হল্যান্ড থেকে

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া

শনিবার , ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ at ৬:১৬ পূর্বাহ্ণ
28

মরক্কোর চিঠি : মাতৃভাষা এবং আন্তর্জাতিক বিচারালয়ের শহর দি হেগে শহীদ মিনার

অতলান্তিক সাগর পাড়ে মরক্কোর রাজধানী রাবাত থেকে লিখছি। এয়ার ফ্রান্সের উড়োজাহাজে আমস্টারডাম থেকে উড়াল দিয়ে ফ্রান্সের দ্য গল এয়ারপোর্ট হয়ে আজই এই নগরীতে পৌঁছেছি। তবে আজকের কলম ধরা রাবাত সম্পর্কে লেখা না। যে বিষয়টা নিয়ে লিখবো বলে গতকাল ঠিক করেছিলাম, সেই বিষয়ে। ভাষার মাস। অবহেলা আর অযত্নে বেড়ে উঠা বাংলা এই প্রবাসে কেমন আছে, কেমন চলছে তার চর্চা, দিবসটি উদযাপন ইত্যাদি। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না মাতৃভাষার সাথে আমাদের একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। মাকে ‘মা’ ডাকার মাঝে যে ভালোবাসা, আবেগ, অনুভূতি, ভালোলাগা, তা ‘মামি’, মম, বা ‘মাম’ ডাকার মাঝে নেই। মাতৃভাষা বা মায়ের ভাষা যা আমরা ইংরেজিতে ‘মাদারটং’ বা ‘মাদার ল্যাংগুয়েজ’ বলি, তাকে নিয়ে একটি মজার প্রবাদ আছে, যদিও বা সেটি নেহায়েৎ ‘ফান’ বা মজা করে বলা। সেটি হলো, ‘ৃলর ফটভথলটথণ ধ্র ডটফফণঢর্ দণ ুর্মদণরকমভথলণ, ঠণডটল্রণর্ দণ এর্টদণর ভণশণর থর্ণ্র ট ডদটভডণর্ ম ওযণটপ’ অর্থাৎ ‘আমাদের ভাষাকে বলা হয় মাতৃভাষা, কারণ বাবা কখনোই কথা বলার সুযোগ পান না।’ এ ছিল নেহায়েৎ কৌতুক। মাতৃভাষা নিয়ে নেলসন ম্যান্ডেলার একটি সুন্দর উক্তি আছে। তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি যদি একটি লোকের সাথে সে যে ভাষা বুঝে সে ভাষায় কথা বলো, তাহলে তা তার মাথায় ঢুকবে, কিন্তু তুমি যদি তার নিজের ভাষায় কথা বলো, তাহলে তা তার অন্তরে পৌঁছুবে।’ ম্যান্ডেলার এই কথাটা আজ ভাষা দিবসের মাসে নতুন করে মনে পড়লো। কেননা প্রবাসে পথ চলতে গিয়ে কখনো কানে বাংলা শব্দ ভেসে এলে চমকে উঠি, এগিয়ে গিয়ে কথা বলতে চাই। মায়ের ভাষার ব্যাপারটাই আলাদা। তারপরও দুঃখের বিষয়, পৃথিবীর অনেক ভাষাই আজ বিলুপ্তির পথে। যদ্দুর জানি পৃথিবীতে প্রায় সাত হাজার ভাষা রয়েছে। এই সাত হাজার ভাষার প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ ৫০% ভাগ ভাষা কয়েক জেনারেশন পরেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। অবাক হবার ব্যাপার যে এতগুলো ভাষার ৯৬% ভাষায় কথা বলে বিশ্বের মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র ৪% ভাগ। অন্যদিকে এই ৭০০০ ভাষার মাঝে কেবল ১০০টির ভাষা শিক্ষা ক্ষেত্রে বা দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত হয়। আজ যে ডিজিটাল জগৎ তাতে মাত্র ১০০ টিরও কম ভাষা চালু রয়েছে। আমাদের সৌভাগ্য ডিজিটাল জগতে বাংলা তার আসন করে নিয়েছে। বাংলা কেবল বাংলাদেশেই নয়, বাংলা বিশ্বের অন্য ভাষাভাষীদের মাতৃভাষাকেও মর্যাদা দিয়েছে আজকের বিশ্বে। আজ বিশ্বে ঘটা করে ফিবছর পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাংলা, বাংলাদেশ বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে মায়ের ভাষা রক্ষা করতে গিয়ে বাঙালিরা অকাতরে প্রাণ দিতে কুণ্ঠা বোধ করেনি, তারা হাসিমুখে মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছে। কেবল বাঙালি নয়, গোটা বিশ্ব কৃতজ্ঞ সালাম, জব্বার, রফিক এবং আরো নাম জানাঅজানা ভাষা সৈনিকদের কাছে। বায়ান্নে তাদের এই আত্মত্যাগ কিংবা তারও আগে আটচল্লিশে জিন্নাহর বিরোধিতা না করলে, জানিনে আমরা আজ মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারতাম কিনা, মাকে ‘মা’ বলে ডাকতে পারতাম কিনা।

বায়ান্ন থেকে আঠার মাঝে ৬৬ টি বছর। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৭ বছর। এতগুলি বছর পেরিয়ে আজও শুনি ’বাংলার মর্যাদার জন্য কাজ করতে হবে’ ধরনের বক্তব্য। জ্ঞান অর্জনে ভিন দেশি ভাষা জানা অপরিহার্য। কিন্তু সে মায়ের ভাষাকে বলি দিয়ে, ভুলে গিয়ে কিংবা বিকৃত করে নয়। আজ আমাদের ড্রয়িং রুমে হিন্দি ভাষার আগ্রাসন, পাশাপাশি এক শ্রেণির নাগরিক, বিশেষ করে তরুণ শ্রেণির মাঝে বাংলাইংরেজী মিশিয়ে উদ্ভট উচ্চারণে নিজেকে অতি আধুনিক হিসাবে অন্যের কাছে তুলে ধরতে বিশ্রী ধরনের ’বেংলিশ’ বলার প্রবণতা লক্ষ্যণীয়। সে না হয়, ইংরেজি না বাংলা। কানে বিশ্রী ঠেকে, টেলিভিশনের পর্দায় কোনো উপস্থাপক কিংবা উপস্থাপিকাকে যখন ‘দর্শকের’ পরিবর্তে বলতে শুনি ‘ভিউয়ার্স’ তখন ইচ্ছে করে জোরসে কষে মেকাপ দেয়া তাদের দুগালে দুচড় মারি। প্রবাসেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়। এখানে অনেক সময় অনেককে আক্ষেপ করতে দেখা যায় এই বলে ‘আমাদের ছেলে মেয়েরা ভাল করে বাংলা বলতে পারেনা’। প্রবাসে জন্ম ও বেড়ে উঠা সন্তানেরা মায়ের ভাষা, বাংলা বলতে না পারার পেছনে যদি কারো দোষ থেকে থাকে সে তাদের মাবাবার। কেননা ঘরে বাংলার চর্চা নেই, হলেও অপ্রতুল। আর তাতে যে তাদের কোন আফসোস আছে তা তাদের আচরণে, কথা বার্তায় ঠাহর হয় না। প্রবাসে একুশ উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠানাদি হয় বটে, তবে তাতে আগামী প্রজন্মের সংশ্লিষ্টতা কম। হল্যান্ডের বাংলাদেশ দূতাবাস এই ব্যাপারটি লক্ষ্য রেখে প্রবাসীদের উৎসাহিত করতে চায়, যাতে তাদের সন্তানেরা ভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকে, সক্রিয় অংশ নেয়। তারপরও মাবাবাদের কাছ থেকে আশাব্যঞ্জক উৎসাহ খুব একটা চোখে পড়ে না।

হল্যান্ডের জন্যে ২০১৮ সালের একুশে ফেব্রুয়ারী বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তাৎপর্যপূর্ণ এই কারণে এই বছর হল্যান্ডে ঘটা করে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একুশের অনুষ্ঠান, স্থানীয় মিউনিসিপাল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক শহীদ মিনারের জন্যে বরাদ্দকৃত বিশেষ স্থানে। হেগ শহরের মনোরম প্রাকৃতিক পার্কে (সাউদার পার্ক) নির্মিত হবে এই মিনার। ইংল্যান্ড এবং ইউরোপের আরো কয়েকটি দেশের মত হল্যান্ডেও বাঙালি জাতির গর্ব, শহীদ মিনার নির্মাণ প্রবাসী বাংলাদেশীদের অনেক দিনের স্বপ্ন। অনেক লেখালেখি, দেন দরবার করার পর সম্প্রতি হেগ শহরের মিউনিসিপাল কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ দূতাবাসকে নির্দিষ্ট স্থান বরাদ্দ করে। চলতি সপ্তাহে শহীদ মিনার প্রসংগে হল্যান্ডে নিয়োজিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শেখ মোহাম্মদ বেলাল কথা বলতে গিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন হেগ শহরের ডেপুটি মেয়র, সুরিনামী বংশদ্ভুত রবিন বলদেব সিং এর প্রতি। তিনি বলেন, ‘তার সাথে কয়েক দফা আলোচনা হয় স্থান নির্বাচন নিয়ে, তারও আগে তাদের বিষয়টার গুরুত্ব বোঝাতে এবং ‘কনভিন্সড’ করতে আমরা দূতাবাসের পক্ষ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে স্থাপিত শহীদ মিনারের তথ্য সরবরাহ করি’’। রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘এক পর্যায়ে তারা সম্মত হলে আমরা আর্কিটেকচারাল ডিজাইন দেই, কিন্তু তারা তা আবার তাদের নিজস্ব ডিজাইনার দিয়ে তৈরি করেন। এর পর যে ‘বিল’ তারা পাঠায় তাতে আমাদের পিলে চমকে উঠে আটত্রিশ হাজার ইউরো যা কিনা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় চল্লিশ লক্ষ টাকা। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম নির্মাণ খরচসহ এই বিল। তাদের সাথে যোগাযোগ করলে তারা বলেন, ‘না, এটি কেবল ডিজাইন তৈরি করার বিল’। সুবিধা ছিল রাষ্ট্রদূত শেখ মোহাম্মদ বেলালের সাথে ডেপুটি মেয়র রবিন বলদেব সিংয়ের বন্ধুত্বের সম্পর্ক আছে, যাতে কাজটি কিছুটা সহজ হয়। সেটি অবশ্য রাষ্ট্রদূত এই আলোচনায় উল্লেখ করেননি, তবে জানা। যাই হোক টাকার ওই অংক দেখে তিনি মেয়রকে জানালেন, অসম্ভব, এই টাকা দিয়ে বাংলাদেশে আমরা ৫ টি স্কুল তৈরী করতে পারবো। অবশেষে মিউনিসিপাল কর্তৃপক্ষ বললো, ঠিক আছে আমরা ডিজাইন তৈরির খরচ দেব, তবে নির্মাণের খরচ তোমাদের। এই শহীদ মিনারের জন্যে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে আবেদন করা হয়েছিল ২০১৫ সালের মে মাসে, প্রায় দু’বছর পর অর্থাৎ ২০১৭ সালের এপ্রিলে অনুমোদন দেয়া হয় যদিও বা ‘আমাদের তারা জানায় ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে’, জানালেন রাষ্ট্রদূত।

রাষ্ট্রদূত শেখ মোহাম্মদ বেলাল হল্যান্ডে কেবল প্রবাসী বাঙালিদের কাছে নয়, সবার কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন এই শহীদ মিনার নির্মাণে তার ভূমিকার জন্যে। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং ব্যক্তি পর্যায়ে ডেপুটি মেয়রের সাথে বন্ধুত্ব সুলভ সম্পর্কের কারণে যে আন্তর্জাতিক শহর হিসাবে পরিচিত ’হেগ শহরে’ শহীদ মিনারের জন্যে নির্দিষ্ট স্থান পাওয়া সম্ভব হয়েছে তা বলা বাহুল্য। হল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাস হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে। রাষ্ট্রদূত কম করে হলেও পাঁচ জন ইতিমধ্যে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু বিগত দিনে দূতাবাস থেকে এই ব্যাপারে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। যদিও বা ২০১১ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে হেগ শহরের সমাজকর্মী এম এম আর মনোয়ার এই ব্যাপারে ডাচ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং হেগ মিউনিসিপাল কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন, লেখালেখিও করেছিলেন। চিঠি দিয়ে লিখেছিলেন হেগ শহরের তৎকালীন মেয়র ফান আর্টসেনের কাছে। সে আবেদন পত্রে হল্যান্ডের অনেকেই সই করেছিলেন। সে সময় হেগ কর্তৃপক্ষ আশ্বাসও দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে কাজটি এগোয়নি। গতকাল এই ব্যাপারে রাষ্ট্রদূত বলেন, বিষয়টা তার জানা ছিল না। জানা থাকলে ভালো হতো। সমাজকর্মী মনোয়ার তার আনন্দ ব্যক্ত করে বলেন, শহীদ মিনারের জন্যে স্থান পাওয়া গেছে এবং মিনার নির্মাণ হবেএটাই বড় কথা, এর চাইতে সুখকর খবর আর কী হতে পারে। তিনিও রাষ্ট্রদূত বেলালের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন এবং বলেন, এই শহীদ মিনার নির্মাণ হলে হল্যান্ডের প্রবাসী বাঙালিরা রাষ্ট্রদূত বেলালকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবেন। (১৪২০১৮)

x