স্বপ্নজাল: পরিচ্ছন্ন ও সাহসী প্রয়াস

শৈবাল চৌধূরী

মঙ্গলবার , ১৫ মে, ২০১৮ at ৫:৪৭ পূর্বাহ্ণ
7

আরো একটি ক্ষেত্রে সংযমের পরিচয় রেখেছেন পরিচালক যা ছবিকে

সুন্দর করেছে। সেটি হলো চাঁদপুর শহর ও কলকাতা শহরের পুরানো এলাকাগুলোই কেবল ছবিতে দেখানো হয়েছে। যা ছবিকে যেমন ডিটেলস বহুল করে তুলেছে তেমনি করেছে দৃষ্টিনন্দন।

মনপুরা দেখে বোঝা গিয়েছিল চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রধান দুটি দিক, চিত্রনাট্যের গতিশীলতা ও ভিশুয়াল ইমেজারিসেন্স গিয়াসউদ্দিন সেলিমের আয়ত্বে। তিনি দীর্ঘদিন বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র আন্দোলন ও চর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এটাও তার ফিল্ম সেন্স উন্নত করার নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছে। মনপুরার পর দীর্ঘ বিরতির শেষে তিনি নির্মাণ করেছেনস্বপ্নজাল। দ্বিতীয় চলচ্চিত্রেও তিনি পরিপক্কতার পরিচয় দিয়েছেন।

স্বপ্নজাল ছবিটি আন্তধর্মীয় দুই তরুণ তরুণীর প্রেমের কাহিনীতে নির্মিত। বাংলাদেশের প্রধান দুটি সম্প্রদায় মুসলমান ও হিন্দু’র মধ্যেকার এ ধরনের সম্পর্ককে আবর্ত করে বেশ কিছু ছবি এ পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে। কাকতালীয়ভাবে সবক’টি ছবিই ব্যবসা সফল। এবং প্রতিটি ছবি বিয়োগান্তক পরিণতিতে সমাপ্ত। এর কোনো বিকল্পও বোধ করি নেই। বিকল্পতে মহাবিপদ। কলকাতা কিংবা মুম্বাইতে নির্মিত এ ধরনের ছবিরও সেই একই পরিসমাপ্তি। সাম্প্রতিক উদাহরণ অপর্ণা সেনের আরশিনগর। এ ছবিটি রোমিও জুলিয়েট অবলম্বনে নির্মিত হলেও নাটকে বর্ণিত দুই পরিবারের অন্তর্দ্বন্দ্বকে পরিচালক তাঁর ছবিতে দুই সম্প্রদায়ের অন্তর্দ্বন্দ্বে প্রতিস্থাপন করেছেন।

তবে স্বপ্নজালের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এ ছবিতে দুই পরিবারের মধ্যেকার সম্পর্ক অত্যন্ত সৌহার্দ্যময় ও সদপ্রতিবেশীসুলভ। তৃতীয় একটি পরিবারের মধ্যে দিয়ে এখানে বাংলাদেশের এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যেকার টানাপোড়েনের চিত্র অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে চিত্রায়িত করা হয়েছে। বস্তুত এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যেকার দ্বন্দ্বটি যে ধর্মীয় কারণ সঞ্জাত নয়, এটি যে অর্থনৈতিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অর্থাৎ সহজভাবে সম্পদ আত্মসাতের উদ্দেশ্য সঞ্জাত যা প্রায়শই ঘটে তা পরিচালক দুর্দান্ত সাহসিকতা ও আন্তরিক সততার মধ্যে দিয়ে তার ছবিতে দেখাতে সমর্থ হয়েছেন। এ ছবিতে আমরা দেখি হিন্দু মুসলমান দুই সম্প্রদায় সাধারণভাবে সদপ্রতিবেশীসুলভ মনোভাবে পাশাপাশি বসবাস করেন। মাঝে মধ্যে মন্দ লোকের আবির্ভাব ও উৎপীড়নে সাধারণ জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে এবং দেশান্তরীও হতে হয়। তবে সাহস নিয়ে রুখে দাঁড়ালে তা প্রতিহত করা যায়। ক্ষেত্র বিশেষে এই অন্তর্দ্বন্দ্বে রাজনৈতিক কৌশল ও কলুষতা যুক্ত হয় উদ্দেশ্য হাসিল করার মানসে যা আমরা মনি রত্নমের ‘বম্বে’ কিংবা অপর্ণা সেনের ‘আরশি নগরে’ দেখি।

তবে স্বপ্নজালে কিছু বিষয় একটু অবিশ্বস্ত মনে হয়েছে। যেমন কথায় কথায় হুটহাট করে কলকাতা কিংবা আগরতলা চলে যাওয়া। আগরতলা না হয় তরুণটি দালালের মাধ্যমে চোরাপথে গেছে। কিন্তু ফিরলো কিভাবে সেটা স্পষ্ট নয়। আর তরুণের কাছে কলকাতা আর আগরতলা দুটোই ‘ইন্ডিয়া’। পূর্ব পশ্চিমের ফারাক যে সে বোঝে না এই টুইস্টটা চমৎকারভাবে দেখাতে পারতেন পরিচালক।

তেমনি শেষ দৃশ্যে শুভ্রার কল্পনায় মৃত অপুকে না আনলে মন্দ কিছু হতো না।

তবে কলকাতার ডিটেলস চমৎকার। তেমনি চমৎকার বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের হিন্দু সমাজ ব্যবস্থার পুঙ্কানুপুঙ্খ ডিটেলস। আরো একটি ক্ষেত্রে সংযমের পরিচয় রেখেছেন পরিচালক যা ছবিকে সুন্দর করেছে। সেটি হলো চাঁদপুর শহর ও কলকাতা শহরের পুরানো এলাকাগুলোই কেবল ছবিতে দেখানো হয়েছে। যা ছবিকে যেমন ডিটেলস বহুল করে তুলেছে তেমনি করেছে দৃষ্টিনন্দন।

বহির্দৃশ্য চিত্রায়নের মুন্সিয়ানা আমরা গিয়াসউদ্দিন সেলিমের মনপুরাতে দেখেছি। ল্যান্ডস্কেপ ফটোগ্রাফির চমৎকার দৃশ্যায়ন পরিচালক ও চিত্রগ্রাহকের কষ্টসাধ্য চলচ্চিত্রায়নের পরিচয় বহন করে। স্বপ্নজালেও তাই দেখা গেল। এক্ষেত্রে প্রশংসার দাবিদার চিত্রগ্রাহক কামরুল হাসান খসরু। দেবজ্যোতি মিশ্রের সংগীতও সুপ্রযুক্ত। ইকবাল কবির জুয়েলের দ্রুতিময় সম্পাদনা ও সুস্পষ্ট সাউন্ড ডিজাইনিং ছবির মেধা বাড়িয়েছে। সামগ্রিক নির্মাণ সংহতির জন্যে পরিচালক গিয়াসউদ্দিন সেলিমকে ধন্যবাদ।

ছবির অভিনয়াংশ স্বতঃস্ফূর্ত। ফজলুর রহমান বাবু, শহীদুল আলম সাচ্চু, মিশা সওদাগর, শিল্পী সরকার অপু, ফারহানা মিঠু প্রত্যেকেই সাবলীল অভিনয় করেছেন। তবে প্রাণবন্ত অভিনয় করেছেন অপু চরিত্রে ইয়াশ রোহান ও শুভ্রা চরিত্রে পরীমণি।

তবে ছবির দর্শক সমাগম তুলনামূলকভাবে কম। প্রথম কয়েকদিন ভালো চললেও পরের দিকে দর্শকের অভাবে অনেক প্রদর্শনী বাতিল করতে হয়েছে। অর্থাৎ কেবল ভালো ছবি নির্মাণ করলেই হবে না, প্রদর্শনের সুস্থ পরিবেশও দরকার। টিকে থাকা প্রেক্ষাগৃহগুলোর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সত্যিই অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

x