সুরসাধক মিহির নন্দী

সুভাষ দে

বৃহস্পতিবার , ১৭ মে, ২০১৮ at ৫:২৪ পূর্বাহ্ণ
57

প্রয়াত সংগীত সাধক ও সংস্কৃতি সংগঠক ওয়াহিদুল হক এর ঘনিষ্টজন ছিলেন মিহির নন্দী। ওয়াহিদ ভাই বিগত শতকের ষাটের দশকে ‘ছায়ানট’ এর মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন পূর্ববাংলার শিক্ষিত মহলে। পূর্ববাংলার লোকজীবনে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে গভীর অনুরণন তুলেছিলেন তিনি। আবার ১৯৭৫ সালে জাতীয় মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির পর আমাদের যে পশ্চাদ যাত্রা শুরু হয়েছিলো জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে, ওয়াহিদ ভাই সে সময় সারাদেশে গড়ে তুলেছেন রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদ, চট্টগ্রামে তার অন্যতম সংগঠক ও প্রাণ ছিলেন মিহির নন্দী। এই সম্মেলন পরিষদ রবীন্দ্রনাথকে আবার গভীরভাবে প্রোথিত করে দিয়েছিল বাংলাদেশের জনমানসে।

শিল্পের শুদ্ধতাই তাঁর আরাধ্য ছিলো। একেবারে নিভৃতচারী, প্রচারাবিমুখ, কেবলিই শিল্প ও সংগীতের প্রতি সমর্পিত জীবন তাঁর। আমাদের মধ্যে ছিলেন সুহৃদের মতো, কিন্তু মিতভাষী, কিন্তু যখন কোন সাংগঠনিক দায়িত্বের কথা তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছি তিনি তা করেছেন। বলা যেতে পারে, শিল্পের কাছে, সংগীতের কাছে, জীবনের যে দায় তা মেটাতে তিনি কুণ্ঠিত ছিলেন না। একমাত্র পুত্রের করুণও মর্মান্তিক মৃত্যু তার জীবনকে যে বিষাদময়তায় আবৃত করে রেখেছিল, সে গভীর শোক ও মর্মবেদনা তাকে রবীন্দ্রনাথের জীবন ও সুরের মধ্যে নিবিষ্ট করে রেখেছিলো আজীবন। সেই শোক তিনি সংগীতের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন, রবীন্দ্র সাহিত্য, সংগীত ছাড়াও বাংলার অপরূপ সংগীত খনি থেকে তিনি মুক্তো আহরণ করেছেন। আর তাই তার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সঞ্চারিত করেছেন।

একজন শিল্পী এভাবেই মহৎ মানবিক হয়ে ওঠেন। তাঁর নিষ্ঠ ভূমিকা আমরা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। চট্টগ্রামে উদীচী প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই মিহির যুক্ত ছিলেন, বলতে গেলে আমাদের প্রতিষ্ঠানটিকে প্রাণময় করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অবিস্মরণীয়। সুকান্ত ভট্টাচার্যের গীতি আলেখ্য ‘অভিযান’ তাঁরই সুরারোপ করা। এটি ঢাকায় আমাদের প্রথম জাতীয় সম্মেলনে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সুকান্তের বেশ কিছু কবিতা অনুসরণে আমরা নৃত্যনাট্য করেছি। ‘প্রিয়তমাসু’ ‘চট্টগ্রাম বীর চট্টগ্রাম’, ‘রানার’ এবং আরো কিছু কবিতায় তিনি সুর করেছিলেন। সুচরিত চৌধুরীর পরিচালনায় লোকগাঁথা ‘আমিনা সোন্দরী’র সংগীত পরিচালক ছিলেন তিনি।

রবীন্দ্র সংগীত, লোকগীতি, গণসংগীত, নজরুল গীতি এবং ধ্রুপদী সংগীত, বাংলার সংগীতের সকল ভুবন থেকে তিনি রস আস্বাদন করেছেন। আমাদের এই বন্ধুটি সংগীতের মাঝে, জীবনের রঙআনন্দণ্ডবিষাদ উপলব্ধি করেছেন গভীরভাবে। সেই সাথে তাকে আলোড়িত করেছে মার্কসবাদের বিশ্ববীক্ষা। এটি তাঁকে সমাজের প্রতি দেশের প্রতি দায়বদ্ধ করেছে।

প্রয়াত সংগীত সাধক ও সংস্কৃতি সংগঠক ওয়াহিদুল হক এর তিনি ঘনিষ্টজন ছিলেন। ওয়াহিদ ভাই বিগত শতকের ষাটের দশকে ‘ছায়ানট’ এর মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন পূর্ববাংলার শিক্ষিত মহলে। পূর্ববাংলার লোকজীবনে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে গভীর অনুরণন তুলেছিলেন তিনি। আবার ১৯৭৫ সালে জাতীয় মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির পর আমাদের যে পশ্চাদ যাত্রা শুরু হয়েছিলো জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে, ওয়াহিদ ভাই সে সময় সারাদেশে গড়ে তুলেছেন রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদ, চট্টগ্রামে তার অন্যতম সংগঠক ও প্রাণ ছিলেন মিহির নন্দী। এই সম্মেলন পরিষদ রবীন্দ্রনাথকে আবার গভীরভাবে প্রোথিত করে দিয়েছিল বাংলাদেশের জনমানসে।

অনেকে তাঁকে নির্জনতার পূজারী বলে থাকেন, সমাজের যে কোলাহল তাতে তিনি অনেকটা নির্লিপ্তণ্ডএ রকম একটি কথা আছে তার সম্পর্কে কিন্তু এটি ভুল ধারণা। আমাদের বর্তমান সময়ে শিল্পেসংগীতে যে ডামাডোল, বিশৃঙ্খলা, বিকৃতি, রুচিহীনতা কিংবা কর্পোরেট পুঁজির যে অনুদানণ্ডআগ্রাসন তা থেকে গুটিয়ে মিহির শিল্পের শুদ্ধতার সাথে নিবিড় সখ্য গড়ে তুলেছেন। তাঁর শিল্প সৃজনের এই ধারাটি আমাদের প্রচলিত সংগীত চিন্তার বিরুদ্ধে প্রবল অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছে।

তাঁর জীবনব্যাপী কাজের স্বীকৃতি ও সম্মান আমরা দিতে পারিনি। এটি আমাদের বন্ধুবান্ধব ও সমাজের ব্যর্থতা। আমাদের অনেকেই সমাজজীবনে বেশ প্রতিষ্ঠিত, আর্থিক স্বাচ্ছন্দ কিংবা যশখ্যাতির পেছনে ছোটারও তাদের বিরাম নেই, অনেকে নানা সম্মানও বাগিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু মিহির সে সবের পেছনে ছোটেনি, কিংবা সে সবের প্রতি তাঁর তেমন আগ্রহও ছিল না। মিহির তৃপ্তি খুঁজেছেন সংগীতের গভীর বিস্তৃত প্রদেশে। এটি সবাই পারে না।

লেখক : সাংবাদিক, প্রয়াতের সুহৃদ

x