সামাজিকভাবে প্রতিরোধের কথা ভাবতে হবে

বুধবার , ২৫ এপ্রিল, ২০১৮ at ৫:০৮ পূর্বাহ্ণ
28

ইয়াবা এখন মহামারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে গ্রামের আনাচেকানাচে পর্যন্ত বিস্তার ঘটেছে নীরব এই ঘাতক ইয়াবা ট্যাবলেটের। ইয়াবার রাজত্ব ছড়িয়ে পড়েছে বস্তি ছেড়ে অভিজাত পাড়ার স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, সাইবার ক্যাফে, ফাস্টফুড শপ, সেলুন, কফি হাউজ পর্যন্ত। হাত বাড়ালেই মিলে যাচ্ছে ইয়াবা ট্যাবলেট। পাশের বন্ধুই হয়ে পড়েছে ইয়াবা বিক্রেতা। জানা গেছে, চট্টগ্রামসহ দেশের অভিজাত এলাকাগুলোতে স্টাডি সার্কেলের মতো গড়ে উঠছে ইয়াবা সার্কেলও। ছাত্রছাত্রী, তরুণতরুণী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীদের অনেকেই এখন ইয়াবায় আসক্ত। তবে এদের মধ্যে ছাত্রছাত্রী তরুণতরুণীর সংখ্যাই বেশি। ইয়াবার ভয়াবহ ধোঁয়া আগামী প্রজন্মকে আজ ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এ অবস্থায় আগামীতে দেশ মেধাশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইয়াবার ভয়াবহ আগ্রাসন নিয়ে সরকার যেমন উদ্বিগ্ন, চিন্তিত অভিভাবকমহলও। ইয়াবাসেবীর সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। প্রতিদিন দেশের একপ্রান্ত টেকনাফ থেকে বিভিন্ন উপায় ও কৌশলে ইয়াবা ছড়িয়ে পড়ছে দেশের আরেক প্রান্ত তেঁতুলিয়া পর্যন্ত। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে, গ্রামগঞ্জে এখন ইয়াবার জমজমাট ব্যবসা প্রসারিত। সিআইডি’র এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৫ বছরের বেশি বয়সের সেবনকারীর সংখ্যা ৬৩ শতাংশের বেশি। এতে বোঝা যায়, কিশোর ও যুবক ৬৩% হলে বাকি ৩৭% শিশু ও বৃদ্ধ।

গত সোমবার ‘ইয়াবায় জড়াচ্ছে নিত্য নতুন মুখ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক আজাদীতে। এটি সেদিনের প্রধান খবর হিসেবে গুরুত্ব পায়। এতে বলা হয়েছে, ইয়াবায় প্রতিদিন জড়াচ্ছে নতুন নতুন মুখ। জনপ্রতিনিধি, খেলোয়াড়, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য, রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মীবাদ পড়ছেন না কেউ। প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ছেন এর সাথে। প্রতিদিন অভিযান চলছে, ধরাও পড়ছেন। আর বেরিয়ে আসছে নতুন নতুন তথ্য, দেখা মিলছে নতুন নতুন মুখের। সর্বশেষ নগরীর বাকলিয়া থেকে ১৪ হাজার ইয়াবাসহ নাজরীন খান মুক্তা (২৩) নামে এক নারী ক্রিকেটারকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ভোর পাঁচটায় শাহ আমানত সেতুর গোলচত্বর থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। অতীতে একটি কথা প্রচলিত ছিল, ‘বড়লোক মানেই ঋণখেলাপী।’ তবে ইয়াবা সে দুর্নাম ঘুচিয়ে নিজের নামটি জুড়ে দিয়েছে কোটিপতিদের নামের আগে। চট্টগ্রামতো বটেই, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কোটিপতিদের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে ‘ইয়াবা’র কল্যাণে! তাদের অনেকেই এলাকায় দারুণ প্রভাব বিস্তার করে থাকেন; দানদক্ষিণা করার কারণে তাদের জনপ্রিয়তাও বেশ। ঢাকাচট্টগ্রামে দামি গাড়ি ও একাধিক ফ্ল্যাটধারী অনেকেরই খোঁজ মিলছে, যারা দুই থেকে পাঁচ বছর আগেও নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থায় ছিলেন। ‘ক্রেজি ড্রাগ’ ইয়াবা তাদের ভাগ্য খুলে দিয়েছে দেশের ভবিষ্যৎ হিসেবে বেড়ে উঠা কিশোরতরুণদের ‘কুঁড়িতে ধ্বংস’ করে দিয়ে। আঙুল ফুলে কলা গাছ হওয়া এ ধরনের ধনী লোকদের পাশাপাশি ইয়াবা ব্যবসাকে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে পার্ট টাইম জব হিসেবে নিয়ে আয়েশী জীবন কাটছে অনেক ছাত্র, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, গণমাধ্যমকর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য থেকে শুরু করে নানা পেশার মানুষের।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায়, সীমান্ত এলাকার জনপদে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের আশ্রয়প্রশ্রয় রয়েছে ইয়াবা ব্যবসার বিস্তার ঘটানোর পেছনে। এই অভিযোগের সত্যাসত্য বিচার বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে যে কোনো বিষফোঁড়া নির্মূলে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। একসময় চীন ও থাইল্যান্ড ছিল ইয়াবার বড় বাজার। ২০০০ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ব্যাপক অভিযান চালিয়ে ইয়াবা প্রচারপ্রসারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয় সেখানে। এমনকি বহু ইয়াবা ব্যবসায়ী ও গডফাদারদের হত্যাও করা হয়। ফলে সেসব দেশ এখন ইয়াবার থাবা থেকে মুক্ত। মনে রাখতে হবে, মাদক যখন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তখন জাতি সর্বনাশের দিকে ধাবিত হয়। সেই সর্বনাশা জাতি নিয়ে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অবস্থা থাকে না। আস্তে আস্তে মেধাশূন্য হয়ে পড়ে জাতি। মাদক নিয়ন্ত্রণে আরো কঠোর আইন প্রয়োজন, প্রয়োজন বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধের কথাও আমাদের ভাবতে হবে।

x