হাঁচি কখনো আটকে রাখবেন না

অধ্যাপক নইম কাদের

শনিবার , ৫ মে, ২০১৮ at ৬:২৪ পূর্বাহ্ণ
11

এলার্জি কিংবা ঠান্ডাজনিত একটি উপসর্গ হাঁচি। হাঁচি যতটা না কষ্টকর, তার চেয়েও বেশি বিরক্তি ও অস্বস্তিকর। সাধারণভাবে হাঁচি কোন জটিল সমস্যা নয়, ঠাসাসর্দির সাথে হাল্কা হাঁচি হতে পারে। এটি স্বাস্থ্যের জন্য বরং ভাল। কারণ হাঁচির মাধ্যমে শরীর থেকে উত্তেজক বা উদ্দীপক বস্তু বেরিয়ে যায়। যদি বারবার এবং অনবরত হাঁচি হয়, তাহলে এটি জটিল সমস্যা।

হাঁচির কারণ : বিভিন্ন কারণে হাঁচি হতে পারে। যেমনবিভিন্ন এলার্জি, তাপমাত্রার পরিবর্তন, আবহাওয়া পরিবর্তন, অতিরিক্ত গরম, উজ্জ্বল সূর্যালোক, ঠান্ডা লাগা ও সর্দি। বিভিন্ন পোষাপ্রাণির সংস্পর্ষ, ফুলের পরাগের সংস্পর্শ। তীব্র গন্ধ, প্রসাধনসামগ্রী, বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ, রান্নাঘরের ঘ্রাণ, মরিচ গুড়ো করার ঘ্রাণ।

ধূলাবালি, ঘরের দরজাজানালা,পর্দা, মেজ ও বিছানায় জমে থাকা ধূলা। দেখা যায় ঘর ঝাড়ু দেয়ার সময় বা বিছানা পরিষ্কার করার সময় অনেকের হাঁচি হয়। কারণ যাই হোক, নাসারন্দ্রের মধ্যে সুড়সুড়ি ও সংবেদনশীলতার কারণে হাঁচি হয়।

হাঁচির প্রতিক্রিয়া : গবেষণায় দেখা গেছে, হাঁচির গতি বেগ ঘণ্টায় প্রায় ১৬০কিমি এবং কোন কোন সময় এই গতিবেগ অনেক বৃদ্ধি পায়। তীব্র বেগে বারবার হাঁচি হলে শরীর দুর্বল হয়। কারণ এখানে প্রচুর এনার্জি ক্ষয় হচ্ছে।

হাঁচির সময় চোখ দুটি বন্ধ হয়ে যায়। মানুষ ইচ্ছা করলেও তখন চোখ খোলা রাখতে পারে না। এটা ইনভলেন্টারি রিফ্লেক্স। যা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। হাঁচির আগে মানুষ দীর্ঘ শ্বাস নেয়। ফলে হৃৎযন্ত্রে তেমন অসুবিধা অনুভব করে না। হাঁচির সময় প্রচন্ড জোরে বায়ু বের হলেও এর কারণে হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয় না।

হাঁচির সাথে শরীর থেকে প্রচুর জীবাণু বের হয়। হাঁচির মাধ্যমে তীব্র বেগে বেরিয়ে আসা জীবাণু ২/৩মিনিট পর্যন্ত বায়ুমন্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। এক গবেষণায় দেখা গেছে শরীর থেকে বেরিয়ে আসা জীবাণু হাঁচির জোরে ৫ফুট থেকে ৩০ফুট পর্যন্ত বিস্তার ঘটে। তাই হাঁচির সময় মুখে রুমাল কিংবা টিসু ব্যবহার করা দরকার।

হাঁচি আটকে রাখার চেষ্টা খুবই ক্ষতিকর : পরিবেশে ও অস্বস্থিকর অবস্থার কারণে অনেকে নাক ডলাডলি করে, নাকমুখ চেপে ধরে হাঁচি বন্ধ করার চেষ্টা করেন, হাঁচি সামাল দেয়ার চেষ্টা করেন। এটা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর।

চিকিৎসা বিজ্ঞানী মাইকেল বেনিঞ্জার জানিয়েছেন হাঁচির শব্দ নাক থেকে তীব্র গতিতে বেরিয়ে এসে বাতাসে মিশে। বহির্মুখি এই চাপ জোর করে আটকে শরীরের ভেতরে নিয়ে গেলে তার প্রতিক্রিয়া হতে পারে মারাত্মক। মাইকেল বেনিঞ্জার এর মতে জোর করে হাঁচি বন্ধ করলে সংক্রমিত মিউকাস ইউস্ট্যাশিয়ান টিউবের মধ্যে দিয়ে কানের ভেতরে প্রবেশ করে। কানের পর্দা ফেটে গিয়ে বধির হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। চোখের রক্তের ধারা ফেটে যেতে পারে, মস্তিষ্কের রক্তের ধারা দুর্বল হতে পারে, মাসলে টান পড়তে পারে। মাইকেল বেনিঞ্জার বলেছেনপ্রচন্ড গতিতে বহির্মুখি এই এই হাঁচিকে স্বাভাবিক নিয়মে বাইরে বেরুতে দিতে হবে। একে জোর করে শরীরের ভেতরে ফেরত পাঠানো বা আটকে রাখা সর্বাবস্থায় শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এর প্রতিক্রিয়ায় কোমর ব্যথা, মুখের নার্ভে ক্ষত, ল্যারিংসে ফ্রাকচার, মস্তিষ্ক ও দেহের বিভিন্ন জায়গায় তরঙ্গ তৈরি হয়। এই তরঙ্গের ফলে শরীরে বিভিন্ন অর্গান ড্যামেজ হয়।সুতরাং যখনই হাঁচি আসে, হাঁচি আটকে না রেখে হতে দেয়াই উত্তম।

হাঁচি প্রতিরোধে করণীয় : লেবু, মাল্টা, কমলা, জাম্বুরা, ইত্যাদি ভিটামিনসি সমৃদ্ধ ফল হাঁচি প্রতিরোধে বেশ উপকারী। রান্নায় মসল্লা হিসেবে গোলমরিচের ব্যবহার সার্বজনীন। গোলমরিচের অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিভাইরাল উপাদান হাঁচিসহ শ্বাসযন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা প্রতিরোধে বেশ উপকারী। কুসুম গরম পানির সাথে গোলমরিচের গুড়া মিশ্রিত করে কয়েকবার পান করলে বেশ উপকার পাওয়া যাবে। আদাকুচি করে চিবানো এবং আদার রস পান করা, রসুনের তীব্র ঘ্রান দুটিই হাঁচি নিরাময়ে কার্যকর। যেহেতু হাঁচির সাথে শরীর থেকে উত্তেজক ও উদ্দীপক বস্ত বেরিয়ে যায়, তাই হাঁচি স্বাস্থ্যের জন্য ভাল। তবে হাঁচি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং বার বার হাঁচির প্রবণতা দেখা দেয়, বিষয়টি হাল্কাভাবে নেয়া যাবে না। যাদের ঘন ঘন হাঁচি হয়, তাদের কিসে, কোন পদার্থে এলার্জি হয় বের করে তা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। অন্যথায় অ্যাজমার ন্যায় ক্রনিক রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

x