সাবাশ বাংলাদেশ

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ১৫ মে, ২০১৮ at ৫:৪৬ পূর্বাহ্ণ
7

এই সুবাদে ঢাকায় আতিক ভাইএর লাল মাটিয়ার বাসায় বেশ ক’বার মুস্তাফা নূর উল ইসলামের চমৎকার সান্নিধ্যে সিক্ত হয়েছি। তাঁর প্রজ্ঞা, ভরাট কণ্ঠ, ব্যক্তিত্বের ঋজুতায় বারবার মুগ্ধ হয়েছি। টিভিতে তাঁর উপস্থাপনাও ছিল অন্য মাত্রার। ভূমিকাহীন বক্তব্য ও লেখনিতে তাঁর বিকল্প দেশে দ্বিতীয় কেউ নেই।

বাংলাদেশ ঢুকে গেল ইতিহাসের নয়াযুগে। নিজস্ব মহাকাশ যান বঙ্গবন্ধু১ সফল উৎক্ষেপণের পর বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসাবে মহাকাশের হিস্যা বুঝে নিল বাংলাদেশ! সত্যিই দেশ ও জাতির জন্য এটা এক অনন্য উপহার। ক’দিন ধরে উড়ি উড়ি করেও বঙ্গবন্ধু১ স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণ বারবার আটকে যাচ্ছিল। সর্বশেষ চূড়ান্ত পরীক্ষানিরীক্ষার পর বৃহস্পতিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ৩টা ৪৭ মিনিট উৎক্ষেপণের চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়। এর আগে দেশ ও বিদেশ প্রবাসী কোটি কোটি বাঙালি গভীর আগ্রহে ক্ষণ গণনা শুরু করেন, অবিস্মরণীয় মুহূর্তটির সাক্ষী হতে। উৎক্ষেপণের মহালগ্নটি ওয়েবসাইটে সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থাা থাকায় দেশ ও প্রবাসী বঙালিরা রাত জেগে অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু উৎক্ষেপণের ঠিক এক মিনিট আগে থেমে যায় বঙ্গবন্ধু১ বহনকারী রকেট ফ্যালকন৯।

উৎক্ষেপণের দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন প্রতিষ্ঠান স্পেস এক্সের পক্ষ থেকে সামান্য কারিগরি ত্রূটির কারণে বঙ্গবন্ধু১ উড়েনি বলে ঘোষণা দেয়া হলে টিভি সেটের সামনে রাত জেগে অপেক্ষমাণ অসংখ্য মানুষের মন খারাপ হয়ে যায়। এদিকে, শুক্রবার দেশের বেশিরভাগ দৈনিক তাদের ছাপানো সংস্করণে বঙ্গবন্ধু স্যাটেইলাইটের সফল উৎক্ষেপণের খবর প্রকাশ করে দেয়। এ’ নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হলেও মিডিয়ার ঘাড়ে বেশি দোষ চাপানোর সুযোগ নেই। কারণ, বঙ্গবন্ধু১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সব প্রস্তুতি এতটাই নিচ্ছিদ্র ছিল যে, সূক্ষ্ম ও জটিল কারিগরি জ্ঞানের হিসাবনিকাশ বোঝা সংবাদ কর্মীদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। প্রতিযোগিতার বাজার ও দেশের প্রতি বাড়তি আবেগের টানে এমন হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

যা হোক, বিষুদবার রাত জাগা ব্যর্থ হলেও শুক্রবারের দিবাগত পুণ্য রাতে বাংলাদেশ দখলে নিল মহাশূন্য। একই সাথে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী, বহুল প্রচারিত দৈনিক আজাদী আগের দিনের ক্ষত পুষিয়ে দিয়েছে সুদাসলে। শনিবার একমাত্র দৈনিক হিসাবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের হালনাগাদ বিস্তারিত তথ্যাদি লিড আইটেম হিসাবে পরিবেশন করে পাঠকের প্রশংসা কুড়ায় কাগজটি।

কিসিঞ্জারের তলাবিহীন ঝুড়ির দেশটির মহাকাশ যান বঙ্গবন্ধু ১ তার দেশের ঝুড়িতে (অত্যাধুনিক রকেট ফ্যালকন) চড়েই মহাকাশে ৩৬ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘযাত্রায় পাড়ি জমাল সফলভাবে। কেটে গেল, উদ্বেগউৎকণ্ঠার অসহনীয় কয়েকটি প্রহর। বাংলাদেশের মহাশূন্য জয় কিসিঞ্জার নরক অথবা অন্য ঠিকানা থেকে যদি দেখে থাকেন, অথবা কোন দেবদূত তার সামনে মনিটর বসিয়ে দৃশ্যটি উপভোগের নির্দেশ দেন, নির্ঘাত বেচারি পরলোকেও আত্মহত্যা করতে চাইবেন! হায়রে বেচারা কিসিন্‌জার! তোমার পেয়ারা পাকিস্তান এখন নাকে মুখে ছাই মেখে তোমার জাত ভাইদের (যুক্তরাষ্ট্র) কিলঘুষি হজম করছে! আর তোমাদের চাষ দেয়া জঙ্গিবাদের কামড় খেতে খেতে উন্নয়ন অভিযাত্রায় বংলাদেশ থেকে হাজার যোজন পেছনে হাঁটছে। বিপরীতে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু এখন বিশ্ব ইতিহাসে শুধু নয়, মহাকাশ ইতিহাসেও দাপটের সাথে ঢুকে গেছে। বঙ্গবন্ধু ১ বিশ্ব দরবারে শুধু বাংলাদেশের মর্যাদা বাড়ায়নি, এই স্যাটেলাইট বাংলাদেশের টেলি, আবহাওয়াসহ, নানামাত্রিক যোগাযোগ সেবাকে বিশ্বমানে উন্নীত করবে। বছরে সাশ্রয় হবে দেশের প্রায় সোয়াশ’ কোটি টাকা। পাশাপাশি ৩৬ হাজার কিলোমিটার উপরের কক্ষপথে স্থাপিত বঙ্গবন্ধু১ এর বাড়তি ২০ টি ট্রান্সফন্ডার অন্য দেশের কাছে ভাড়া দিয়ে বার্ষিক দু বিলিয়ন টাকার বেশি আয় হবে দেশের। জাতির নতুন মহাকাশ জয়ের মুহূর্তে খুশিউচ্ছ্বাসের আবেগে কোটি কোটি বাঙালি চোখের জল আটকে রাখতে পারেননি। মহাকাশে উড়বে বাংলাদেশের পতাকা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ছবি, এতো অকল্পনীয় সুখের অভূতপূর্ব এক আবেশ বটেই!

এদিকে দেশের বিশাল অর্জনের ঠিক আগ মুহূর্তে আমরা হারালাম, জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতীয় অধ্যাপক ড, মুস্তাফা নূর উল ইসলামকে। পরিণত বয়সেই তাঁর পরলোক যাত্রা স্বাভাবিক হলেও কিছু ব্যাক্তিগত স্মৃতি খুব কষ্ট দিচ্ছে। ১৯৯৬ সালের শুরুতে আমার লেখা প্রথম দু’টো গল্পগ্রন্থ ‘ঠিকানা লাশকাটা ঘর’ ও ‘ভয় নেই আমরা আছি’র (ছোটদের) প্রকাশনা অনুষ্ঠানে আসেন এই বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও বঙ্গবন্ধুর অকৃত্রিম সুহ্রদ। আগ্রবাদের হোটেল সেন্ট মার্টিনের অন্তরা মিলনায়তনে ড. অনুপম সেনের সভাপতিত্বে এদিনের আলোচনায় মূল আলোচক ছিলেন তিনি। অন্য আলোচকেেদর মাঝে ছিলেন টিভি নাটকের সময়ের স্বনামখ্যাত এবং প্রখ্যাত টিভি ব্যক্তিত্ব আতিকুল হক চৌধুরী, কবি আসাদ চৌধুরী ও কবি, সাংবাদিক আবুল মোমেন। প্রধান অতিথি ছিলেন তদানীন্তন সিটি মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। আলোচনায় দেশসেরা ব্যক্তিত্বদের প্রশংসায় স্নাত হয় আমার লেখনি। আগে থেকে আতিক ভাইএর সাথে সম্পর্কিত ছিলাম। আমার প্রতি তার আবেগ, স্নেহের কোন বাধ ছিলনা। এই সুবাদে ঢাকায় আতিক ভাইএর লাল মাটিয়ার বাসায় বেশ ক’বার মুস্তাফা নূর উল ইসলামের চমৎকার সান্নিধ্যে সিক্ত হয়েছি। তাঁর প্রজ্ঞা, ভরাট কণ্ঠ, ব্যক্তিত্বের ঋজুতায় বারবার মুগ্ধ হয়েছি। টিভিতে তার উপস্থাপনাও ছিল অন্য মাত্রার। ভূমিকাহীন বক্তব্য ও লেখনিতে তাঁর বিকল্প দেশে দ্বিতীয় কেউ নেই। তাঁর কথা ও লেখনিতে আলাদা দৃঢ়তা, জোর ও শক্তির সম্মিলন ছিল, যা সহজে চোখে পড়ে না। এই মনীষীর মহাযাত্রায় জাতি একজন সর্ব অর্থে ঋজু ও বলিষ্ট মহান ব্যক্তিত্বকে হারিয়েছে, যা কখনো পূরণ হওয়ার নয়।

x