স্যালুট হাইকোর্ট, এবার প্রচারের পালা…!

নিপা দেব

শনিবার , ২১ এপ্রিল, ২০১৮ at ৮:১২ পূর্বাহ্ণ
101

গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর এই পাতায় ‘ভিকটিম নারীকে বিব্রতকর প্রশ্ন আর নয়’ শিরোনামে একটি লেখা লিখেছিলাম। আজ ২০১৮ এর ১২ এপ্রিল। ধর্ষণের শিকার নারীর ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ পদ্ধতি নিষিদ্ধ করেছেন আজ হাইকোর্ট। তবে, ধর্ষণের শিকার নারীর পরীক্ষার ক্ষেত্রে সরকার ঘোষিত হেলথ কেয়ার প্রটোকলে উল্লেখিত পদ্ধতি অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এ সংক্রান্ত রুল নিষ্পত্তি করে বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর ও বিচারপতি একেএম সাহিদুল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন ও শারমিন আক্তার। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এএসএম নাজমুল হক।

খবরটি বেশ আশা জাগানিয়া। তুমুল প্রত্যাশিতও। অনলাইন নিউজপোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের খবরে প্রকাশণ্ড রায়ে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়ে আদালত বলেছেন, ‘ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর পরীক্ষা একজন নারী চিকিৎসক বা ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ দিয়ে করাতে হবে। এ সময় একজন নারী গাইনোকোলজিস্ট, একজন নারী ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, ভিকটিমের একজন নারী আত্মীয়, একজন নারী পুলিশ সদস্য ও নারী সেবিকা রাখতে হবে।’

ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ যে সনদ দেবেন তাতে অভ্যাসগত যৌনতা বলে কোনও মন্তব্য করা যাবে না। পরীক্ষার পর ধর্ষিতার যাবতীয় গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। এছাড়া, বিচারাধীন মামলায় নিম্ন আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণকালে নারীকে অমর্যাদাকর কোনও প্রশ্ন করা যাবে না।’

রায়ে আরও বলা হয়, ‘যদি ধর্ষিতার আঘাত বা ক্ষত গভীর থাকে, সেক্ষেত্রে একজন গাইনোকোলজিস্টের কাছে তাকে পাঠাতে হবে। এক্ষেত্রে ঠিক কোন কারণে ধর্ষিতার এই গভীর ক্ষতের পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে, তা লিখতে হবে। কোনও আঘাত বা ক্ষত না থাকলে ধর্ষিতা, শিশু ও তরুণীর ক্ষেত্রে স্পার্স স্পেক্যুলাম (এক ধরনের যন্ত্র, যা দিয়ে যৌনাঙ্গ এলাকায় পরীক্ষা করা হয়) পরীক্ষা করা যাবে না।’

রায়ে হেলথ কেয়ার প্রটোকল ব্যাপকভাবে প্রচার এবং সংশ্লিষ্টদের কাছে বিশেষ করে চিকিৎসক, আদালত, পাবলিক প্রসিকিউটর (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল), ধর্ষণ মামলায় পুলিশের সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা, উৎসাহী আইনজীবীর কাছে সরবরাহ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে হেলথ কেয়ার প্রটোকল বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সেমিনার করতে বলা হয়েছে।

আমরা যদি একটু পেছনে যাই তবে দেখবোণ্ড এর আগে ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ব্রাক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, নারীপক্ষ নামে ছয়টি পৃথক সংগঠন ও দু’জন ব্যক্তি ধর্ষণের শিকার নারীর ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’এর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কিনা, এই বিষয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করেন।

পরে ওই রিটের শুনানি নিয়ে বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্র সচিব বরাবর রুল জারি করেন। সেখানে ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ কেন আইনানুগ কর্তৃত্ব বহির্ভূত এবং অবৈধ হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। পাশাপাশি স্বাস্থ্য সচিবকে কন্যাশিশু ও নারীদের ধর্ষণের পরীক্ষার বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন আদালত। তখন তিন মাসের মধ্যে এই কমিটিকে একটি খসড়া নীতিমালা করে আদালতে দাখিল করতে বলা হয়। এ নির্দেশের পর সরকার হেলথ কেয়ার প্রটোকল নামে একটি গাইডলাইন তৈরি করে।

এরপর হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে মামলাটি রুল শুনানির জন্য আসে। সেই শুনানি শেষে আদালত ধর্ষণের শিকার নারীর ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ পদ্ধতি নিষিদ্ধ করে রায় ঘোষণা করলেন। পাশাপাশি এখন থেকে ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশু ভিকটিমের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে ২০১৭ সালে সরকার ঘোষিত গাইডলাইন (প্রটোকল ফর হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার) কঠোরভাবে অনুসরণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আমি মনেকরি, এ রায় ঐতিহাসিক। দ্রুত এই রায়ের প্রয়োগ দরকার। যে দেশে ‘ভিকটিম’ নারী মামলা করতে গিয়ে পদেপদে হয়রানির শিকার হন, যেখানে তাকে (ভিকটিম) নিয়ে খোদ থানার পুলিশ সদস্যরা হাসাহাসি করেন, সেখানে এই রায় কতোটা জরুরি তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

অভিজ্ঞতা থেকে বলছিণ্ড আমার পরিচিত মফস্বল এলাকার একটি মেয়ে উপযুক্ত ডকুমেন্টসহ একটি ছেলের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করতে গেলে ওই থানা সেই মামলা নেয়নি। পরে মেয়েটি একটি মানবাধিকার সংস্থার সহায়তায় আদালতে মামলা করেন। এক পর্যায়ে আদালত মামলার বিবাদীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলো। কিন্তু তারপরও ছেলেটি ধরা পড়লো না। উল্টো, সেই মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে জানাল, পুলিশ মেয়েটিকে সহায়তা না করে নাকি বলে বেড়াচ্ছেণ্ড ছেলেটি ‘ভালো’ বরং মেয়েটিরই ‘সমস্যা’ ছিলো। এই যখন অবস্থা তখন কতোজন মেয়ে চাইবে মামলা চালানোর শর্ত হিসেবে আদালতে গিয়ে পুরনো আইনে নানা ধরনের বিব্রতকর প্রশ্নের ফণার মুখোমুখি হতে? বিষয়টি নিয়ে এদেশের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ কম লেখালেখি করেননি! প্রতিবাদ জারি ছিলো নাটকসিনেমার বিভিন্ন সংলাপের মধ্য দিয়েও।

পত্রিকায় প্রকাশ, গত বছরের মে মাসে বনানী থানায় ধর্ষণের মামলা করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীকে টানা ৪৮ ঘণ্টা যুদ্ধ করতে হয়েছে। কতো কথা যে শুনতে হয়েছে সংশ্লিষ্ট লোকজনদের মুখেণ্ড তার ইয়ত্তা নেই। শুধু কি তাই? ওই ধরনের ঘটনায় বছরের পর বছর ধরে থানায়, ডাক্তারি পরীক্ষায় এমনকি আদালতেও ভুক্তভোগীকে নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে নানাভাবে প্রমাণ করতে হত তিনি ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এবং এসব প্রক্রিয়ার প্রায় প্রতিটি ধাপেই নারীকে শুনতে হত নানাধরনের বাজে মন্তব্য।

সুতরাং, হাইকোর্টের ঐতিহাসিক এই রায় যে বহুল কাঙিক্ষত ও প্রত্যাশিত এবং ভিকটিমবান্ধব তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন কাজ, এই রায়ের প্রচার বাড়ানো। মানুষকে সচেতন করতে হবে ব্যাপকভাবে।

স্যালুট হাইকোর্ট। এবং হাইকোর্টের এই রায় বাস্তবায়িত হলে ‘ভিকটিম’ নারী মামলা করতে যুগপৎ কতোটা উৎসাহিত ও উপকৃত হবেন তা কি লিখে আজ শেষ করা যাবে?

x