১৩ মাসে দুই মন্ত্রীকে চসিক মেয়রের পৃথক চারটি চিঠি

মোরশেদ তালুকদার

পাঁচ হাজার ২শ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ চেয়ে পেল ৪৯ কোটি টাকা!

বৃহস্পতিবার , ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ at ৬:২২ পূর্বাহ্ণ
380

নগর উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এবং অর্থ মন্ত্রীর কাছে ‘থোক বরাদ্দ’ চেয়ে গত ১৩ মাসে পৃথক চারটি চিঠি দেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। এতে ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে অর্থ মন্ত্রীর কাছে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর সাতশ’ কোটি টাকা চাওয়া হয়। এর বিপরীতে গতকাল পর্যন্ত চসিক পেয়েছে মাত্র ৪৯ কোটি টাকা!

এমন পরিস্থিতিতে, চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ কম পাওয়ায় নগর উন্নয়নে গতি আসছে না বলে মনে করেন নগরবাসী। এর কারণ আর্থিক সীমাবদ্ধতা। নিজস্ব আয়ের বড় কোন উৎস না থাকায় মন্ত্রণালয়ই শেষ ভরসা অর্থ সংস্থানে। কিন্তু বারবার চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ না মেলায় কাঙ্খিত উন্নয়নে পিছিয়ে থাকতে হচ্ছে সংস্থাটিকে। এতে পক্ষান্তরে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন চট্টগ্রামবাসীই।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের কাছে থোক বরাদ্দ চেয়ে গত ১৩ মাসে দু’টি চিঠি দেয়া হয়। এর মধ্যে সর্বশেষ গত ২৫ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের কাছে চিঠি দেন। এতে সরকার প্রতিশ্রুত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা অব্যাহত রাখা এবং ক্ষতিগ্রস্থ রাস্তাসমূহ মেরামতের ল ্েয ২শ’ কোটি টাকা বিশেষ থোক বরাদ্দ চাওয়া হয়। এর আগে ২০১৭ সালের ৩ জুলাই একই মন্ত্রীর কাছে ৫শ’ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ চেয়ে চিঠি দিয়েছিলেন মেয়র। ওই পত্রে নগরীর ক্ষতিগ্রস্থ ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক মেরামতের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। এছাড়া অর্থ মন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে ২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর ২ হাজার কোটি টাকা এবং ২০১৭ সালের ৩ জুলাই ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ থোক বরাদ্দ চেয়ে পত্র দিয়েছিলেন মেয়র।

মিলেনি কাঙ্খিত ‘থোক বরাদ্দ’:

চসিকের হিসাব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থ বছরে (২০১৭২০১৮) এখন পর্যন্ত দুই কিস্তিতে মাত্র ১১ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ পায় চসিক। আরো দুই কিস্তিতে ১১ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ দেয়া হবে চসিককে। এর আগে ২০১৬২০১৭ অর্থ বছরে পেয়েছিল ৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩২ কোটি টাকা পূর্বের বরাদ্দ ছিল এবং ৬ কোটি টাকা বিশেষ থোক হিসেবে দেয়া হয়।

চাহিদার বিপরীতে থোক বরাদ্দ কম পাওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিটি মেয়র আ..ম নাছির উদ্দীন দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘বাংলাদেশের সবগুলো সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা তো স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন। তারাও থোক বরাদ্দ চায়। চাইতে তো আর অসুবিধা নাই। চাওয়ার বিপরীতে কিছু দেয়। থোকের জন্য বাজেটও তো কম। মন্ত্রণালয়ও দিবে কোথা থেকে। মন্ত্রণালয় তো আর টাকার গাছ না। টাকা তো জনগণের কাছে। জনগণের কাছ থেকে সরকার যে ট্যাক্স পায় সেখান থেকে বণ্টন করছে। এখন মানুষ যদি ট্যাক্স না দেয় টাকা আসবে কোথা থেকে। উন্নয়ন কিভাবে হবে?

চাহিদা অনুযায়ী থোক বরাদ্দ পেলে কর্পোরেশনের জন্য কি ধরনের সুফল হবে জানতে চাইলে মেয়র বলেন, উন্নয়ন কাজ ত্বরান্বিত হবে। তবে এটাও ঠিক, থোকের উপর এখন উন্নয়ন কাজ নির্ভর নয়। বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমেই আমরা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। অর্থাৎ প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ মিলছে। প্রাসঙ্গিক হিসেবে মেয়র বলেন, আমরা যে প্রকল্পগুলো দিই সেখানে বরাদ্দ পাওয়ার জন্য সিটি কর্পোরেশনকে ম্যাচিং ফান্ড দিতে হয়। জনগণ ট্যাক্স না দিলে এই ফান্ড আসবে কোথা থেকে।’

কেন ‘থোক বরাদ্দ’ চায় চসিক :

বিভিন্ন সময়ে দুই মন্ত্রীর কাছে চসিক মেয়রের দেয়া চিঠিগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ‘আশির দশক’ থেকে ‘অকট্রয়’ বা ‘নগর শুল্ক’ প্রথা বন্ধ থাকায় রাজস্ব আদায় কমে গেছে চসিকের। ফলে সরকার প্রতিশ্রশুত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা অব্যাহত রাখার স্বার্থেই ‘থোক বরাদ্দ’ প্রয়োজন।

চসিকের নথি থেকে জানা গেছে, ১৯৮০ সালের দিকে শহরের ভেতর কোন ট্রাক, লরি, বাস বা ভারী যনিবাহন প্রবেশ করলে সিটি কর্পোরেশন ট্যাক্স আদায় করতো। তখন এটা আইনে ছিল। এটাকে বলা হতো ‘অকট্রয়’ প্রথা। সামরিক শাসন আসার পর সেটি বন্ধ করে দেয় তৎকালীন সরকার। যদিও এই ‘অকট্রয়’ বা ‘নগর শুল্ক’ ছিল সিটি কর্পোরেশনের অন্যতম প্রধান রাজস্ব।

বর্তমানে সিটি কর্পোরেশনের আয়ের অন্যতম খাত রাজস্ব। পৌরকর ও বিভিন্ন রেট এবং ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন খাতে এই রাজস্ব আদায় হয়ে থাকে। তবে পৌরকর প্রদানে সাধারণ মানুষের অনীহার কারণে রাজস্ব আদায়ের লক্স্যমাত্রা পূরণ হয় না। এতে বাধগ্রস্থ হয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রীদের কাছে পাঠানো মেয়রের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব রাজস্ব আয় দিয়ে উন্নত নাগরিক সেবা প্রদান নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। কারণ, সড়ক, নর্দমা, রাস্তা মেরামত ও সংস্কার, পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম, মশক নিধন এবং সর্বত্র সড়কবাতি নিশ্চিত করা অত্যন্ত ব্যয় বহুল।

এ প্রসঙ্গে চসিকের দাপ্তরিক নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালিত আমদানিরপ্তানি বাণিজ্যের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আয় প্রসারের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় আমদানিরপ্তানি কাজে নিয়োজিত যানবাহন চলাচলের সুবিধার্থে সড়ক মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে চসিক।’

এছাড়া দুই মন্ত্রীর কাছে পাঠানো প্রতিটি চিঠিতেই উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন অ্যাক্ট ২০০৯ এর চতুর্থ তফসিল অনুযায়ী, ‘সিটি কর্পোরেশনকে নগরীতে ভোগ, ব্যবহার, বা বিক্রয়ের জন্য পণ্য আমদানির উপর কর, নগর হতে পণ্য রপ্তানির উপর কর, এবং সরকার কর্তৃক আরোপিত করের উপর উপকর আরোপের ক্ষমতা আছে চসিকের। অর্থাৎ এসব বিষয়ে কর আদায়ের ক্ষেত্রে আইনগতভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত চসিক। কিন্তু প্রবিধান প্রণয়ন না হওয়ায় এসব কর আদায় করতে পারছে না চসিক। তাই নগর থেকে সরকারের আদায়কৃত রাজস্ব থেকে বরাদ্দ চায় চসিক।’

এ প্রসঙ্গে চিঠিগুলোতে মেয়র লিখেন, ‘বর্ণিত করারোপের প্রবিধান প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকা থেকে সরকার কর্তৃক আদায়কৃত রাজস্ব বা কর এর একটি সন্তোষজন অংশ অথবা থোক বরাদ্দ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে প্রদান করা হলে নগরবাসীকে কাঙ্খিত সেবা প্রদান করা এবং সরকারের প্রতিশ্রুত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে।’

থোক বরাদ্দ’ কী ? :

বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট পাশ করার সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে থোক বরাদ্দ রাখা হয়। পরে তা সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ভাগ করে দেয়া হয়।

x