নুজহাত নূর সাদিয়া

ক’দিন ধরে ছেলেটার মতিগতি তেমন একটা সুবিধার ঠেকছে না মা শারমিন আহমেদের। পেশায় একটি স্বনামধন্য বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা তিনি। কড়া ব্যক্তিত্বের এ শিক্ষিকা শুধু ছাত্র মহলে নয় আত্মীয়পরিজন আর প্রতিবেশী মহলেও বেশ সমীহ জাগানিয়া ব্যক্তিত্ব। তবে, নিজের ঘরে সন্তানদের সামনে কেন জানি এক স্নেহময়ী চিরন্তন বাংলার মায়ের প্রতিচ্ছবিই খুঁজে পায় তার কাছের মানুষরা। বিশেষ করে তার বড় সন্তান সৌমিক বলতে তো তিনি অজ্ঞান। কিন্তু, ইদানিং শান্ত ছেলেটাকে তার কেমন জানি অজানা লাগছে, কেমন জানি মনমরা। দেরি করে ঘুম হতে উঠছে, চোখের নিচে কালি, খাওয়াদাওয়ায় অরুচি সেদিন তো তার এত পছন্দের ঘন দুধের পায়েসটিও মুখে দিয়ে দেখল না। এত ব্রিলিয়ান্ট ছেলের সেমিস্টার রেজাল্টের কি হাল হচ্ছে আজকাল! নতুন নতুন অনেক মুখের আনাগোনা ও বাড়িতে সময়েঅসময়ে, চিন্তায় তার রাতের ঘুম হারাম। সন্দেহটা বেশ কিছুদিন ধরেই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, বেশ কিছু কানাঘুষা ও কানে এসেছিল আমলে নেননি তিনি। সেদিন রাতে সকলে ঘুমিয়ে গেলে চুপিচুপি সৌমিকের শোবার ঘরে ঢুকলেন তিনি। অঘোরে ঘুমোচ্ছে তাঁর আদরের ছেলেটি উপুড় হয়ে একহাত কোল বালিশে রেখে ঠিক যেমন করে ছোট্টবেলায় ঘুমোতো। সন্তর্পণে একহাত বালিশের নিচে ঢুকিয়ে দিলেন, হাতে সূ খোঁচা খেলেন তিনি। ঠিক যা ভেবেছিলেন, এ যে প্যাথেড্রিন ভর্তি সিরিঞ্জ। হঠাৎ করে চোখের সামনে পুরো পৃথিবীটা দুলে উঠল মা শারমিনের। বুকের ভেতর বহু হাতুড়ীর দমাদম বাড়ি পড়ছে যেন! একি হয়ে গেল, তার এত ভাল ছেলেটা মাদকাসক্ত। কোথায় যাবেন, কি করবেন আদৌ কি কিছু করার সময় আছে। সাতপাঁচ ভাবতেই আচমকা চোখের সামনে দপ করে জ্বলে উঠল মাসখানিক আগে বাড়িতে ফেরার পথে চোখে পড়া গুলশানে২ এ অবস্থিত বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র পূর্নাঙ্গ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ’মুক্তি’ নামক সমাজের অন্ধকার দূর করার সে নির্ভীক শোধনাগারটিকে।

মুক্তি, হ্যা সমাজের পথভ্রষ্ট মানুষদের বিশেষ করে অল্প বয়সে যে সমস্ত সম্ভাবনাময় তরুণ নেশা নামক সে বিষাক্ত ছোবলের কবলে পড়ে মানসিক বিভ্রমের শিকার হয়ে সমাজে অপাঙেম্নয় হয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক অক্ষমতার শিকার হয় সে অপ্রকৃতিস্থ নিয়তির শিকার তরুণদের পুনরায় সমাজে প্রকৃতিস্থ করে ফিরিয়ে দিতেই মুক্তি প্রতিষ্ঠানটিও এর প্রাণপুরুষ ডা: কোরেশী এবং তাঁর নিবেদিতপ্রাণ দল প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছেন। ১৯৮৮ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার ইস্কাটনের ছোট পরিসরে একটি ভাড়া বাড়িতে ডা: কোরেশী শুরু করেছিলেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটির যাত্রা। এক পা দু’পা করে কালের সাক্ষী বটবৃক্ষ হতে ঝরে পড়তে থাকে একের পর এক পাতা। আর, ধিরে ধিরে পরিশ্রম, একাগ্রতা আর নিয়মানুবর্তিতার সমন্বয়ে ফুলেফসলে আর সেবার ঐশ্বর্যে ডালপালা মেলতে থাকে ’মুক্তি’ নামক নিয়ত নি:স্বার্থ সেবা প্রদানের সে অশ্বথ বৃক্ষটি। সময়ের পরিক্রমায় ’মুক্তি’ স্থান পরিবর্তন করে অভিজাত এলাকা গুলশান২ এ স্থায়ী বসত গেড়েছে এবং তা আজ ১০০ শয্যা বিশিষ্ট মাদকাসক্তি ও মানসিক সমস্যা চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে বিশেষায়িত হাসপাতালে পরিণত। ডা: কোরেশীর নেতৃত্বে ও সুদক্ষ পরিচালনায় ’মুক্তি’ মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলনে এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে।

প্রতিষ্ঠার পর হতে গত সুদীর্ঘ আটাশ বছরের পথ চলায় এই রোগ নিরাময় কেন্দ্র লাখো মানুষের জীবনে শান্তি ও স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। মাদকের মরণ নেশা হতে প্রাণ তুল্য সন্তানকে ফিরিয়ে এনে তুলে দিয়েছে তাঁরা অভিভাবকের কোলে। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে অনেক তরুণতরুণী আজ জীবনের নানা ক্ষেত্রে তাদের সে অতি কাঙ্খিত সাফল্যের পর্বত চূড়ায় অবস্থান করছে। সামান্য ভুল, হতাশা বন্ধুর চটকদার প্রলোভনে কিংবা নিছক শখের বশে মরণ নেশায় আসক্ত হয়ে একসময় যারা পরিণত হয়েছিল সমাজের বোঝায়, তারাই মুক্তি থেকে চিকিৎসা সেবা নিয়ে আজ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গিয়ে সমাজকে আর কমিউনিটিকে অকৃত্রিম ভরে পরিশোধ করে চলেছে তাদের সঞ্চিত কৃতজ্ঞতা।

একদল উদ্যমী স্বেচ্ছাসেবক পরম মমতায়,অসীম ধৈর্য আর যত্নে মরণ নেশায় আসক্তদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার যে অক্লান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছেন তা সত্যিই অভিভূত করে দেয় আমাদের মত সাধারণ মানুষদের।

মুক্তির চীফ কনসালটেন্ট ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডা: কোরেশী যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাদকাসক্তি ও মনোরোগের উপর উচ্চতর ডিগ্রী ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে প্রায় তিন দশক ধরে তিনি আসক্তদের স্বাভাবিক জগতে ফিরিয়ে আনার কাজে নিজেকে জড়িত রেখেছেন। সন্তানতুল্য মাদকাসক্তদের সূর্যোদয় হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পিতৃস্নেহে বুকে জড়িয়ে রাখেন এ মহৎ হৃদয়ের মানুষটি। একথা অনেকেই বুঝতে চায় না, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা সেবাটা অনেক দুরুহ । বেশির ভাগ বাবামা প্রথম দিকে মানতেই চান না যে তার সন্তান আসক্ত হয়ে পড়েছে। যখন তাঁরা সন্তানকে রিহ্যাবে আনার চিন্তা করেন,তখন তাদের প্রথম চিন্তা হয়ে উঠে কিভাবে এটাকে লুকিয়ে রাখা যায়। সন্তানের এই রোগের কথা যেন পাঁচ কান না হয় সেই চেষ্টাই করেন তারা। আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে মাদকাসক্তের চিকিৎসা সেবার সাথে সামাজিকসাংস্কৃতিক স্পর্শকাতর বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একজন আসক্তকে মানসিক ভাবে সুস্থ ও স্বাভাবিক করে তুলতে তাঁর ভাষায় যেমন কথা বলতে হয়, তেমনি তার পারিবারিক , সামাজিক ধর্মীয় স্পর্শকাতরতার দিকটিও সর্বাবস্থায় খেয়াল রাখতে হয়। শুধুই স্বদেশের সেবাপ্রার্থী নয়, ব্রিটেন ,কানাডা আমেরিকা পৃথিবীর সব দেশের মানুষ তাঁর আন্তরিক আতিথ্য গ্রহণে অধীর হয়ে থাকে।

আসক্তরা কি ধরণের নেশা করে তা নির্ধারণে মুক্তিতে রয়েছে বাংলাদেশের প্রথম এবং একমাত্র সর্বাধুনিক ডোপ টেস্টিং ল্যাবরেটরি। হাসপাতালের সদা প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর পরিবেশে বাড়তি টিপস হিসেবে আরো যুক্ত আছে সুস্থ বিনোদন সুবিধাদি ও শরীর চর্চার জন্য জিমনেসিয়াম। চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বাড়াতে নিয়মিত ক্যাম্পেইন চালানো হয় এই প্রতিষ্ঠান হতে। তাদের রয়েছে আরো অনেক দাতব্য ও কল্যাণমুখি কর্মসূচি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কিংবা দরিদ্র মানুষের যে কোন প্রয়োজনে ’মুক্তি’ পরিবার সবসময় তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।

মাদকের বিরুদ্ধে আজ বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ চলছে। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ এ বিভীষিকাকে রুখে দিতে তাদের সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করে যাচ্ছে। বিগত ২০১৬ সালে ফিলিপাইনকে মাদকমুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে ক্ষমতায় এসেই সে দেশের প্রেসিডেন্ট মোট ২ হাজার ৪শতাধিক মানুষকে মাদক কেনাবেচা ও সেবনে জড়িত থাকার অপরাধে হত্যা করার নির্দেশ প্রদান করেছেন, যা এক বিরল দৃষ্টান্ত। তবে, তারপরও রয়ে যায় এক বিরাট প্রশ্ন, আসলেই কি সমূলে নির্মূল করা সম্ভব এই ঘোর অমানিশার? মাফিয়া, কালোবাজারী আর একধরণের মুনাফাভোগী উঠতি ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে আজ টেকনাফ, কক্সবাজার রামু সহ চট্টগ্রামের এক বড় অংশ সহ বাংলাদেশের বেশ কিছু অঞ্চল ইয়াবা নামক এক বিশাল অজগরের বিষাক্ত দংশনে দংশিত। সে বিষ ছাঁড়ানোর যোগ্য আইনী ওযার দেখা পাওয়া ভারি মুশকিল। মাঝে মাঝে ভোঁজবাজির মত গণমাধ্যমে বিপুল ইয়াবা ধরা পড়ার সরেজমিন প্রতিবেদন ছাপা হয় বটে। তবে, দিনশেষে এর পেছনের রাঘববোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে যায়। আজ বাংলাদেশের প্রতিটি গণমাধ্যমেই সাম্প্রতিক বনানী ধর্ষণ মামলার ঘটনাটি আলোচিত ও সমালোচিত। প্রকৃত অপরাধী কে, তা হয়ত সময়ের সাথে সাথে দু:খজনক ঘটনাটির সত্যতা নির্ধারণ করবে। তবে, যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এ ঘটনার মূল আসামী সাফাত, নাঈম সহ সকলেই মাদকাসক্ত ছিলেন। যাদের নেশার একমাত্র অবলম্বন ছিল অবৈধ পন্থায় বিনা শ্রমে উপার্জিত কোটি কোটি টাকা।

চারদেয়ালের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আজ অবিশ্রাম কেঁদে চলেছে মেয়েটি, দেরিতে হলে ও হয়ত সে বুঝতে পেরেছে কি জঘন্যতম ভুলটিই সে না করেছে। মেয়েটি আর কেউ নয়, বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নারকীয় হত্যাকাণ্ডের আসামী মাদকাসক্ত ঐশী! জন্মধাত্রী মাবাবাকে হত্যার দায়ে সর্ব্বোচ আদালতের রায়ে যার ফাঁসির হুকুম হয়েছে। আর কোন ঐশী,সাফাত কে যেন সমাজের বৃদ্ধাঙ্গুলি সহ্য করতে না হয় অযাচিত ভাবে। অচ্ছ্যুৎ নয়, নয় সমাজের পরগাছা নয় সুখী পারিবারিক জীবনে হঠাৎ গজিয়ে উঠা কোন বিষফোঁড়া। আন্তরিকতা আর সঠিক জ্ঞানের মাধ্যমে ’মুক্তি’ সহ প্রতিটি রিহ্যাব সেন্টারই পারে মাদকাসক্তদের জীবনে এনে দিতে নতুন ভোরের বারতা।

মুক্তি, হ্যা সমাজের পথভ্রষ্ট মানুষদের বিশেষ করে অল্প বয়সে যে সমস্ত সম্ভাবনাময় তরুণ নেশা নামক সে বিষাক্ত ছোবলের কবলে পড়ে মানসিক বিভ্রমের শিকার হয়ে সমাজে অপাঙেম্নয় হয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক অক্ষমতার শিকার হয় সে অপ্রকৃতিস্থ নিয়তির শিকার তরুণদের পুনরায় সমাজে প্রকৃতিস্থ করে ফিরিয়ে দিতেই মুক্তি প্রতিষ্ঠানটিও এর প্রাণপুরুষ ডা: কোরেশী এবং তাঁর নিবেদিতপ্রাণ দল প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছেন।

LEAVE A REPLY