছে, রোহিঙ্গা সংকটের জাদুকরী সমাধান নেই। প্রতিনিধিদলের সবার মুখে একই কথাএটি এক ভয়ঙ্কর সংকট। কাজেই এটার সমাধানে জাদুটোনা কাজে আসবে না। তাঁরা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তমব্রু সীমান্তে শূন্যরেখায় আশ্রয় শিবিরে গিয়ে সরাসরি রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে নৃশংসতার কাহিনি শোনেন।

এখানে বলা বাহুল্য, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক চাপের পরিপ্রেক্ষিতে নানা উদ্যোগ নিয়েও টালবাহানার শেষ নেই মিয়ানমারের। গত বছর ২৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সভায় তীব্র সমালোচনার মুখে মিয়ানমারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা উ থুয়াং তুন জানান, ১৯৯২ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে করা চুক্তি অনুসারে হবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। সেই প্রতিশ্রুতির সাত মাস পরেও এই সংকট সমাধানে মিয়ানমারের আন্তরিকতার ছিটেফোঁটারও দেখা মেলেনি।

বাংলাদেশ তো বটেই বিশ্বের বাঘা বাঘা দেশের উদ্বেগ, নিন্দা, প্রতিবাদ, অনুরোধ সবকিছুকে থোড়াই কেয়ার করছে মিয়ানমার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাশিয়া ও চীনসহ জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদলের এই সফর তাই গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের জন্য। এতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরো বাড়ল, সন্দেহ নেই। শরণার্থীদের দুরবস্থা সরেজমিন পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের পর, প্রতিনিধিদলের মিয়ানমার সফর এই ইস্যুতে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ পদক্ষেপ। এটি শুধু জাতিসংঘের সভায় নিন্দা জানানো কিংবা প্রস্তাব উত্থাপনে সীমাবদ্ধ থাকবে না কিংবা নেই, তা বলা বাহুল্য।

সারা বিশ্ব অবগত যে, শরণার্থীদের আশ্রয় প্রদান করতে গিয়ে বাংলাদেশ এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর আগমন তাদের নিরাপত্তা বিধান ও পরিচর্যার জন্য বিশাল ধরনের কর্মযজ্ঞের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। ঘনবসতি, সম্পদের স্বল্পতা, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে দারিদ্র্যের মাত্রা ও পরিকাঠামোগত স্বল্পতা এবং একই সঙ্গে শরণার্থী মোকাবিলার প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অনুপস্থিতি বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে। এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের উচ্চতম পর্যায় থেকে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে বেশ কিছু সেক্টর চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই চাপ মোকাবিলায় দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আহ্বান জানিয়েছে, যার সাড়া ইতিমধ্যে মিলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সুদূরপ্রসারী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে, একই সময়ে ৯১০ লাখ শরণার্থীর জন্য ত্রাণ এবং সুরক্ষা প্রদান করার গুরুদায়িত্ব বাংলাদেশের ওপর বর্তেছে। এই পরিস্থিতিতে এই সম্ভাব্য প্রলম্বিত শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। সে ক্ষেত্রে শরণার্থীদের ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের যথেষ্ট বিচক্ষণতা ও সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। মানবিকতার সঙ্গে প্রয়োজন বিরাজমান বাস্তবতার সঠিক মূল্যায়ন। এ ক্ষেত্রে জরুরি হচ্ছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আমরা কীভাবে আখ্যায়িত করছি, তা নির্দিষ্ট করা এবং সরকারের উদ্যোগকে যথাযথভাবে প্রতিপূরণ (সাপ্লিমেন্ট) করতে পারে, এমন সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া যার শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলায় অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা রয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এখনো এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কিছুটা ঘাটতি রয়েছে।

জাতিসংঘ হচ্ছে এমন একটি জায়গা, একমাত্র যে সংগঠন যারা মিয়ানমারকে রাজি করাতে পারে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন এবং নাগরিকত্বের ব্যাপারে। মিয়ানমার কারও কোনও পরোয়া করে না। কিন্তু জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে তার একধরনের দায়বদ্ধতা আছে। বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন লেভেলে, এবং এটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যে জাতিসংঘের মাধ্যমে জিনিসটা সমাধানের চেষ্টা করা।

x