৮ মাসে ইয়াবা পাচার বেড়েছে কয়েকশ গুণ

গডফাদার ৬০ জন, জড়িত রোহিঙ্গারাও ।। বছরে চলে যাচ্ছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা

রফিকুল ইসলাম, উখিয়া

শনিবার , ১২ মে, ২০১৮ at ৪:৩৭ পূর্বাহ্ণ
37

২০১৭ সালের আগস্টের আগে ইয়াবা আসত অনেকটা গোপনে। আগস্টের পর ব্যাপক হারে রোহিঙ্গাদের আগমনের পর থেকে মিয়ানমার থেকে আসা শুরু করেছে বস্তায় বস্তায় ইয়াবা ট্যাবলেট। গত ৮ মাসে ইয়াবা পাচার কয়েকশ গুণ বেড়েছে। এছাড়া পাচারে রোহিঙ্গারাও ব্যাপক হারে জড়িয়ে পড়ছে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ইয়াবার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে ৬০ জন।

কিশোরযুবক থেকে শুরু করে নানা শ্রেণিপেশার মানুষণ্ডইয়াবার মরণ নেশা থেকে কেউ বাদ পড়ছে না। একটি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে মাদক সেবনকারীর সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। এর মধ্যে অতি সহজলভ্য ও সস্তায় হাতের নাগালে পাওয়ায় ইয়াবা সেবনকারীর সংখ্যা বেশি। প্রায় প্রতিটি ঘর, অফিস, কারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানণ্ডসব জায়গায় ইয়াবার হানা। ইয়াবার পেছনে প্রতি বছর দেশ থেকে পাচার হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। এদিকে ইয়াবাসহ মাদক প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতায় সাধারণ মানুষের মাঝে অসন্তোষ বাড়ছে। তারা চান, যেকোনো উপায়ে ইয়াবা নির্মূল করে আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করতে হবে। সীমান্ত এলাকা ও মাদকপ্রবণ এলাকায় প্রশাসনিক পরিবর্তন এনে সাঁড়াশি অভিযানের দাবি করেছেন তারা।

জানা যায়, ইয়াবা ট্যাবলেটের মূল উৎপাদন ও সরবরাহকারী দেশ মিয়ানমার। ইয়াবা প্রচারের প্রধান রুট টেকনাফ, উখিয়ার নাফ নদী সীমান্ত, নাইক্ষ্যংছড়ি, আলিকদম ও বঙ্গোপসাগর। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে অন্যান্য সময়ের তুলনায় গত ৮ মাসে ইয়াবা পাচার বেড়েছে কয়েকশ গুণ। এ দুই উপজেলার সীমান্তের বিপরীতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। গত বছরের আগস্টের ঘটনার পর সেখানকার প্রায় ৭ লাখ অধিবাসী সীমান্তবর্তী দুই উপজেলায় আশ্রয় নিয়েছে। রাখাইনের বেশিরভাগ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। তাহলে কীভাবে, কারা ব্যাপক হারে ইয়াবা পাচার করছে? অভিযোগ আছে, ইয়াবা পাচারে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী জড়িত। এছাড়া আশ্রিত অনেক রোহিঙ্গা যোগসাজশ করে ইয়াবা আনছে। তাদের অনেকের সাথে স্থানীয় ইয়াবা পাচারকারীরা বহাল তবিয়তে আছে। এছাড়া আশ্রয় শিবিরগুলো থেকে প্রতিদিন রাতে চুরি করে শত শত রোহিঙ্গা মিয়ানমার গিয়ে ইয়াবা এনে তা নিরাপদে আশ্রয় শিবিরে মজুদ করে। গত সোমবার ১৭ লাখ ইয়াবাসহ রাখাইনের রাচিডং এলাকায় একজন সেনা সদস্যসহ তিনজন আটক হয়েছে সেখানকার মাদক প্রতিরোধ বাহিনীর হাতে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উখিয়া ও টেকনাফের শীর্ষ গডফাদার ও পৃষ্ঠপোষকরা টেকনাফের মোছনী, নয়াপাড়া, লেদা, উনচিপ্রাং ও চাকমার কূল এবং উখিয়ার জামতলী, হাকিমপাড়া, তাজনিমারখোলা, ময়নারঘোনা, বালুখালী ও কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির গড়ে তুলেছেন। গত বছরের আগস্টের পর যখন রোহিঙ্গরা ব্যাপক হারে আগমন করে, তখন ওইসব এলাকার চিহ্নিত ইয়াবা পাচারকারীরা নিজেদের অর্থায়নে সীমান্ত এলাকা থেকে যানবাহন দিয়ে, অন্যান্য সহায়তায় রোহিঙ্গাদের এনে প্রথম এসব স্থানে আশ্রয় শিবির স্থাপন করে। অভিযোগ আছে, স্থানীয় ও রোহিঙ্গা ইয়াবা পাচারকারী গডফাদার ও তাদের লোকজন রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরগুলোতে ইয়াবা মজুদের নিরাপদ আস্তানা বানিয়েছে। সেখান থেকে অবাধে ইয়াবার বড় বড় চালান সারা দেশে পাচার করছে। টেকনাফ, উখিয়াসহ দেশের কোথাও না কোথাও প্রতিদিন ইয়াবা জব্দ হচ্ছে। ধরা পড়ে বহনকারী। কিন্তু গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে।

গত বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে পুলিশ তলহ্মাশি চালিয়ে চারটি প্রাইভেট কার থেকে এক কোটি পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ ৬ পাচারকারীকে আটক করেছে বলে থাই পুলিশের উদ্বৃতি দিয়ে এএফপি জানিয়েছে। এক্ষেত্রে রোহিঙ্গারাও জড়িয়ে পড়ছে। ইয়াবা পাচার করতে গিয়ে গত মার্চ পর্যন্ত শতাধিক রোহিঙ্গা আটক হয়েছে। এছাড়া উক্ত আশ্রয় শিবিরগুলোও ইয়াবা ক্রয়বিক্রয়, সেবনের নিরাপদ এলাকায় পরিণত হওয়া এবং ইয়াবার পাশাপাশি হাতের নাগালে রোহিঙ্গা নারীণ্ডএলাকার কিশোর, যুবক, বিবাহিত কেউ রক্ষা পাচ্ছে না। রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরভিত্তিক নিয়ন্ত্রক স্থানীয় গডফাদারদের অধিকাংশ সরকার বিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। কেউ কেউ স্থানীয়ভাবে জনপ্রতিনিধি। তারা ইয়াবা পাচার করছেন নিরাপদে। আবার ওদের মাধ্যমে বিভিন্ন উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর মাঝে গোপন অর্থায়ন ও যাতায়াত আছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি সরকারের বিভিন্ন সংস্থা একটি তালিকা করেছে। তালিকা অনুযায়ী, ইয়াবার নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছে ১১শ ৫১ জন। এর মধ্যে টেকনাফে ৯১২ জন, কক্সবাজার সদরের ৪৩ জন, রামুতে ৩৪ জন, কুতুবদিয়ায় ৪৮, মহেশখালী ৩৩ জন, পেকুয়ায় ২২ জন এবং উখিয়ায় ৭ জনের নাম রয়েছে। এসব তালিকায় থাকা লোকের মধ্য থেকে ৬০ জনকে গডফাদার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সারা দেশের ১৪১ জন মাদকের গডফাদারের তালিকা করেছে। ইয়াবা পাচারের অন্যতম স্থান মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন উখিয়া, টেকনাফ ও নাইক্ষ্যংছড়ির শত শত আলোচিত শীর্ষ ইয়াবা পাচারকারী গডফাদারের নাম ওই তালিকায় নেই। ওই তালিকা অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগের ২৯ জন, রাজশাহী বিভাগের ২১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগের ৯১ জন গডফাদার রয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে চট্টগ্রাম শহরের ৫ জন, লোহাগাড়ায় ১ জন, আনোয়ারায় ৫ জন, পটিয়ায় ২ জন, সাতকানিয়া ১ জন, চন্দনাইশ ৩ জন, রাঙ্গুনিয়ায় ৫ জন, মীরসরাইয়ে ১ জন, রাউজানে ৩ জন, ভূজপুরে ১ জন এবং ফেনী জেলায় ৫ জনের নাম রয়েছে।

এই তালিকা দেখে স্থানীয় সচেতন মহল হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তারা জানান, তালিকায় স্থান পাওয়া মাদক পাচারকারীদের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ইয়াবা পাচারকারী গডফাদার আছে। তারা প্রচুর অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছে। তবে টেকনাফের বেশ কিছু গডফাদারের নাম এলেও অনেকে রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। তেমনি উখিয়ায়ও অনেক গডফাদারের নাম বাদ পড়েছে। কয়েক বছর আগে এদের অনেকের সংসারের অবস্থা খারাপ ছিল। বর্তমানে তারা কোটিপতি। সচেতন মহলের দাবি, কঠোর গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে পাচারকারীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।

প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে অসহায় লোকজনের পক্ষ থেকে প্রশাসন ও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট অভিযোগ যাচ্ছে। তাদের আকুতি, ইয়াবার আগ্রাসন থেকে বাঁচা। অভিযোগকারীদের মধ্যে আছেন মাবাবা, ভাইবোন, স্ত্রী, পাড়া প্রতিবেশী, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার লোকজন।

উখিয়া সদর রাজাপালং ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী ও হলদিয়াপালং ইউপি চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ শাহ আলম বলেন, ইয়াবা সেবনকারী ও পাচারকারী কারা, সমাজে তাদের কী অবস্থান, বর্তমানে সকলের তা জানা। প্রতিদিন আমাদের ইয়াবা সংক্রান্ত অনেক শালিস করতে হয়। তারা ইয়াবার আগ্রাসন থেকে পরিত্রাণ চান এবং ইয়াবা নির্মূলে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ চান।

x