শতভাগ যোগ্যতাভিত্তিক

প্রাথমিক শিক্ষা

ড.মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন

শনিবার , ৫ মে, ২০১৮ at ৬:২০ পূর্বাহ্ণ
192

প্রাথমিক শিক্ষাকে শিক্ষার্থী পাঠের প্রথম সোপান হিসাবে ধরা হয়। বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষার হাল বা কি। ভেবেছিলাম আর না। কিন্তু বিবেকের জায়গা থেকে লিখনি বন্ধ করা যায় না। তবে কেউ শুনবে এমন প্রত্যাশা আর করি না। আবার বেশি লিখতে গেলে কখনও মহাবিপদ অপেক্ষা করে তাও বলা মুশকিল। দেখুন। বছরের প্রায় ৪ মাস শেষ এরইমধ্যে চলতি বছর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি কয়েকবার। ভিত্তি মজবুত করার এই পরিসরে বলুন তো ভিত্তিটি কেমন প্রকৌশলীর হতে পড়ল? এই অবস্থা চলতি বছর যে তা না। প্রতি বছরই এমন নানা তালবাহানা। পরিবর্তন। পরিবর্ধন। পরিমার্জন চলছেই।

আপনারা নিশ্চয় জানেন পৃথিবীর সেরা শিক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে খ্যাত ফিনল্যান্ডের স্কুলগুলোতে প্রথম ৬ বছর কোন পরীক্ষা হয় না। ১০ বছরের পড়ালেখা শেষ করে বড় ধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিতে হয় শিক্ষার্থীদের। তারা আমাদের চেয়ে পিছিয়ে? তাদের পড়ালেখার মান কোথায়? আমরা কোথায়? কত রঙ, কত ধরনের পরীক্ষা চালু হয়েছে। কত রকমের ফল, কত উৎসব। আবার এখানেই ক্ষান্ত নন মন্ত্রী মহোদয় রীতিমত গবেষণার কাজ চালাচ্ছেন শিশুদের উপর। কিভাবে ফল বের হবে, কত তারিখে, কতজনকে এ+ দিবেন ইত্যাদি ধরনের গবেষণা। কেন বেশি ফল হল? কেন বেশি এ+ পেলেন? অবাক হয়ে বসে আছি। আমাদের এত শত শিক্ষাবিদগবেষক তাদেরও কোন আওয়াজ নেই।

এই বছরের নতুন ধরনের গবেষণার ফল হল প্রাথমিকে এমসিকিউ বাদ। এখন সব প্রশ্ন হবে যোগ্যতাভিত্তিক। প্রাথমিকের এই যোগ্যতাভিত্তিক প্রশ্নকে বলা হয় কাঠামোবদ্ধ যা মাধ্যমিকে সৃজনশীল নামে পরিচিত। বর্তমানে পরীক্ষায় অর্থাৎ গত ৪ মাস যাবৎ আমরা ৫০ নম্বরের এমসিকিউ এবং ৫০ নম্বরের কাঠামো প্রশ্ন পড়িয়ে আসছি। প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করার নাকি এটি অভিনব কৌশল হিসাবে কাজে লাগবে। বাহ! দারুণ। এমন হলে তো রাতারাতি সোনার হরিণ পাওয়ার মত বিষয় হবে। হোমিও চিকিৎসাও এখন রোগী ভাল করে, তবে রোগ ভাল করে কিনা প্রশ্নটা থেকেই যায়?

ইংরেজি education কথাটির মূল ল্যাটিন অর্থ হল, ‘ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ সম্ভাবনাকে অগ্রসর করে নেয়া।’ শিক্ষার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে শিক্ষাবিজ্ঞানীরা বলেছেন এভাবে, ‘education is nothing but the gradual and harmonious development of body soul and mind .’ ‘যা কিছু শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণ করা হয় তাই শিক্ষা। আর শিক্ষা বলতে সুশিক্ষাকে বুঝায়।’ অপরদিকে ‘তুমি যদি কাউকে ১ কেজি মাছ দাও তাহলে তার ১ দিনের আহারের ব্যবস্থা করলে, আর যদি কাউকে মাছ ধরতে শিখিয়ে দাও তাহলে তুমি তার সারা জীবনের খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করলে।’

মাঝে মাঝে কয়েকটি সাক্ষাতকার, টেবিল শো করেই ক্ষান্ত তারা। সবই মন্ত্রীমহোদয় যা বলেন। যা করেন সেদিকেই। আমরা মানুষ মোহাম্মদ (.) বা হেমাঙ্গিনীর চরিত্র নিজের ভাষায় লিখতে পারি না। নোট বা গাইডে যে ভাষায় দেয়া আছে তাই লিখতে ও শিখতে হয়। অথচ শ্রদ্ধেয় মন্ত্রী মহোদয় বোধহয় জানেন যে, জাপান বা কোরিয়ার মত রাষ্ট্রে গণিত বা জটিল বিষয়গুলোর উপর সমস্যা সমাধানমূলক শ্রেণি কার্যক্রমের উপরই বেশি গুরুত্ব দেয়। আমরা আমাদের শিশুদের সেখানে মুখস্ত করানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত করি।

বছরের শুরু বই, গাইড, নোট ইত্যাদির একটি দারুণ লম্বা তালিকা দেয়ার ও পাওয়ার মধ্য দিয়েই আমাদের শিশুটির শিক্ষা শুরু। অথচ উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে শ্রেণি কার্যক্রম শুরুর দিন শিক্ষা সামগ্রী তথা ফুল, খেলনা উপহার দিয়ে শুরু হয় নতুন বছরের প্রথম দিন। এই কাজটি করে জার্মানির মত রাষ্ট্র। অথচ আমাদের শিশুরা ফুলের গন্ধ না পেয়ে বইয়ের গন্ধ নেয়। তার ব্যাগ ভর্তি বই নিয়ে আসতে হয় মাবাবা বা বাসার কাজের মেয়েকে। বইয়ের ব্যাগ বহন করে আসার মত সেই সামর্থ্যও ছোট্ট মানুষটির এখনও হয়নি। সেখানে বছরের ৪ মাসে কয়েক দফা পরিবর্তনের যে ধারা তাতো তার সকল ধরনের সামর্থ্যের বাইরে।

অপরদিকে স্কুলের পড়া মানে শেষ কথা নয়। পাশের বাসার ভাবিটির ছেলে এ+ পেয়েছে আমারটাকে পাওয়ার ব্যবস্থা না করলে মান যাবে। এই ধারণা থেকে শুরু হয় ফযর থেকে রাত ১২টা শ্রেণি কার্যক্রমের পাশাপাশি কোচিং, প্রাইভেট, স্যারের বাসায় দৌঁড়ঝাপ। এই দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী ও তাদের প্রিয় অভিভাবকের খাওয়ার ব্যবস্থা হয় কখনও রিক্সায় আবার কখনও রাস্তায়। অথচ ইতালি, ফ্রান্স, মেক্সিকোতে স্কুলের সময় বেঁধে দেয়া হয় শিক্ষার্থীর পরিবারের সাথে দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই। উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে যেখানে শিশুর বয়স ১০ বছর না হওয়া পর্যন্ত বাড়ির কাজের কোন ব্যবস্থা নাই। সেখানে আমাদের শিশুদের বাড়ির কাজ না দিলে পরদিন অভিভাবক লম্বা দরখাস্ত নিয়ে বাড়ির কাজ না দেয়ার যেমন প্রতিবাদ দেখেছি, তেমনি স্কুল পরিবর্তন করতেও আপনার অনুমতি নিবেন না।

শিক্ষাবর্ষ শুরুর ৪ মাস পর এমন পরিবর্তন কতটা যৌক্তিক? তা দেখার সুযোগ কম। কারণ চাপিয়ে দেয়ার সুযোগ শিক্ষামন্ত্রণালয়েরই বেশি। তাদের হাতেই রয়েছে শিশুর শিক্ষাজীবন। এমন একটি সিদ্ধান্ত অন্তত এক বছর আগেই হওয়া দরকার ছিল। শিশুদের, জনগণের মন বুঝার কেউ নাই। চারদিকে আওয়াজ উঠল প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার দরকার নাই। অথচ একজন বলল তা চলবে। আর সবাই থেকে গেল। আবারও সেই এ+ পাওয়ার প্রতিযোগিতা চারদিকে।

ছাত্রদের মন মনন বিকাশে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা একটি বাঁধা। এটি আমাদের মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরও বার বার বলে এসেছেন। বলেছেন সমাজে শিক্ষাবোদ্ধারা। অবশেষে সুন্দরের জয় হোক। আমাদের শিশুদের উপর গবেষণার শেষ হউক। পড়ালেখা, জ্ঞানচর্চা বেড়ে যাক। দেশটা জ্ঞানী, সৃজনশীল, মননশীল মানুষে ভরে উঠুক। বাস্তবায়ন হোক বা না হোক স্বপ্নটা সব সময় এমনই দেখি। বেশি বেশি স্বপ্ন দেখুন।

তাহলে বলতে হবে না, লিখতে হবে না। প্রতিবাদতো বহু আগেই শেষ। আপনি বেশি বেশি নিরাপদ থাকবেন। শিশুরাও নিরাপদ থাকুক।

x