হাসান আকবর ।।

চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় টার্মিনাল নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল (এনসিটি) চলতি বছরের মধ্যে পুরোদমে চালু করার লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। প্রায় ১২শ’ কোটি টাকার ইকুইপমেন্ট কেনা হচ্ছে এই টার্মিনালের জন্য। ইতোমধ্যে অধিকাংশ ইকুইপমেন্ট সংগ্রহের ব্যাপারে যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রায় চারশ’ কোটি টাকা দামের ছয়টি কী গ্যান্ট্রি ক্রেন সংগ্রহের দরপত্রও মূল্যায়ন চলছে।

বন্দর সূত্র জানিয়েছে, পাঁচশ’ কোটিরও বেশি টাকা ব্যয়ে নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল (এনসিটি) নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয় ২০০৭ সালে। বার্ষিক পাঁচ লাখ টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতাসম্পন্ন এই টার্মিনালটি বন্দরের সবচেয়ে বড় টার্মিনাল। অফিসিয়ালি হ্যান্ডলিং ক্ষমতা পাঁচ লাখ বলা হলেও পাঁচটি জেটি সম্বলিত এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই টার্মিনালে বছরে অন্তত ১৫ লাখ টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং করা যাবে। নির্মাণের দশ বছর গত হতে চললেও বন্দর কর্তৃপক্ষ টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু করতে পারেনি। নানা ধরনের মামলা মোকাদ্দমায় জড়িয়ে এনসিটির অপারেটর নিয়োগ থেকে শুরু করে ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ পর্যন্ত সবকিছু ঝুলিয়ে দেয়া হচ্ছিল। বন্দরকেন্দ্রিক সংঘবদ্ধ একটি প্রভাবশালী চক্র নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল পুরোদমে চালু করার ক্ষেত্রে ক্রমাগত বাঁধার সৃষ্টি করেছে। চক্রটি নানাভাবে এই টার্মিনাল থেকে নিজেদের ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করেছে।

কিন্তু দিনে দিনে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কন্টেনার হ্যান্ডলিং নিয়ে চরম বেকায়দার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কন্টেনার হ্যান্ডলিং এর পরিমান প্রতিবছর ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেলেও সেই অনুপাতে বাড়ছে না বন্দরের সুবিধা। এই অবস্থায় এনসিটির মতো একটি বড় টার্মিনালকে পুরোদমে কাজে না লাগালে কন্টেনার হ্যান্ডলিং এর ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দর নিদারুণভাবে হোঁছড় খাবে। গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরে প্রায় সাড়ে তেইশ লাখ টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৬ শতাংশ। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী বছর বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় ৩০ লাখ টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং করবে। যা করার মতো সক্ষমতা বন্দরের এই মুহুর্তে নেই।

এই অবস্থায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব অর্থায়নে এনসিটিতে ইকুইপমেন্ট স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ইকুইপমেন্টগুলো আমদানি করে টার্মিনালে স্থাপন করা জরুরী হয়ে উঠেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১টি আরটিজি (রাবার টায়ার গ্যান্ট্রিক্রেন), ৪টি স্ট্র্যাডল ক্যারিয়ার, ৫টি কন্টেনার মোভার, ৬টি রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন, ৬টি কী গ্যান্ট্রি ক্রেন, ৪টি রিচ স্ট্যাকার, ১টি রেল মাউন্টেড গ্যান্ট্রি ক্রেন কেনার ব্যাপারে প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন ইকুইপমেন্টের ব্যাপারে গত মাসে ওয়ার্ক অর্ডার দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে বন্দরের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, চুক্তির শর্তানুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে ইকুইপমেন্টগুলো বন্দরে পৌঁছবে।

এছাড়া ছয়টি কী গ্যান্ট্রি ক্রেন কেনার ব্যাপারে টেন্ডার মূল্যায়ন চলছে বলে উল্লেখ করে উক্ত কর্মকর্তা বলেন, তিনটি কোম্পানি গ্যান্ট্রি ক্রেন সরবরাহের জন্য টেন্ডার দাখিল করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর দেয়া টেন্ডার যাছাই বাছাই চলছে। আগামী কিছুদিনের মধ্যে কী গ্যান্ট্রিক্রেন সরবরাহের ওয়ার্ক অর্ডার দেয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, চলতি বছরের মধ্যে আমাদের প্রায় সব ইকুইপমেন্টই বন্দরে পৌঁছে যাবে। তবে কী গ্যান্ট্রিক্রেনগুলো কয়েক মাস বাড়তি সময় লাগতে পারে।

বন্দরের পদস্থ ওই কর্মকর্তা গতকাল দৈনিক আজাদীর সাথে আলাপকালে বলেন, বন্দরের চিটাগাং কন্টেনার টার্মিনালে চারটি কী গ্যান্ট্রিকেন রয়েছে। এখন নতুন করে ছয়টি শিপ টু শোর গ্যান্ট্রি ক্রেন বন্দরের ইকুইপমেন্ট বহরে যুক্ত হলে পুরো কার্যক্রমেই ব্যাপক গতিশীলতা আসবে। নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনালে প্রথম দফায় ছয়টি ক্রেন আনা হলেও পরবর্তীতে আরো চারটি ক্রেন কেনার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও বন্দরে ওই কর্মকর্তা জানান।

এই ব্যাপারে গতকাল বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (এডমিন এন্ড প্ল্যানিং) মোহাম্মদ জাফর আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমাদের অনেক ইকুইপমেন্ট প্রয়োজন। আমরা ইকুইপমেন্ট সংগ্রহের প্রক্রিয়া গুছিয়ে এনেছি। ইতোমধ্যে আমরা বিভিন্ন ইকুইপমেন্ট সরবরাহ দেয়ার জন্য কার্যাদেশ দিয়েছি। চলতি বছরের মধ্যেই এসব ইকুইপমেন্ট বহরে যুক্ত হবে। কী গ্যান্ট্রিক্রেন আসতে কিছুটা বাড়তি সময় লাগবে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বন্দরের ইকুইপমেন্ট বহরে বহুল প্রত্যাশিত কী গ্যান্ট্রিক্রেন সংযোজন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।’

LEAVE A REPLY