হুন্ডি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কঠোর হতে হবে

শুক্রবার , ১১ মে, ২০১৮ at ৪:৪৪ পূর্বাহ্ণ
141

অর্থ পাচারের এখন প্রধান মাধ্যম হুন্ডি। কারা এ অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করেছে গোয়েন্দা সংস্থা। তাতে নাম এসেছে, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে রাজনীতিক ও জনপ্রতিনিধিরও। হুন্ডির মাধ্যমে তাদের এই অর্থপাচারে সহায়তা করছে কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংক, কুরিয়ার সার্ভিস, সিএন্ডএফ ও ইমিগ্রেশনের এক শ্রেণির কর্মকর্তা। হুন্ডি ব্যবসায় জড়িত ৬৩২ জনের নামের তালিকা সংবলিত বিশেষ প্রতিবেদনটি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠায় গোয়েন্দা সংস্থাটি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বিষয়টি আমলে নিয়ে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তা স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। অধিকতর তদন্তের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তালিকার অনুলিপি পাঠিয়েছে পুলিশের পৃথক তিনটি ইউনিট এবং অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে। সম্প্রতি পত্রিকান্তরে এই খবরটি প্রকাশিত হয়েছে।

খবরে আরো বলা হয়েছে, প্রতিবেদনটি হাতে পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মুখপাত্র ও অর্গানাইজড ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) মোল্যা নজরুল ইসলাম। এরই মধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে বলে পত্রিকাকে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিবেদনে সংযুক্ত থাকা তালিকাটি জেলা ইউনিটগুলোয় পাঠানো হয়েছে। তদন্ত শেষে যেসব ব্যবসায়ীর হুন্ডি সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যাবে, প্রচলিত আইনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

হুন্ডির মাধ্যমে অবৈধভাবে দেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচার নতুন কোন ব্যাপার নয়। বহু বছর ধরে এটা চলছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার জরিপে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার বেড়ে ওঠার খবর নিয়মিত মিলছে। এ অর্থের বেশিরভাগ পাচার হচ্ছে অবৈধ হিসেবে স্বীকৃত হুন্ডির মাধ্যমে। হুন্ডি চক্রের সদস্যরা এতই অপ্রতিরোধ্য যে, তাদের ঠেকানোরও যেন কেউ নেই। প্রতিদিনই গোপনে দেশের পুঁজি চলে যাচ্ছে বিদেশে। সরকার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও তদারকিতে শৈথিল্যের কারণে হুন্ডির মাত্রা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অপেক্ষাকৃত সহজ হওয়ায় হুন্ডি অর্থপাচারের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত সাপেক্ষে হুন্ডি ব্যবসায়ে জড়িত ৬৩২ জনের নামের তথ্য সংবলিত তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে সেটি আবার পাঠানো হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ে। সেখান থেকে পাঠানো হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। এভাবে এ কার্যালয় থেকে ও কার্যালয়, ও কার্যালয় থেকে সে কার্যালয়ে খালি প্রেরিতই হচ্ছে। অথচ এ ব্যাপারে আইনগত যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার তা দৃশ্যমান নয়। দেশের রাজনীতিক ও আমলাদের কেউ কেউ এ ব্যবসার মদদদাতার ভূমিকা পালন করছেন এমন অভিযোগও ‘ওপেন সিক্রেট’। এটা কাম্য নয়। বিদেশে যারা সেকেন্ড হোম প্রতিষ্ঠান করছেন, কিংবা বিলাসবহুল বাড়ি ফ্ল্যাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন তারা যে অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে হুন্ডিকে বেছে নিয়েছেন এটি একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এবং দেশের অর্থনীতির স্বার্থে হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে অর্থপাচার এবং বিদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ আনার প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়া দরকার। এ ব্যাপারে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজনও রয়েছে। হুন্ডিসহ অর্থনৈতিক অপরাধ বন্ধে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় যত্নবান হওয়া উচিত। দেশে মুদ্রা পাচারবিরোধী অনেক আইন রয়েছে, কিন্তু সেগুলোর প্রয়োগ নেই বললেই চলে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গোয়েন্দা ইউনিট, এনবিআর, দুদক, পুলিশসহ আরো কিছু সংস্থা মুদ্রা পাচাররোধে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু সাফল্য খুবই কম। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আরো সক্রিয় হওয়া জরুরি। মুদ্রা পাচারে বাংলাদেশের অবস্থান ১০০টি দেশের মধ্যে ৪০তম। দুর্নীতিতেও প্রথম ২০টি দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। এসব কমানো না গেলে আমাদের উন্নত দেশ গড়ার স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। যতদূর জানা যায়, অর্থ পাচার, চোরাচালান ও হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে অনেক ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত রয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এদের মোকাবেলা করতে ভয় পান। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারকে সদিচ্ছার পরিচয় দিতে হবে। আমরা আশা করি বর্তমান সরকার তা করতে সক্ষম হবে।

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন মোড় নিতে পারে। এতে স্বভাবত অর্থ পাচার বেড়ে যাবে। অর্থ পাচারের লাগাম টেনে ধরতে হবে এখনই। হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত যেসব ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে, অধিক তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া অর্থ পাচারের কারণগুলো খতিয়ে দেখে, সেগুলো রোধে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের নীতি নির্ধারকদের মাথায় রাখতে হবে হুন্ডি ব্যবসা ও অর্থ পাচারের আরো সব অবৈধ কাজ দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও উন্নয়নের প্রধান প্রতিবন্ধক।

x