লতিফ রহমান ও জাহানারা-মমতাজ উচ্চ বিদ্যালয়ের পূণর্মিলনী

ফিরতে চেয়েছে সবাই শৈশব-কৈশোরের দুরন্তপনায়

এম এস আকাশ, ফটিকছড়ি

সোমবার , ১৬ এপ্রিল, ২০১৮ at ১২:১৪ অপরাহ্ণ
11

কেউ তুলছে সেলফি, কেউ মেতেছে আড্ডায়গানে, কেউ এসেছে স্ত্রীসন্তান নিয়ে, কেউ এসেছে নাতিনাতনী নিয়ে। বয়সের কোন ভেদাবেদ নেই। ওরা গাইছে পুনর্মিলনীর গান। ওরা সবাই আজ ফিরেছে কৈশোরের দুরন্তপনায়। এমনি এক প্রাণচঞ্চল দৃশ্য চোখে পড়েছে ফটিকছড়ির জাফতনগরস্থ লতিফ রহমান উচ্চ বিদ্যালয় ও জাহানারামমতাজ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে।

গত ৩১মার্চ ছিল এই দুই বিদ্যাপীঠের পুনর্মিলনী। তাই ৫০ বছরের পুরনো অনেক ছাত্রছাত্রীশিক্ষকশিক্ষিকা এসেছেন স্মৃতির ঝুড়ি নিয়ে।

উল্লেখ্য, ১৯৬৮ সালে ব্যবসায়ী ও সমাজ সেবক এম এ হাদী ও মাস্টার আবদুল লতিফের অর্থায়নে জাফত নগর গ্রামে প্রায় ১০ একর জমির উপর গড়ে উঠেছে বিদ্যাপীঠ দুটি।

সকাল আটটায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও বর্নাঢ্য র‌্যালীর মাধ্যমে পুনর্মিলনী অনুষ্টানের উদ্বোধন করেন জাফত নগরের সাবেক চেয়ারম্যান, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মান্নান চৌধুরী। র‌্যালী শেষে লতিফ রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক মো.আবদুল হামিদের সভাপতিত্বে স্মৃতি চারণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ফটিকছড়ির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপক কুমার রায়। পুনর্মিলনীর সদস্য সচিব মো. অহিদুল আলমের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন প্রাক্তণ প্রধান শিক্ষক সুদত্ত মুৎসুদ্দি, প্রাক্তাণ ছাত্র শেখ জাকারিয়া জকু, প্রাক্তন শিক্ষক মোফাচ্ছেল, এস এম জাকারীয়া, লতিফ রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক একেএম মহিউদ্দিন, উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য খাদিজাতুল আনোয়ার সনি, উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি বখতেয়ার সাঈদ ইরান, ছাত্রলীগ নেত্রী সাবিনা চৌধুরী, প্রাক্তণ ছাত্র আফাজ উদ্দিন, আজগর, হাকিম পারভেজ প্রমুখ।

দুপুরে প্রীতিভোজের পর বিকেল বেলায় পুনর্মিলনীর আহবায়ক জাফতনগর ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল হালিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা এটিএম পেয়ারুল ইসলাম। প্রধান আলোচক ছিলেন নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী আলী আশরাফ। বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামীলীগের সদস্য মো. শাহজাহান, চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের আহবায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের সদস্য এডভোকেট উম্মে হাবীবা, যুবলীগ নেতা মুজিবুর রহমান স্বপন, আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ মোহাম্মদ বাকের, সেনোয়ারা জুয়েলার্সের স্বর্তাধীকারী মো. আলমগীর প্রমুখ। আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, যুগে যুগে সমাজ সেবক ও শিক্ষানুরাগী আবদুল হাদী ও শিক্ষাবিদ আবদুল লতিফ মাস্টারের মতো ব্যক্তিদের জন্ম হয়েছে বলেই পৃথিবী এত সুন্দর। এক ভাই ব্যবসা বাণিজ্য করে আয় করেছেন। সেই টাকা দিয়ে স্কুল করে অপর ভাইকে শিক্ষা বিস্তারের দায়িত্ব দিয়েছেন। তাও বিনা বেতনে। শিক্ষার্থীরাও পড়বে বিনা বেতনে। ভাবতে অবাদ লাগে। এ বিশ্ব এমন ব্যক্তিদের যুগে যুগে মনে রাখবে। এমন শিক্ষা প্রতিষ্টানের মাধ্যমে।

১৯৯১ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী রাশেদা পারভীন লাকী বলেন, আমাদের ব্যাচের সব বান্ধবী এক হতে পেরেছি। ছেলেমেয়েস্বামীও এসেছে অনেকে। সবাই একই ড্রেস পরে এসেছি। স্কুলের দুষ্টামী গুলো মনে করে আড্ডাবাজি করেছি। আবার কখন দিবো সেই আড্ডা? তাই প্রতি বছর একটি পুনর্মলিনী দরকার।

২০০৪ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী স্বপ্নীল খান তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, স্কুলমাঠবন্ধুত্বতা, রেষারেষি, ফুটবল, প্রেমঅভিমান। হারানো আঙিনা । হারানো সময়। স্মৃতির বায়োস্কোপে চোখ রেখে, সেই কিশোরবেলার মুখে এসে পড়ল একরাশ আবেগের আলো! মনে পড়ে গেল স্কুল ব্জীবনে শৈশবের কথা। পুরনো দিনের সরণী বেয়ে নেমে এল চকডাস্টার, অঙ্কের ক্লাস, বিশেষ করে হারিয়ে ফেলা আনোয়ার স্যার এর বিভিন্ন অঙ্গ ভঙ্গি নিয়ে পিঠানোর কথা, কাঁচের শিশিতে নানা রঙের রাসায়নিকে ভর্তি ল্যাব, বার্ষিক অনুষ্ঠানের রিহার্সাল, গেটের গেট ম্যান বাইরে হাত বাড়িয়ে জেঠু থেকে আচার চকোলেট,আইসক্রিম আরও কতো কি! আসলে সেই স্কুলটি নিয়ে লেখা হয়ে যেত প্রতি শৈশবেকৈশোরে ব্যক্তিগত জীবনের এক উপকথা? আজীবন যা নস্ট্যালজিয়া যোগান দিয়ে যাবে? ৩১ মার্চ ২০১৮ মন ঘুরল সেই ৫০ বছর পূর্তি সূবর্ণ জয়ন্তী পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান দেখে, মনে হয়েছিল আবারও উড়ে যাই, ফেলা আসা দিনের কাছে শৈশবের বন্ধুদের কাছে। কি আর করা ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। আসলে স্কুল ছাড়া শৈশব ভাবা যায় কি…?

জাহানারা মমতাজ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা পল্লবী খাস্তগীর তার ফেসবুকে লিখেছেন, প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা শুধু স্মৃতি রোমন্থ করতে আসেননি। স্কুলের জন্য শিক্ষা বৃত্তি, শিক্ষকশিক্ষিকার জন্য সম্মাননা ক্রেস্ট, উপহার নিয়ে এসেছেন। এতে বুঝা যায় তাদের দায়িত্ব বোধ আমরা জাগ্রত করতে পেরেছি।

পুনর্মিলনী উদযাপন পরিষদের সদস্য সচিব অহিদুল আলম বলেন, প্রতিক্ষণেই স্মৃতির পাতায় লিপিবদ্ধ হচ্ছে। কিছু স্মৃতি কখনো ভুলবার নয়। সেই স্মৃতির নষ্টালজিয়া ফেরাতে এই পুনর্মিলনীর আযোজন। স্মৃতি লেখা নিয়ে প্রকাশনা হয়েছে ”স্বপ্ন জাল”।

প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক আবদুল হামিদ বলেন, ছাত্রছাত্রীদের এতো ভালোবাসা দেখে আবার শিক্ষকতায় ফিরে যেতে মন চাইছে। কিন্তু বয়সতো আমার দাঁড়িয়ে নেই। এই বিদ্যাপীঠের ছাত্ররা একটি সুন্দর আগামীর কর্ণধার হবে। সব সময় এই কামনা করি।

x