সঞ্জয় বড়ুয়া ।।

বহুল বিতর্কিত মহেশখালের বাঁধটি অপসারণের সিদ্ধান্ত হলেও ভয় কাটছে না আগ্রাবাদ ও হালিশহর এলাকার মানুষের। গত কয়েকদিন ধরে পানিবন্দী অবস্থার কারণে শোচনীয় অবস্থা সবার। ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র প্রভাবে টানা বর্ষণে আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা, মধ্যম ও উত্তর মধ্যম হালিশহরের একাংশ, গোসাইলডাঙ্গা ওয়ার্ডের বেপারিপাড়া, হাজিপাড়া, কুসুমবাগ আবাসিক, বন্দর কলোনি ও ছোটপুল এলাকাসহ আশেপাশের এলাকাগুলোতে তিন দিন ধরে পানিবন্দী লক্ষাধিক মানুষ। এসব এলাকায় জমে থাকা হাঁটু সমান পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে বাসিন্দাদের আসবাপত্র, কাপড়চোপড়, টিভি ফ্রিজসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। বর্ষণ থামলেও পানিবন্দী অবস্থার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে জনজীবন।

নর্দমার দূষিত পানি, ডাস্টবিনের আবর্জনা, মশার উৎপাত, বিদ্যুতের নীরবতা সবমিলে করুণ অবস্থা পানিবন্দী মানুষের। এলাকার লোকজনের মতে, এত দীর্ঘ সময় পানিবন্দী অবস্থা আর কখনো হয়নি। এমন অবস্থা শুধুমাত্র মহেশখালের বাঁধের কারণে নয়। এই পানিবন্দী অবস্থার অন্যতম কারণ আবর্জনায় ভরাট মহেশখাল, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাষণ ব্যবস্থা, জনসচেতনতার অভাব এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণকেই মনে করছে এলাকাবাসী।

সরেজমিনে আগ্রাবাদ সিডিএ এলাকা পরিদর্শন করে দেখা যায়, এখনো প্রধান সড়কগুলো, আশপাশের এলাকা পানি আর নর্দমার আবর্জনায় একাকার। এক নম্বর রোড থেকে গোটা সিডিএ আবাসিক এলাকা হাঁটু পানিতে থইথই করছে। মসজিদ, ফ্ল্যাট, কলোনি আর অফিসের চারদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু পানিবন্দী মানুষের আকুতি। গত তিন দিন ধরেই আগ্রাবাদ সিডিএ এলাকার এই দশা। আগ্রাবাদ এক্সেস রোডের দিকেও পানি। বেপারীপাড়ায় আগে মাঝে মাঝে জোয়ারভাটার সাথে পানি আসতো আর নেমে যেতো। কিন্তু এখন সারাক্ষণ পানিবন্দী লোকজন। আর অন্যদিকে, গোটা মহেলখাল এখন আবর্জনা আর কচুরিপানায় ভরপুর। পর্যাপ্ত পানি আসাযাওয়ার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। যে কারণে এমন পানিবন্দী দশা গোটা আগ্রাবাদ ও আশেপাশের এলাকাজুড়ে।

দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক ৬ নম্বর রোডের স্থায়ী বাসিন্দা নাওমানআলম খান বলেন, ‘২০১৫ সালে বন্দর স্টেডিয়ামের পাশে মহেশখালের উপর নির্মিত বাঁধটি কিছু কিছু এলাকায় সুফল বয়ে আনলেও এখন সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বেশি। যে কারণে গত তিনদিন ধরে পানিবন্দী আমরা।’ এই বিতর্কিত বাঁধটি অপসারণের সিদ্ধান্ত হলেও এতে সমস্যার সমাধান হবে না বলে মন্তব্য করে নাওমানআলম খান আরো বলেন, ‘মহেশখালের দিকে একনজর তাকালে বোঝা যায়, কখনো ড্রেজিং করা হয়নি। গত ৩০ বছরেরও আমার চোখে পড়েনি মহেশখালের ড্রেজিং কার্যক্রম। যদি দ্রুত পরিকল্পিতভাবে মহেশখাল ড্রেজিং করা না হয় তাহলে ধীরে ধীরে পানিবন্দী দশার বিস্তৃতি আরো বাড়বে চট্টগ্রামে।’

তার সাথে একমত বৃহত্তর আগ্রাবাদ ও হালিশহর জলাবদ্ধতা নিরসন কমিটির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল আলম সবুজ। তিনি বলেন, ‘আগ্রাবাদের পানিবন্দী দশা এড়াতে প্রয়োজন দ্রুত মহেশখালের ড্রেজিং ও পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাষণের ব্যবস্থা। পাহাড়িঢল, অতিবৃষ্টি বা জোয়ারের পানি এলাকায় বন্দীদশা সৃষ্টি না করে দ্রশুত যাতে সরে যায় সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। অন্যথায়, বর্ষা মৌসুমে আরো করুণ অবস্থা হবে আগ্রাবাদ ও আশেপাশের এলাকাজুড়ে।’

পুরো আগ্রাবাদ এলাকায় অল্প বৃষ্টিতেও পানি উঠে যায় মন্তব্য করে শান্তিবাগ নিবাসী মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ জানান, কয়েকদিন ধরেই গৃহবন্দী জীবন কাটছে। মশার উপদ্রবের সাথে বিদ্যুতের সমস্যাতো নিয়মিত লেগেই আছে। চারদিকে দূষিত পরিবেশের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ছে পরিবারের ছোটবড় সবাই। এমন অবস্থা থাকলে দূর্বিষহ হয়ে পড়বে জনজীবন।’

আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালসহ আশেপাশের এলাকা এখনো পানিতে ভাসছে। ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র প্রভাবে গত মঙ্গলবার রাতে শুরু হওয়া টানা বর্ষণে হাঁটু পানিতে তলিয়ে যায় শিশু হাসপাতাল। এতে দুর্ভোগ কমছে না রোগীদের উলেহ্মখ করে হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির ভাইসচেয়ারম্যান সৈয়দ মোরশেদ হোসেন বলেন, ‘হাসপাতালের চারদিকে এখনো হাঁটুপানি। আশেপাশের আগ্রাবাদ এলাকাজুড়ে এই পানিবন্দী দশার কারণে রোগের প্রকোপ যেমন বাড়ছে তেমনি হাসপাতালে আসতেও রোগীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি জনসচেতনতাও বাড়াতে হবে। নয়তো রোগের প্রকোপ বাড়লে চিকিৎসাসেবা দিতে হিমসিম খেতে হবে।’

পানিবন্দী থাকলেও কর্মস্থলে যথাসময়ে আসাযাওয়া করতে হচ্ছে আগ্রাবাদ এলাকায় উলেহ্মখ করে আখতারুজ্জামান সেন্টারের ব্যবসায়ী রিপন দাশ রকি জানান, আগ্রাবাদ এলাকায় গাড়ির পরিবর্তে এখন নৌকায় বা সাঁতরে কর্মক্ষেত্রে যেতে হচ্ছে। কর্মচারীরা এভাবে আসলেও গ্রাহকদের অভাবে ব্যবসা বন্ধের উপক্রম এখন। তাই আসন্ন বর্ষা মৌসুম নিয়েও দুশ্চিন্তায় এই ব্যবসায়ী।

ছোটপুল এলাকার বাসিন্দা জোবায়ের আহমেদ আরিফ বলেন, ‘কখনো এমন পানিবন্দী অবস্থায় থাকতে হয়নি এতোদিন। আগে জোয়ারের সময় এলাকায় পানি আসতো আর ভাটার সময় নেমে যেতো। কিন্তু এখন পানি কমছেই না। ছোটপুল এলাকায় নীচতলার বেশিরভাগ ঘরে এখনো অর্ধেক পানির নীচে। এই বন্দীদশা এড়াতে দ্রুত পরিকল্পিত উদ্যোগের প্রয়োজন। নয়তো বর্ষা মৌসুমে পানিতে ভাসবে গোটা আগ্রাবাদ।’

উল্লেখ্য, আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকাসহ সন্নিহিত অঞ্চলকে জোয়ারের পানি থেকে রক্ষার লক্ষ্যে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে বন্দর স্টেডিয়ামের পাশে মহেলখালের উপর নির্মাণ করা হয় বহুল বিতর্কিত এই বাঁধটি। বাঁধটি নির্মাণে দেড় কোটিরও বেশি টাকা ব্যয় করা হয় বন্দর তহবিল থেকে। গত ১ জুন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে বাঁধটি অপসারণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

LEAVE A REPLY