সাম্প্রতিক কোটা সংস্কার আন্দোলনের কয়েকটি পর্যবেক্ষণ

সাঈদ ইফতেখার

শনিবার , ৫ মে, ২০১৮ at ৬:২০ পূর্বাহ্ণ
138

বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দাবীদার দেশগুলোতে পুঁজিবাদ এখনো পাশ্চাত্যের মত বিকশিত হতে পারেনি যার ফলশ্রুতি হল বেসরকারী খাতের আশানুরূপ উন্নয়ন না হওয়া। এর পাশাপাশি জনগণের বড় একটি অংশের মাঝে এখনো ঔপনিবেশিক মানসিকতা থাকবার ফলে সরকারি চাকরি এদেশে এখনো সবচেয়ে আকর্ষণীয়।

১০১৫ বছর আগের তুলনায় বেসরকারী খাতে ভালো বেতনে চাকরির সুযোগ অনেক বৃদ্ধি পেলেও সাবেকি ধ্যান ধারণা, সারা জীবন চাকরি থাকবে কিনা এ অনিশ্চয়তা বোধ এবং আমজনতার উপর ক্ষমতা চর্চা করতে পারবার মানসিকতা ইত্যাদি নানা কারণে ছাত্রছাত্রী এবং তাদের অভিভাবকদের কাছে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করে আমলা হতে পারা এখনো সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি।

ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রের উত্তরাধিকার হল বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র। মাত্র কয়েক হাজার ব্রিটিশ ভারত উপমহাদেশে প্রায় দুইশ বছর তাদের ঔপনিবেশিক শাসন বজায় রাখতে পেরেছিল তাদের সৃষ্ট বেসামরিক এবং সামরিক আমলাতন্ত্রের সহায়তায়।

ভারতবর্ষের কোটি কোটি জনগোষ্ঠী যেখানে নিরক্ষর এবং ব্রিটিশ শাসনে নিষ্পেষিত হয়ে চরম দরিদ্র অবস্থায় জীবন যাপন করতেন এমন একটি সমাজ থেকে আইসিএস (অভঢধটভ উধশধফ ওণরশধডণ) পরীক্ষার মাধ্যমে হাতে গোণা কয়েক জনকে বেছে নেয়া হত শাসকগোষ্ঠীর কার্যকলাপে সহায়তা করবার জন্য।

ভারতীয় জনগোষ্ঠীর শোষণকারী ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর উচ্ছিষ্ট ভোগী এ শ্রেণীটি নিজেদেরকে এলিট মনে করত এবং শাসকগোষ্ঠীর অংশ হিসাবে ভেবে এক ধরনের আত্মতৃপ্তিতে ভুগত। ব্রিটিশ শাসকরাও এদেরকে তুলনামূলক বিচারে নানাবিধ সুবিধা দিয়ে এরা যে বাকি জনগোষ্ঠী থেকে আলাদা, এ রকম ধারণা তাদের মনে বদ্ধমূল করেছিল।

ব্রিটিশ কর্তৃক জিইয়ে রাখা সামন্ত সংস্কৃতির চর্চাকারী এ আমলা গোষ্ঠীটির সম্পূর্ণ দায়বদ্ধতা এবং আনুগত্য ছিল ঔপনিবেশিক প্রভুর প্রতি। “আদর” করে বৃটিশ প্রভুরা এদের নাম দিয়েছিল সিভিল সারভেন্ট বা “জনগণের ভৃত্য;” কিন্তু, বাস্তবে এরা সবাই পরিণত হয়েছিল জনগণের প্রভুতে।

পাকিস্তান আমলে আইসিএস পরীক্ষার নাম পরিবর্তিত হয়ে হয় সিএসপি (উধশধফ ওণরশধডণ মত টেপর্ধ্রটভ)। নাম পরিবর্তন হলেও উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সামন্তঔপনিবেশিক মানসিকতার চর্চা পাকিস্তানি রাষ্ট্র কাঠামোতেও জেঁকে বসে।

সামরিকবেসামরিক পাকিস্তানি শাসকরা ঔপনিবেশিক শাসকদের মতোই আচরণ করতে থাকেন এবং আমলাদের ক্ষেত্রে তাদের প্রবর্তিত নিয়মকানুন, সুবিধাসমূহ অক্ষুণ্ন রাখেন। সিএসপি কর্মকর্তারা নিজেদেরকে এক একজন ছোট সামন্ত প্রভুর মত জনগণের প্রভু মনে করতেন।

আইসিএস বা সিএসপি কর্মকর্তারা তাদের চাকুরীর দায়বদ্ধতার জন্যই জনগণের সেবক হওয়া তো দূরের কথা জনগণকে আস্থায় রেখে বা তাদের কল্যাণের বিষয়টাকে মাথায় রেখে কোন সিদ্ধান্ত নেন নাই। ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান আমলে তাদের সমস্ত দায়বদ্ধতাই ছিল স্বৈরাচারী শাসক গোষ্ঠীর প্রতি। অপরদিকে সাধারণ জনগণের কাছেও উচ্চপদস্থ আমলারা ছিলেন শোষক শ্রেণীর প্রতিনিধি হিসাবে।

পাকিস্তান আমলে অবস্থার কোন পরিবর্তনতো হয়ই নাই বরং সামরিকবেসামরিক উভয় শাসকগোষ্ঠীই জনগণের উপর তাদের শোষণ এবং পূর্ব পাকিস্তানের উপর তাদের শাসন এ আমলাতন্ত্রের সহায়তায় বজায় রেখেছিল। পাকিস্তান আমলে “অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিক” শাসনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের অনেকের কাছেই শাসক গোষ্ঠীর সেবা দাস এ আমলারা গণশত্রু হিসাবেই প্রতিভাত হয়েছিল।

১৯৭১ সালে গণমানুষ যখন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবার জন্য জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তখন তাদের মাঝে এ ধারণা জন্মেছিল যে, নিজেদের দেশে ব্রিটিশপাকিস্তানের উত্তরাধিকার ছিন্ন করে জনগণের সেবক না হলেও অন্ততঃ গণমুখী বা রেমযণমযফণ আমলাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হবে। কিন্তু, দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশ স্বাধীন হবার পর জনগণ অবাক বিস্ময়ে সেই সামন্ত মানসিকতার, ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের বাংলা সংস্করণ দেখতে পেল।

স্বাধীন বাংলাদেশে বেসামরিকসামরিক উভয় সরকারই আমলাদের উপর অত্যধিক নির্ভরতার কারণে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত আমলাতন্ত্রের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করবার চিন্তা বা সাহস কোনটাই করতে পারে নাই।

বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত নির্মম বাস্তবতা হল শুধুমাত্র অবৈধ সামরিক শাসকবৃন্দই নয়, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ব্যর্থ হবার কারণে প্রতিটি ক্ষমতাসীন দলই তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখবার জন্য জনগণের উপর নির্ভর না করে বেসামরিকসামরিক আমলাতন্ত্রের উপর অতিমাত্রায় নির্ভর করেছে। এর ধারাবাহিকতা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

এই অতিমাত্রায় নির্ভরতার ফল হল পাকিস্তানি বামপন্থী তাত্ত্বিক হামজা আলাভীর ভাষায় অতিবর্ধিত (ৃশণরঢণশণফমযণঢ) রাষ্ট্রের জন্ম নেয়া, যেখানে সরকারের চেয়ে রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়। অন্য কথায়, সরকার রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ না করে রাষ্ট্র সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। এ ধরণের ব্যবস্থায় আমলারা অতিরিক্ত প্রভাবশালী হয়ে উঠবার ফলে রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধার সিংহভাগই ব্যয় হয় বেসামরিক এবং সামরিক আমলাদের পিছনে।

বাংলাদেশের মত একটি তুলনামূলক পশ্চাতপদ দেশে যেখানে পাশ্চাত্যের জীবন মানের মাপকাঠিতে দেশের অধিকাংশ মানুষই অতি দরিদ্র, সেখানে আমলাদের পিছনে রাষ্ট্রীয় ব্যয় চোখে পড়ার মত। যেকোন জেলা শহরে উচ্চ পদস্থ আমলাদের গাড়ি, বাংলো এবং তাদের সেবা কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের সংখ্যা দেখলে সেই পুরানো আমলের জমিদারী ব্যবস্থার কথাই মনে পড়ে।

এছাড়া রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে বিদেশ ভ্রমণসহ নানাবিধ সুযোগ সুবিধার পাশাপাশি পদের অপব্যবহার করে অনেক আমলার বিরুদ্ধে বেআইনি আর্থিক এবং অন্যান্য সুবিধা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উচ্চপদস্থ আমলাই বৈধ আয়ের সাথে ব্যয়ের সঙ্গতিপূর্ণ জীবন যাপন করেন না।

বস্তুত, বাংলাদেশে আমলাদের পিছনে যে পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করা হয় এবং যে পরিমাণ সুযোগ সুবিধা তারা পেয়ে থাকেনুসে পরিমাণ ব্যয় এবং সুবিধা তারা পাশ্চাত্যের তুলনামূলকভাবে গণতান্ত্রিক যে সমস্ত দেশে প্রায়ই ঘুরতে যানু সে সমস্ত দেশের আমলারা ভোগ করতে পারেন না। পাশাপাশি, আইনকে পাশ কাটিয়ে টাকা উপার্জনের সুযোগও সে সমস্ত দেশের আমলাদের বাংলাদেশের তুলনায় অনেক সীমিত।

লেখক : শিক্ষক, স্কুল অব সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্লোবাল স্টাডিস, আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেম

পশ্চিম ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র।

সৌজন্যে : বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম।

(বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়)

x