হালদা পোনায় মাছ চাষ, সুখ সমৃদ্ধি বার মাস

মীর আসলাম, রাউজান

সোমবার , ৩০ এপ্রিল, ২০১৮ at ৫:৫৫ পূর্বাহ্ণ
90

প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদার পোনার আগের মত জৌলুস নেই এখন হালদা পাড়ে। আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ধীরে ধীরে কমে আসে এই জৌলুস। মাঝে একবারে হারিয়ে গেলেও, আশা কথা হচ্ছে এবার কিছুটা এই জৌলুস দেখা গেছে নদী পাড়ে। নদীর পাড়ের লোকজন বলেছেন আশি দশকের প্রথম দিকেও দেখা যেতো হালদা পাড়ের ডিম সংগ্রহ ও পোনা বিক্রির মহোৎসব। ওই সময় হালদার পোনার কদর ছিল সারা দেশে। ওই সময় হালদায় মা মাছ ডিম দিয়েছে এমন সংবাদ পেলেই দলে দলে এখানে ছুটে আসতো বিভিন্ন জেলা থেকে মৎস্যজীবীরা। বাস ট্রাক রিজার্ভ করে দলে দলে আসা মানুষ সাথে নিয়ে আসতো বড় বড় মাটির পাতিল। দুর দুরান্ত থেকে পোনা সংগ্রহ করতে আসা মৎস্যজীবীদের জামাই আদরে বাড়িতে রাখতেন হালদা পাড়ের মানুষরা। তারা এখানে রাত কাটিয়ে এপুকুর ওপুকুর ঘুরে পছন্দের পোনা কিনে নিতেন পোনা। ডিম থেকে সদ্য উৎপাদিত পোনা ওই সময় বিক্রি হতো (পানির সাথে) কেজিতে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা দরে। (যা এখন বিক্রি হয় ৭০ থেকে ৮০ হাজার পর্যন্ত)। ওই সময় হালদা পাড়ের বেশির ভাগ মৎস্যজীবী ডিম থেকে উৎপাদিত পোনা সংরক্ষণ করতেন আগে থেকে তৈরী রাখা পুকুরে। সারা বছর জুড়ে পুকুর থেকেই তারা বিক্রি করতেন ওই পোনা।

সাইজ ও ওজন হিসাবে নিতেন দাম। এই পোনায় ছিল এই এলাকার মানুষের সারা বছরের সুখ আর সমৃদ্ধি। প্রবীণদের মতে হালদার পোনার জৌলুস কমেছে আশি দশকের দিকে নদীর তীরবর্তী এলাকায় গড়ে উঠা কতিপয় সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের তৎপরতার কারণে। অভিযোগ ছিল ওই সময় বিভিন্ন জেলা থেকে পোনা সংগ্রহের জন্য আসা লোকজন চাঁদাবাজি শিকার হতো। একারণে পরবর্তী সময় থেকে আস্তে আস্তে কমে আসে দূর দূরান্তে মৎস্যজীবীদের পোনা সংগ্রহের জন্য আসা যাওয়া। এই অরাজক পরিস্থিতিতে উৎপাত বাড়ে মাছ চোরদের। তারা নদীতে জাল পেতে শুরু করে মাছ মারা। যুগের পরিবর্তনে নদী পথে চলাচলকারী নৌকা সাম্পানে সংযোজন হয় ইঞ্জিন। চলাচল শুরু হয় বড় বড় যান্ত্রিক নৌযান। নদীর অদূরে গড়ে উঠে শিল্প কারখানা। এসব শিল্প বর্জ্য এসে পড়তে থাকে এই নদীতে। নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে উৎপাত বেড়ে যায় বালু আহরণকারীদের। তারা ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উঠিয়ে ব্যবসা করতে গিয়ে নদীতে নামায় বড় বড় যান্ত্রিক নৌযান। এসব নৌযানের ডুবন্ত পাখার আঘাতে প্রতি বছর মারা যেতে থাকে মা মাছ।

নদী ধ্বংসের এসব উপদান বেড়ে যাওয়ার কারণে নদীতে মা মাছের সংখ্যা কমতে শুরু করলে আস্তে আস্তে ডিম সংগ্রহের মাত্রা কমে যায়। এসময় এই মাত্রা শূন্যের কোটায় নেমে আসে। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা বাড়ে নদী পাড়ের মানুষের। বিশেষায়িত এই নদীকে রক্ষায় আন্দোলন সংগ্রামে নামেন সচেতন মহল। বছরের পর বছর হালদা রক্ষার এই আন্দোলন এক সময় দৃষ্টি আকর্ষণ করে সরকার প্রধানের। তার সেই শুভ দৃষ্টিতে প্রশাসনের টনক নড়ে। নদীতে অবৈধ তৎপরতায় লিপ্তদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে গত এক বছর থেকে জালপাতা, বালু উঠানোর মাত্র খানিকটা বন্ধ হয়। এর মধ্যে নদীতে মাছের সংখ্যা বৃদ্ধিতে অবদান রাখেন রাউজানের সাংসদ এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী। তিনি গত কয়েক বছর থেকে বাহির থেকে মাছ সংগ্রহ করে প্রতি বছর টনে টনে মাছ ফেলছেন এই হালদায়। গত প্রায় এক বছরে নদীটির উপর নজরদারীতে এখন নদীটি আবার প্রাণ পেতে শুরু করেছে। বহু বছর পর এবার কাঙিক্ষত ডিম সংগ্রহ করতে পেরেছে এলাকার মৎস্যজীবীরা। নদী পাড়ের মানুষ জানিয়েছে গত ১৯ এপ্রিল বিকালে নদীতে জাল ফেললে সামান্য ডিম জালে ধরা পড়ে। এতে তাদের ধারণা হয় রাতে মা মাছ পর্যাপ্ত ডিম দিতে পারে। মৎস্যজীবিরা রাত জেগে নদীতে অপেক্ষা করে সেই কাঙিক্ষত ডিমের দেখা পায় রাত আড়াইটার দিকে। উরকিরচর, দক্ষিণ মাদার্শ থেকে শুরু করে একেবারে গহিরার অঙ্কুরীঘোনা, হাটহাজারীর গড়দুয়ারা পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার নদী পথের প্রায় চার শতাধিক নৌকার আটশ মানুষ জাল ফেলে কাংঙ্খিত ডিম সংগ্রহ করে। প্রতিটি নৌকা ১০ থেকে ১২ বালতি পর্যন্ত ডিম ধরে সাফল্যের হাসি নিয়ে ডাঙায় ফিরেছেন। নদীতে এই দৃশ্য হালদা পাড়ের মানুষ দেখেছিল প্রায় দুই দশক আগে। প্রায় তিন যুগ থেকে হালদার ডিম সংগ্রহ করে পোনার ব্যবসায় আছেন গড়দুয়ারার মৎস্যজীবী কামাল সওদাগর। তিনি বলেছেন এবার ডিম ও পোনা বিক্রি উৎসব দেখে তার পুরানো দিনের কথা মনে পড়েছে। প্রবীণ এই মৎস্যজীবীর মতে হালদা একটি প্রাকৃতিক সম্পদের খনি। এই খনিকে রক্ষা করতে পারলে এদেশের মানুষের শত ভাগ আমিষের ঘাটতি এই হালদা থেকে পূরণ সম্ভব হবে। হালদা পাড়ের বাসিন্দা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও হালদা নদী ও এ নদীর জলজ প্রাণি নিয়ে কাজ করে আসা এসএম মুজিব বলেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়ার নেতৃত্বে হালদা রক্ষার আন্দোলন, প্রধান মন্ত্রী দপ্তরের সাবেক মুখ্য সচিব আবদুল করিম এর সহযোগিতায় এনজিও সংস্থা আইডিএফ এর নদীর মাছ রক্ষার প্রকল্প কাজের সফলতায় প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা মুমুর্ষ অবস্থা থেকে উদ্ধার করা গেছে। এতে সুফল আসায় এবার মৎস্যজীবীরা ডিম উৎসব করা সম্ভব হয়েছে। উরকিরচর ইউনিয়নের মেম্বার কাউছার আলম বলেছেন ১৯ এপ্রিল তার এলাকায় অনেকেই ডিম সংগ্রহ করেছেন। বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মাঝে সংগ্রহ করা ডিম পোনায় রূপান্তর করেছেন। ওই এলাকার ব্যবসায়ী মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেছেন হালদাকে পূর্ণমাত্রায় আগের অবস্থানে ফিরে নিতে হলে মৎস্য বিভাগকে নদী ও মাছ রক্ষায় নৌযান ও জনবল দিতে হবে। মৎস্যজীবীদের জন্য সরকারি হ্যাচারী গুলো সংস্কার করে দিতে হবে। উল্লেখ্য যে, এবার সাড়ে চার’শ নৌকা নিয়ে ডিম সংগ্রহ করেছে সাড়ে বাইশ হাজার কেজি।

x