মোহছেনা ঝর্ণা

মেয়েগুলোকে বন্ধুরূপী জানোয়াররা ধর্ষণ করেছে, ধর্ষণের ভিডিও করেছে, শারীরিকভাবে আঘাত করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কারো কাছে মুখ খুললে ধর্ষণের ভিডিও ইউটিউবে ছেড়ে ভাইরাল করে দিবে বলে ভয় দেখিয়েছে, হুমকি দিয়েছে। মেয়েগুলোর শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি মানসিক যন্ত্রণাটা উপলদ্ধি করার চেষ্টাওতো ভয়ংকর। সেই মেয়েগুলো যে এতদিন পর হলেও এই প্রভাবশালীদের কুলাঙ্গার পুত্রদের বিরুদ্ধে মামলা করার সাহস দেখিয়েছে সেজন্য তাদের অভিবাদন।

পুত্র সন্তান জন্মের পর মানুষের চোখে মুখের আনন্দ, উচ্ছ্বাস, তৃপ্তি এমন উচ্চ পর্যায়ের থাকে যে মনে হয় পুত্র নয়, আকাশের চাঁদটা বুঝি হেঁটে হেঁটে তাদের ঘরে চলে এসেছে। ঘরে যদি দুই একটা কন্যা থাকে এবং পুত্র যদি কন্যার পরে হয় তাহলেতো আর কথাই নেই, সাত রাজার ধন মনে করে অতিমাত্রায় আদর আর প্রশ্রয় পুত্রের জন্য বরাদ্দ হয়ে যায় জন্মের পরপরই।

আর তাই ছোট থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত বাবামায়ের আহ্লাদ, ছেলেতো, ছেলেরা তো একটু বেশিই দুষ্টমি করে। ছেলে তো, ছেলেদের তো দাবি একটু বেশিই হবে। ছেলে তো, ছেলেদের একটু আধটু দোষ থাকেই।

তো আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের পুত্র সাফাত আহমেদ, তার বন্ধু সাবেক রাষ্ট্রদূত অবসরপ্রাপ্ত লেফটেনেন্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর পুত্র সাদমান সাফিক এবং পিতার নাম পরিচয়হীন নাঈম আশরাফসহ তিন ধর্ষক পুত্রের বাবামা, পরিবারপরিজনও নিশ্চয়ই পুত্র জন্মে আহ্লাদে আটখানা হয়েছিল। অতি আহ্লাদে পুত্রকে প্রাচুর্য দিয়ে বড় করলেও পুত্রের মধ্যে যে মনুষ্যবোধ জাগাতে পারেনি তাতো চোখের সামনে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে আছে।

ঘটনাটা একটু বলি। আপন জুয়েলার্সের মালিকের পুত্র সাফাত আহমেদ আরো দুই বন্ধুসহ জন্মদিনে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দুই বান্ধবীকে দাওয়াত দিয়ে বনানীতে অবস্থিত রেইনট্রি হোটেলে নিয়ে গিয়ে বান্ধবীদের ধর্ষণ করে। শুধু ধর্ষণ করেই মন ভরেনি, কিভাবে ধর্ষণ করেছে, নিজের পৌরুষ কিভাবে জাহির করেছে তা নিজের চোখে দেখার জন্য ড্রাইভারকে দিয়ে ভিডিও করে রেখেছে। ঘটনা ঘটেছে ২৮মার্চ। গতকাল ৭মে সেই মেয়ে দুজন তাদের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ দিয়ে ধর্ষকদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করে।

ঠিক এরকম একটা গল্প নিয়ে ইন্ডিয়াতে “পিংক” নামে একটি ছবি তৈরি হয়েছে কিছুদিন আগে। সেখানে মেয়ে তিনটির পাশে দাঁড়িয়েছিল এক বৃদ্ধ আইনজীবী। সেছবির কিছু ডায়ালগ ছিল এরকম, না…. মানে, না। না শুধু একটি অক্ষর বা শব্দ নয়। না, নিজেই একটি সম্পূর্ণ বাক্য। কোনো মেয়ে যদি কোনো ছেলের সাথে শারীরিক সম্পর্কে যেতে আগ্রহী না থাকে এবং তারপরও যদি ছেলেটি জোর করে শারীরিক সম্পর্ক করে তবে সেটাই ধর্ষণ।

আরেক জায়গায় ব্যাঙ্গ করে বলেছিল, কোনো তরুণী মেয়ে দিনের বেলায় তার ছেলে বন্ধুদের সাথে হেসে কথা বললেও, রাতে বলা যাবেনা, কারণ রাতের বেলায় ছেলেদের কাছে এই হাসির অন্য অর্থ দাঁড়ায়।

হায়, ওটা সিনেমা বলে হয়তো একবৃদ্ধ জাঁদরেল উকিল তাদের পক্ষে মামলা লড়ে ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত করে। কিন্তু জীবন তো সিনেমা নয়। তাই এ মেয়েগুলোর সংগে ঘটে যাওয়া অন্যায়এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য এবং প্রভাবশালীদের ধর্ষক পুত্রদের আইনের আওতায় এনে কঠিন শাস্তি প্রদান করা হবে এমন আশা করতে পারছি না বলে দুঃখিত।

শুনলাম ধর্ষক সাফাত আহমেদের গর্বিত বাবা (আপন জুয়েলার্স এর মালিক) দিলদার আহমেদ নাকি বলছে ৪০ দিন আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে ৪০দিন পরে কেন কথা বলছে ওই মেয়েরা। আর যা হয়েছে তা তাদের সম্মতিতেই হয়েছে।

দিলদার আহমেদ পিতা বটে! ধর্ষক সন্তানের পিতা! দিলদার আহমেদের কাছে জানতে ইচ্ছা করছে একই ঘটনার ভিকটিম যদি আপনার কন্যা সন্তান হতো এবং ধর্ষকসহ ধর্ষকের বাবা এমন প্রলাপ বকত, পিতা হয়ে কন্যার জন্য কেমন অনুভব হতো আপনার মনে? নাকি তখনও মনে হতো আপনার কন্যাটিই যেচে গিয়ে নিজেকে অন্যের ভোগের জন্য সমর্পণ করেছে।

দুঃখ করতেও দুঃখ হয়। কারণ পুত্রসন্তানটিকে সুসন্তান হিসেবে তৈরি করতে না পারার ব্যর্থতা বাবা হিসেবে আপনি এড়াতে পারেন না দিলদার সাহেব। কুলাঙ্গার পুত্রের কৃতকর্মের জন্য তাকে অপরাধী হিসেবে শনাক্ত না করে বরং অন্যের মেয়েদের দিকে আঙ্গুল তোলার জন্য কুলাঙ্গার পুত্রের সাথে সাথে আপনিও সমান অপরাধী।

মেয়েগুলোকে বন্ধুরূপী জানোয়াররা ধর্ষণ করেছে, ধর্ষণের ভিডিও করেছে, শারীরিকভাবে আঘাত করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কারো কাছে মুখ খুললে ধর্ষণের ভিডিও ইউটিউবে ছেড়ে ভাইরাল করে দিবে বলে ভয় দেখিয়েছে, হুমকি দিয়েছে। মেয়েগুলোর শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি মানসিক যন্ত্রণাটা উপলদ্ধি করার চেষ্টাওতো ভয়ংকর। সেই মেয়েগুলো যে এতদিন পর হলেও এই প্রভাবশালীদের কুলাঙ্গার পুত্রদের বিরুদ্ধে মামলা করার সাহস দেখিয়েছে সেজন্য তাদের অভিবাদন।

আর পারিনা। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও খুন, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন এর খবর ঘটছে আর ঘটছে। আইনের শাসন প্রতিফলিত হয়না বলেই একের পর এক অপরাধ ঘটেই চলেছে।

গতকালই ফেসবুকেই এক বন্ধুর ওয়ালে দেখলা মসজিদের ভেতরে আট বছর বয়সী এক বাচ্চা মেয়েকে ধর্ষণ করেছে হুজুর। যেই হুজুরের কাছে ধর্মভীরুরা পরকালের শান্তির খোঁজে সওয়াব পাওয়ার জন্য, আখেরাতের নেক হাসিল করার জন্য ঘুরঘুর করে সেই হুজুরেরা নিজেরা ইহকালের কাম থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না। বাচ্চা মেয়ে দেখলেও তাদের পবিত্র মনের ভেতর কামবাসনা পুলকিত হয়ে যায়। কি বিচার হচ্ছে এই হুজুরের? হবে কি আদৌ?

মাত্র কিছু দিন আগে বেচারা দরিদ্র হযরত আলী তার সাত বছরের মেয়ের ধর্ষকের বিচারের জন্য সমাজপতিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বিচার না পেয়ে এই সমাজটাকেই লাথি মেরে কন্যাকে নিয়ে আত্মহত্যা করেন। হযরত আলী জানেনা, তার এবং তার শিশুকন্যার এই আত্মত্যাগে কোথাও কিছু নড়চড় হয়নি। হবেওনা।

তনুর কথা আমরা ভুলেই গেছি। তনুর মায়ের কথা মনে পড়লে এখনো মনটা হু হু করে উঠে। আহা! শেষ পর্যন্ত বোধহয় এটাই সবার মুখেমুখে মিথ হয়ে যাবে তনু নামের একটা মেয়েকে জলপাই রংএর নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতরে ভাল্লুকে খেয়ে ফেলেছিল। ভাল্লুকটাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। কারণ ভাল্লুকটার গায়ে জলপাই রঙের চাদরছিল।

প্রভাবশালীদের প্রভাবের কারণে এই যে অপরাধ করার পরও অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা যাচ্ছেনা, এই অনাচারের দায় কিন্তু আরো চরমভাবে এ সমাজটাকে দিতে হতে পারে। আইনের চোখে সবাই সমান এই নীতি বাক্যের উপর যেন মানুষের সব বিশ্বাস উঠে না যায় সেজন্য হলেও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি। ধর্ষকসহ সকল অপরাধীর বিচার হওয়া জরুরি।

আর পুত্র সন্তানের বাবামাকে পরিবার পরিজনদের কাছে অনুরোধ পুত্রটিকে সুপুত্র হিসেবে গড়ে তুলুন। নারী মানেই কেবল ভোগ্য পণ্য নয়, নারী মানে মা, নারী মানে গর্ভধারিণী, নারী মানে কন্যা, নারী মানে বোন এই সম্পর্কগুলো পুত্রের করোটিতে গেঁথে দিন। নারীকে সম্মান করতে শেখান। কারণ এই নারীর গর্ভেই দশ মাস সে নিরাপাদে ছিল, এই নারীর শরীরই তাকে এই পৃথিবীর আলো বাতাস দেখানোর জন্য জন্ম দিয়েছে মানব সন্তানরূপে।

এই নারীকে অসম্মান করার জন্য কঠিন শাস্তির মুখোমুখি তাকে হতেই হবে। সে যত প্রভাবশালীর পুত্রের তকমাই গায়ে লাগাক না কেন। এই বোধটা তার মধ্যে জাগিয়ে দিন।

কথায় কথায় মেয়েদের উপর দোষ চাপানোর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে সত্যের পথে চলুক সবাই। সত্য যত কঠিনই হোকনা কেন মেনে নেব সবাই।

ধর্ষকের বিচার চাই। ধর্ষকের পুরো পরিবারের বিচার চাই। ধর্ষকের হয়ে যারা কথা বলছে কিংবা কথা বলবে তাদেরও বিচার চাই।

LEAVE A REPLY