হিচইন এখন বিলুপ্ত প্রায়

কেশব কুমার বড়ুয়া ।। হাটহাজারী

সোমবার , ১৪ মে, ২০১৮ at ৬:০০ পূর্বাহ্ণ
28

হিচইন এখন বিলুপ্ত প্রায়। ম্যানুুয়েল ব্যবস্থায় চাষাবাদের জমিতে সেচ দিতে হিচইন এক সময় গ্রামাঞ্চলের মানুষের জন্য অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ ছিল। বিশেষ করে কৃষিজীবী ও গৃহস্থ বাড়ির প্রতি পরিবারে হিচইন সারা বছর সংরক্ষণ করা হত। শীতকালীন মৌসুমী তরিতরকারি চাষাবাদ ও ইরি বোরো ক্ষেতে প্রয়োজনের সময় সেচ দিয়ে জমিতে পানি দিতে হয়। এক সময় জমিতে সেচ দিতে এনালগ পদ্ধতির সেচ যন্ত্র হিচইন ব্যবহার করা হত। খরা ও অনাবৃষ্টির কারণে জমিতে ফসল উৎপাদন বিঘ্নিত হয়। ফসলের ভালো ফলনের জন্য জমিতে ভিজে ভাব রাখতে হয়। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে ঋতুতে বৈরীভাব দেখা দিয়েছে। তাই সময় মত বৃষ্টি হয় না। আর বৃষ্টি না হলে জমির রোপা ফসলে মড়কের লক্ষণ দেখা দেয়। এই মড়ক থেকে ফসল রক্ষার জন্য জমিতে সেচ দিতে হয়। আমন মৌসুম সাধারনত বর্ষার সময়। এ মৌসুমে অনেক সময় বীজ তলা তৈরিতেও জমিতে সেচ দিতে হয়। মাঝে মধ্যে আমন রোপা অনাবৃষ্টির কবলে পড়ে। ইরি, বোরো ও শীতকালীন শাক সবজি সম্পূর্ণ সেচ নির্ভর। তাই এই মৌসুমে চাষাবাদ সেচের সুবিধাজনক স্থানে করা হয়। বিভিন্ন নদ নদী,খাল,ছরা ,পুকুর, ডোবা ও দীঘি সংলগ্ন এলাকায় মৌসুমী তরিতরকারি ও ইরি বোরোর চাষাবাদ করা হয়। বিশেষ করে জোয়ার ভাটা হয় এমন নদী খাল ও ছরা সংলগ্ন স্থানে এই চাষাবাদ বেশী সুবিধা জনক।
জমিতে সেচ দিতে সনাতনী পদ্ধতি হচ্ছে হিচইনের সাহায্যে সেচ পদ্ধতি। আর এক সময় হিচইন কৃষক ও কৃষির একমাত্র অবলম্বন ছিল। ছিল না তেমন বিকল্প ব্যবস্থা। তবে এক স্রোতি খাল ও ছরা এলাকায় ক্রস বাঁধ বা গোদা দিয়ে জমি সেচের ব্যবস্থা ছিল। তবে দেশে এক স্রোতি খাল ও ছরার সংখ্যা খুবই কম। তাই সেচে হিচইনই একমাত্র ভরসা ছিল।
হিচইনেরও প্রকারভেদ রয়েছে। কাটা হিচইন,হাতা হিচইন,নৌকা হিচইন। হিচইন বাঁশ ও টিন দিয়ে তৈরি করা হত। আর নৌকা হিচইন গাছ দিয়ে তৈরি করা হয়। নৌকা হিচইনের ব্যবহার চট্টগ্রাম অঞ্চলে তেমন দেখা যায় না। আবার চট্টগ্রামে কোন কোন উপজেলায় থাকলেও খুব কম। কাটা হিচইনের দুই দিকে রশি বেঁধে জমিতে সেচ দিতে হয়। হাতা হিচইন দিয়ে একজনে জমিতে সেচ দিতে পারে। তবে পানি জমির খুব নিকটে থাকতে হয়। সেচের জমি থেকে পানি একটু নীচে হলে কাটা হিচইন ব্যবহার করতে হয়। অবশ্য কাটা হিচইন দিয়ে পানি বেশী সেচ দেওয়া যায়। হাতা হিচইনে পানি কম উঠে। এক সময় বড় বড় পুকুর দীঘির পানি সেচের জন্য কাটা হিচইন ব্যবহার করা হত। এখন অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। আধুনিক সেচ যন্ত্র বের হয়েছে। এ সেচ যন্ত্র বিদ্যুৎ ও তৈল দিয়ে চালানো যায়। দ্রুত পানি সেচের জন্য বৈদ্যুতিক ও জ্বালানি তেলের সেচ যন্ত্র বা পাম্প মেশিনের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে হিচইন এখন তেমন চোখে পড়ে না।
হিচইনের সাহায্যে সেচ দিতে শারীরিক শক্তি সম্পন্ন মানুষ দরকার। এখনকার মানুষ প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পুষ্টি না পেয়ে বলতে গেলে শক্তিহীন হয়ে পরেছে। অল্প পরিশ্রমে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাছাড়া ভেজাল খাদ্য খেয়ে মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে শক্তিহীন হয়ে পড়েছে। এক সময় মানুষ এক কেজি / দেড় কেজি চাউলের ভাত ও সমপরিমাণ তরকারি খেত। অধিক পরিমাণে ভাত খেতে না পারলে গৃহস্থরা তাকে কাজে নিত না। গৃহস্থদের মনোভাব ছিল খেতে না পারলে সে শক্তিমান হবে না। আর শক্তিমান না হলে সে কাজ করতে পারবে না। সে সময় শক্তিমান মানুষ তথা শ্রমিক গুলো এক/দেড় মাইল দূর থেকে ধানের বোঝার ভাড় নিয়ে আসতে পারত। একজন লোক ৮/১০ আড়ি ধানের বোঝা বহন করতে পারত। এখন ৩/৪ আড়ি ধানের ভাড় কেউ বহন করতে পারে না। কাটা ধানের বোঝার ভাড় হাজার দুই হাজার গজ কাঁদে বহন করতে লোকজন হাঁফিয়ে উঠে। আর এখন ভাত বেশী খেলে তাকে আর কেউ কাজে নিতে চায় না। আর খেতে না পারলে তার শক্তিই বা কত হবে।
শক্তিমান মানুষগুলো জমিতে হিচইনের সেচ দিতে এক নাগাড়ে ৩/৪ ঘন্টা কাজ করত । এখন শক্তিহীন মানুষ আধা ঘন্টার উপরে হিচইন দিয়ে পানি সেচ দিতে পারে না। বর্ষার শেষ হলে আশ্বিন কার্তিক মাসে বড় বড় খাল ও ছরা হিচইন দিয়ে সেচে মাছ ধরত। এ সময় গ্রামের মানুষ প্রায় কর্মহীন থাকে। তাই হিচইন দিয়ে পানি সেচে মাছ ধরে। শক্তির অভাব ও আধুনিক সেচ যন্ত্র বের হওয়ায় হিচইনের ব্যবহার তেমন দেখা যায় না। অনেকে এখন হিচইন কি জিনিস কিংবা কি কাজে লাগে তাও জানবে না। পুরাতন গৃহস্থ পরিবারের মধ্যে হিচইন থাকলেও তার তেমন ব্যবহার নেই। এক কথায় হিচইন ও তার মাধ্যমে সেচ পদ্ধতি এখন বিলুপ্তি প্রায়। হিচইন তৈরির কারিগরেরা এখন বেকার ও কর্মহীন হয়ে পড়ায় তাদের পরিবার সীমাহীন কষ্টের মধ্যে পড়েছে। ফলে অনেকে এ পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় চলে গেছে ।

x