শিক্ষার নিম্নমান ও দুর্বল মানবসম্পদ টেকসই উন্নয়নে বড় বাধা

শনিবার , ৫ মে, ২০১৮ at ৫:২৫ পূর্বাহ্ণ
33

শিক্ষার নিম্নমান দুর্বল মানবসম্পদ তৈরি করছে। মাধ্যমিক স্তরের বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে শিখন মান যাচাইয়ে ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো একটি জরিপ চালায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর। তাতে দেখা যায়, অষ্টম শ্রেণির অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থীর বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে কাঙিক্ষত দক্ষতা নেই। বিষয়ভিত্তিক শিখন মান যাচাইয়ে লার্নিং অ্যাসেসমেন্ট অব সেকেন্ডারি ইনস্টিটিউশনস (লাসি) শীর্ষক জরিপটি চালানো হয় দেশের ৩২ জেলার ৫২৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর। এতে অংশ নেয় ষষ্ঠ ও অষ্টম শ্রেণির ৩১ হাজার ৬২০ শিক্ষার্থী। অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের যেসব প্রশ্ন করা হয়েছিল, তার মধ্যে একটি ছিল ‘সন্ধি’ নিয়ে। ‘মৃৎ+ময়’এর সন্ধি হলে কী হবে? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারে ৪১ শতাংশ শিক্ষার্থী। অষ্টম শ্রেণির ৫৯ শতাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যেই বাংলা ব্যাকরণের এ মৌলিক বিষয়ে জ্ঞান নেই। ইংরেজি ভাষায় শিক্ষার্থীর দক্ষতা পরিমাপে প্রশ্ন করা হয় সর্বনামের ব্যবহার নিয়ে। একটি পূর্ণাঙ্গ বাক্যের যে স্থানে সর্বনাম ব্যবহার হবে সে স্থানটি শূন্য রাখা হয়। শূন্য স্থান দেয়া হয় চারটি সম্ভাব্য উত্তর এ প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারেনি অষ্টম শ্রেণির ২৭ শতাংশ শিক্ষার্থী। গণিতের দক্ষতা যাচাইয়ে বিভিন্ন দূরত্বের জন্য লাল ও সবুজ রঙের দুটি ট্যাক্সির ভাড়া লেখচিত্র অঙ্কন করে ৫০ কিলোমিটারের জন্য অপেক্ষাকৃত সস্তা ট্যাক্সি নির্বাচন করে কারণ ব্যাখ্যা করতে বলা হয়। এর সঠিক উত্তর দিতে সক্ষম হয় অষ্টম শ্রেণির মাত্র ২ শতাংশ শিক্ষার্থী। ৯৮ শতাংশ শিক্ষার্থী সঠিক উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়। সম্প্রতি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক খবরে এসব তথ্য পরিবেশিত হয়। গ্রাফের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট বছরের মাসভিত্তিক ঢাকার বৃষ্টির দিনের সংখ্যা দেখানো হয়। কোন মাসে বৃষ্টির দিন কম ছিল? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে সক্ষম হয় অষ্টম শ্রেণির ৭৬ শতাংশ শিক্ষার্থী। এ ধরনের প্রশ্নের ভিত্তিতে পরিচালিত জরিপ প্রতিবেদন বলছে, অষ্টম শ্রেণির ৬৬ শতাংশ শিক্ষার্থীর ইংরেজিতে প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই। এছাড়া গণিতে দক্ষতা নেই ৬৫ এবং বাংলায় নেই ৫১ শতাংশ শিক্ষার্থীর। জ্ঞান কাঠামোর এ নিম্নমান তাদের কর্মজীবনেও প্রভাব ফেলছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে নিম্নমানের শিক্ষা ও বাস্তবতার সঙ্গে ন্যূনতম সম্পৃক্ততার কারণে অপর্যাপ্ত তাত্ত্বিক জ্ঞান নিয়ে তারা কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হচ্ছে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। গত ৩১ মার্চ প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ: স্কিলস ফর টুমরো’স জবস্‌’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলছে, দক্ষতার অন্যতম ভিত্তি হলো শিক্ষার্থীর অক্ষর জ্ঞান ও গাণিতিক হিসেবের সক্ষমতা। মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার নিম্নমুখী মানের কারণে তাত্ত্বিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষতার ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে। পরবর্তীতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কার্যকরভাবে দক্ষতা উন্নয়নেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে এ দুর্বল ভিত।

উন্নয়নের মূল মন্ত্র হলো শিক্ষা। বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ হলেও গুণগত মানের কোন উন্নয়ন হচ্ছে না। শিক্ষার গুণগত মানের যে অবনতি হচ্ছে, তার প্রমাণ আজ সর্বত্র। অনেকে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করছেন বটে, কিন্তু উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেও বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না। আবার কেউ কেউ উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে চাকরি লাভের পর কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতাও দক্ষতার পরিচয় দিতে পারছেন না। এর মূল কারণ হলো, শিক্ষার গুণগত মানের অভাব। এ কারণেই অনেক উচ্চ শিক্ষিতকে বেকার থাকতে হচ্ছে। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা বাজার উপযোগী দক্ষ মানব সম্পদ তৈরি করতে পারছে না। আর দক্ষ মানব সম্পদ তৈরি না হওয়ায় বিদেশিরা এসে বিলিয়ন ডলার নিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে লক্ষ্যগত অসঙ্গতিও রয়েছে। শিক্ষার মান বাড়াতে হলে দক্ষ শিক্ষকের সংখ্যা বাড়াতে হবে। আর এজন্য তাদের সুযোগ সুবিধাও বাড়ানো দরকার। গ্রাম এলাকায় শিক্ষার মানের অবনতি আরো বেশি উদ্বেগজনক। এজন্য সেখানে অবকাঠামোগত উন্নয়নে দৃষ্টি দেওয়া খুবই দরকার। শিক্ষার মানের অবনতির পেছনে বিভিন্ন ধারার শিক্ষা ব্যবস্থাও অনেকাংশে দায়ী। তাই যেসব কারণে শিক্ষার গুণগত মানের অবনতি ঘটেছে, সেগুলো চিহ্নিত করে বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার করে যুগোপযোগী করে তুলতে হবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান হলে সার্বিকভাবে এর মান বৃদ্ধির সঙ্গে দেশের উন্নয়নও সম্ভব হবে। এ অবস্থায় পরিস্থিতি উন্নয়নে শিক্ষকদের গুণগত মান বৃদ্ধি, শিক্ষা খাতে আর্থিক প্রণোদনা বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা এবং শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পরিমাপ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটানো একান্ত প্রয়োজন। আমরা কী ধরনের উন্নয়ন চাই, তার সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার সম্পর্ক রয়েছে। মানসম্পন্ন উন্নয়ন চাইলে অবশ্যই মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রয়োজন। এটা নিশ্চিত হলে কর্মসংস্থানও বাড়বে। জ্ঞান কাঠামোর নিম্নমান কর্মজীবনেও প্রভাব ফেলছে। বিশ্ব ব্যাংক মনে করছে, মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার নিম্নমুখী ও বাস্তবতার সঙ্গে এর ন্যূনতম সম্পৃক্ততার কারণে অপর্যাপ্ত তাত্ত্বিক জ্ঞান নিয়ে তরুণরা কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হচ্ছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার নিম্নমুখী তাত্ত্বিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষতার ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে। পরবর্তীতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কার্যকরভাবে দক্ষতা উন্নয়নেও এ দুর্বল ভিত প্রতিবন্ধক তৈরি করছে। প্রতি বছরই শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। তাই শিক্ষার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক নীতি ও গতি প্রকৃতির আলোকে শিক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয় না করলে এ সংখ্যা ক্রমেই বাড়তেই থাকবে। খাপছাড়া উচ্চ শিক্ষা বেকারত্ব বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশে অসামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে চাকরির বাজারে বিরাজ করছে নাজুক পরিস্থিতি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমন পরিকল্পিতভাবে ঢেলে সাজানো দরকার, যাতে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ লোক বের হয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাতওয়ারি কর্মসংস্থানের চাহিদা ও যোগানের তথ্য প্রতি মাসেই হালনাগাদ করা হয়। ফলে কোন একটা খাতে কী পরিমাণ শূন্যপদ রয়েছে, ভবিষ্যতে খাতটিতে আরো কত সংখ্যক দক্ষ জনবলের দরকার হবে, সে সম্পর্কে আগাম তথ্য থাকে দেশগুলোর কেন্দ্রীয় তথ্য ভাণ্ডারে। ফলে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা করে কোন বিষয়ে কোথায় পড়বে, সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আমাদের দেশে সে ধরনের কোন তথ্য ভাণ্ডার নেই।

নিম্নমানের পাশাপাশি দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি দুর্বল দিক হলো, কর্মসংস্থান নীতিমালার সঙ্গে এর লক্ষ্যগত দূরত্ব। যেমন চাকরির বাজারে চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু বিভাগে অধিক শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। আবার চাহিদা থাকলেও বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও প্রকৌশলের মতো বিভাগে আসন বাড়ানো হচ্ছে না। সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থার নিশ্চয়তায় এখন কী ধরনের শিক্ষা প্রয়োজন, সেদিকে দৃষ্টি দেয়া জরুরি। কর্মসংস্থানের চাহিদা ও শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় নেহাত দরকার। সেক্ষেত্রে সমন্বিত একটি নীতিমালার আলোকে শিক্ষালয় স্থাপনের অনুমোদন ও তা সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখা খুবই প্রয়োজন।

x