খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি প্রতিনিধি ।।

রাঙামাটির লংগদুতে স্থানীয় এক যুবলীগ নেতার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার পর পাহাড়িদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, নুরুল ইসলাম নয়ন (৩৪) নামে এক যুবলীগ নেতার লাশ গত বৃহস্পতিবার রাতে খাগড়াছড়িদীঘিনালা সড়কের পাশে পাওয়ার পর উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। লাশ নিয়ে গতকাল সকালে স্থানীয় বাঙালিরা মিছিল বের করলে আক্রমণের সূত্রপাত হয়। ঘটনার প্রতিবাদে সেখানে অফিস, বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এসময় সেখানে ধাওয়াপাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে। লংগদু থানার ওসি মোমিনুল হক জানান, শুক্রবার সকালে লংগদু উপজেলা সদরের তিনটিলা পাড়া ও মানিকজুড় ছড়াসহ চারটি গ্রামে পাহাড়িদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে লংগদু উপজেলা সদরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে জানিয়েছেন উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা তাজউল ইসলাম। সন্ধ্যা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত ৭৩টি বাড়ির তালিকা তৈরি করা হয়েছে বলে বিডিনিউজ সূত্রে জানা গেছে।

ঘটনার পর আতংক ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে পুরো উপজেলায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ, সেনাবাহিনী ও আনসার সদস্যরা টহল দিচ্ছে। ঘটনা তদন্তে লংগদু উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এদিকে নয়ন হত্যার প্রতিবাদে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে। হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে প্রশাসনকে সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে।

লাশ উদ্ধার

জানা যায়, খাগড়াছড়িদীঘিনালা সড়কের চার মাইল নামক এলাকা থেকে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালক নুরুল ইসলাম নয়নের (৩৪) লাশ উদ্ধার করা হয়। তিনি রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলার বাইট্টাপাড়া এলাকার ফয়েজ আহম্মদের ছেলে। লাশ উদ্ধার করে পুলিশ জানিয়েছে, তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। নয়ন লংগদু সদর ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।

লংগদু মোটর সাইকেল মালিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো. সালাউদ্দিন আমজাদ জানান, বৃহস্পতিবার সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে দুজন যাত্রী নিয়ে নয়ন খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পথে অনেকে তাকে দেখেছে। পরে শুনি তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। বিকালে ময়না তদন্ত শেষে নয়নের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই দিন রাতেই নয়নের ছোট ভাই দীন ইসলাম লিটন অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে খাগড়াছড়ি সদর থানায় মামলা করেন। নয়ন ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেল চালানোর পাশপাশি লংগদু মহেন্দ্র সমিতির লাইনম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন বলে জানান তিনি।

খাগড়াছড়ি সদর থানার অফিসার ইনচার্জ তারেক মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান বলেন, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে।

ভাঙচুর অগ্নিসযোগ, ১৪৪ ধারা জারি

নয়নের লাশ গতকাল সকালে লংগদুতে তার গ্রামের বাড়ি বাইট্টাপাড়া আনা হয়। সেখান থেকে লংগদুবাসীর ব্যানারে কয়েক হাজার লোকের অংশগ্রহণে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। হঠাৎ করে মিছিল থেকে প্রধান সড়কের পাশের লংগদু উপজেলা জনসংহতি সমিতির কার্যালয়সহ আশপাশের পাহাড়িদের বাড়িঘরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। আগের দিন রাতেই স্থানীয় পাহাড়িরা সম্ভাব্য গোলযোগের শংকায় সরে পড়ায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে পাহাড়ি অধ্যুষিত তিনটিলা পাড়ায় ব্যাপক অগ্নিসংযোগ করা হয়।

তিনটিলা এলাকার বাসিন্দা ও উপজেলা জনসংহতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনি শংকর চাকমা জানান, আমাদের পাড়ার একটি ঘরও অবশিষ্ট নেই। শতাধিক বাড়িঘর সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। তিনি বলেন, এই হত্যার ঘটনার সাথে তো আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবুও কেন আমাদের বাড়িঘর আগুনে পোড়ানো হলো?

লংগদু উপজেলা সমঅধিকার আন্দোলনের সভাপতি খলিলুর রহমান বলেন, আমরা লংগদুবাসীর ব্যানারে সর্বদলীয়ভাবে নয়নের লাশ গোসল শেষে জানাজার জন্য উপজেলা সদরের মাঠের দিকে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ খবর আসে ঝর্ণাটিলায় একটি বাঙালি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এসময় মিছিলের উত্তেজিত লোকজন জনসংহতি সমিতির কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। পরে পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এদিকে ঘটনার পরপর লংগদুতে ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি গতকাল গণমাধ্যমে দেয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করেছে, বাঙালি মোটর সাইকেল চালক হত্যার ঘটনায় শুক্রবার সকাল ১০টায় বাঙালিদের একটি মিছিল উপজেলার তিনটিলায় পৌঁছালে মিছিল থেকে পাহাড়িদের বসতঘরে হামলা করা হয়। এছাড়া মানিকজোড়াছড়া ও লংগদু সদর এলাকায় অন্তত পাহাড়িদের ২ শতাধিক বসতঘর, দোকানপাট ও জনসংহতি সমিতির লংগদু শাখার কার্যালয় পুড়িয়ে দেয়া হয়। অপরদিকে ইউপিডিএফ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে লংগদুতে পাহাড়িদের বসতঘরে হামলার অভিযোগ করে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়।

সমধিকার আন্দোলন রাঙামাটি জেলার সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কামাল বলেন, সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত লংগদুর মোটর সাইকেল চালক নয়নের জানাজায় আসার সময় বাঙালিদের ওপর কিছু পাহাড়ি যুবক হামলা চালালে দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।

রাঙামাটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান সাংবাদিকদের জানান, বিষয়টি জানার সাথে সাথেই আমি লংগদু উপজেলায় ১৪৪ ধারা জারি করার নির্দেশ দিয়েছি। বর্তমানে পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আইনশৃংখলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় আছে।

রাঙামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোহাম্মদ সাফিউল সারোয়ার জানান, পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এ আদেশ বলবৎ থাকবে।

প্রসঙ্গত, ১৯৮৯ সালে তিনটিলা এলাকায় তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুর রশীদকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এরপর বিক্ষুদ্ধ বাঙালিরা এই পাড়ায় ব্যাপক অগ্নিসংযোগ করে এবং ওই এলাকার পাহাড়িরা দীর্ঘদিন ভারতে উদ্বাস্তু ছিল। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর দেশে ফেরত আসে।

আইনশৃংখলা বৈঠক

উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল বিকাল ৩টায় উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে জরুরি আইনশৃংখলা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ঘটনার তদন্তে উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরি, ১৪৪ ধারা বলবৎ রাখা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আইনশৃংখলা বাহিনীর টহল জোরদার ও ঘটনার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বৈঠকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) প্রকাশ কান্তি চৌধুরী, লংগদু জোন কমান্ডার লে. কর্নেল আব্দুল আলীম চৌধুরী, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাফিউল সারোয়ার (অপরাধ), জেলা পরিষদ সদস্য মো. জানে আলমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

বিক্ষোভ

নুরুল ইসলাম নয়ন হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ। গতকাল সকালে খাগড়াছড়ির শাপলা চত্বরে আয়োজিত এক মানববন্ধন থেকে সংগঠনটি প্রশাসনকে এই সময়সীমা বেঁধে দেয়। পাশাপাশি আজ শনিবার খাগড়াছড়ি জেলার প্রতিটি উপজেলায় বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। মানববন্ধনে বক্তব্য দেন পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব আব্দুল মজিদ ও খাগড়াছড়ি জেলা শাখার একাংশের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উল্লাহ আসাদ।

অন্যদিকে রাঙামাটি জেলা শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে যুবলীগ এবং পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ। দুপুরে শহরের বনরূপা থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে বনরূপায় এসে সমাবেশ করে। জেলা যুবলীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও সম্পাদক নূর মোহাম্মদ কাজলের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ছাওয়াল উদ্দিন, পৌর যুবলীগের সভাপতি আবুল খায়ের, জেলা মৎসজীবী লীগের সভাপতি উদয়ন বড়ুয়া, কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক উদয় শংকর চাকমা। সমাবেশ থেকে অবিলম্বে পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও দ্রুত নয়নের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে বলে হুমকি দেয়া হয়। বিক্ষোভ করেছে পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ রাঙ্গামাটি শাখা। জেলা সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন সিনিয়র সভাপতি হাবিবুর রহমান, পার্বত্য নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক নূরজাহান বেগম, তুহিন প্রমুখ।

নিন্দা প্রতিবাদ

এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপি, ইউপিডিএফ, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলন। খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি সবাইকে ধৈর্য্য ধারণ করার অনুরোধ জানান। সমঅধিকার আন্দোলন সংগঠনটির খাগড়াছড়ি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে পাহাড়ে চাঁদাবাজি, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও হত্যাকাণ্ড বন্ধ করে সশস্ত্র গ্রুপগুলো থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি নয়নের হত্যকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়।

অন্যদিকে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। সংগঠনটির রাঙ্গামাটি জেলা ইউনিটের প্রধান সমন্বয়ক শান্তি দেব চাকমা এক বিজ্ঞপ্তিতে অভিযোগ করেন, এটি একটি পরিকল্পিত ঘটনা। তিনি অবিলম্বে লংগদুতে সাম্প্রদায়িক হামলার সুষ্ঠু বিচার বিভাগীয় তদন্ত, ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও নিরাপত্তা বিধান করা এবং হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

LEAVE A REPLY