মাহবুব পলাশ, মীরসরাই ।।

গত কয়েকদিনের টানা বর্ষন আর বজ্রপাতে আতংকগ্রস্ত হয়ে আছে উপজেলাবাসী। সহস্র পরিবার এখন জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। গতকাল শনিবার ( ৩ মে) পর্যন্ত ও থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের দরুন জলাবদ্ধ পানি খাল ছরা দিয়ে সরে গিয়ে ও আবার জমে যাচ্ছে। এতে লাঘব হচ্ছে না মানুষের দূর্ভোগ।

উপজেলার করেরহাট ও ওচমানপুর গ্রামে গত কয়েকদিনে বজ্রপাতে ৪ জনের মৃত্যু ও উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছে। বৃষ্টির শুরুতেই বিকট শব্দে বজ্রপাতে প্রাণহানির আশংকায় আতংকগ্রস্ত মীরসরাইবাসী এখন।

উপজেলার ২ থানা, ২ পৌরসভা ও অন্তত ১২টি হাটবাজার এলাকায় মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। মীরসরাই পৌর বাজার, করেরহাট বাজার, ছত্তর ভূঞারহাট, কমরআলী বাজারে পানি উঠে যায় লোকজনের দোকানপাটে ও । মীরসরাই সদর ও করেরহাট বাজারে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয় সবচেয়ে বেশী। এতে মুদি দোকানের পণ্য, ওষুধ, কসমেটিকসের দোকান সর্বত্র পানি উঠে যায় । মীরসরাই পৌর বাজারের রহমানিয়া হোমিও হলের চিকিৎসক ডাঃ নজরুল ইসলাম বলেন, আমার বয়সে এই বাজারে এমন পানি আর দেখি নাই। তিনি বলেন, সকল মহাসড়কের পূর্ব পার্শ্বের ফার্মেসী সহ সকল দোকানপাট এবার সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় । অনেকের দোকানে মালামালে পানি ঢুকে নষ্ট হয়ে যায় কম্পিউটার সহ নানা সামগ্রী।

উপজেলার সর্ব্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত ২টি গ্রামের মধ্যে ১টি জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের খিলমুরারী গ্রাম ও অপরটি খৈয়াছরা ইউনিয়নের ফেনাফুনি গ্রাম। খিলমুরারী গ্রামে অনেক মাটির ঘর ধ্বসে গিয়ে গৃহহীন অনেকে মানবেতর জীবন যাপন করছে।

আবার ফেনাফুনি গ্রাম ও জলাবদ্ধতায় দরিদ্র অনেকে অনাহারে থাকার খবর পাওয়া গেছে। এই বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়া আহমেদ সুমন জানান, খিলমুরারী গ্রামে নিজে শুক্রবার বিকেলে পরিদর্শন করেছি। সেখানে সরকারি সহযোগিতার জন্য জেলা প্রশাসক বরাবরে আবেদন ও পাঠিয়েছি। তবে ফেনাফুনি গ্রামের বিষয়ে তিনি স্থানীয় চেয়ারম্যান থেকে কোন তথ্য অবগত হননি বলে জানান। তিনি আরো জানান যেসব এলাকায় দূর্যোগ রয়েছে সেখানে স্থানীয় চেয়ারম্যান তাঁকে অবহিত করলে তিনি উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। তিনি আরো বলেন বৃষ্টির পানি অনেক স্থানে কমে গিয়েছিল। কিন্তু রাতের এবং আজকের বৃষ্টিতে হয়তো আবার সমস্যা হতে পারে। তবে বৃষ্টি বন্ধ হলেই জলাবদ্ধতা থাকবে না বলে আশা প্রকাশ করেন। তিনি বজ্রপাত থেকে নিজ নিজ দায়িত্বে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।

আবার উপজেলার ১৬ ইউনিয়ন, দু’টি পৌরসভার নিমাঞ্চল এলাকাগুলো প্লাবিত হয়ে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। এতে প্রায় হাজার হাজার পরিবারের লক্ষাধিক মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট পানিতে ভেসে গেছে মহাসড়কের পূর্বাঞ্চলের এলাকার সকল পুকুর দীঘির মাছ। মীরসরাই কলেজ দীঘির মৎস্য চাষী এবায়দুর রহমান বলেন , আমার ২টি দীঘি সহ এলাকার কোন পুকুর জলাশয়ে মাছ নেই । মাছ চাষীরা ইতিমধ্যে লোকসানের ভারে হতবিহ্বল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে উপজেলার খালছরাগুলো সংস্কার না থাকা ও অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণ করায় পানি নিষ্কাসন সুবিধা না থাকার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্থাপন করা ুইচ গেইটগুলো অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টির অন্যতম কারণ। করেরহাট ইউনিয়নের সরকারতালুক গ্রামে প্রভাবশালী এক ব্যক্তি পানি চলাচলের জায়গায় পুকুর খনন করায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। ওই ইউনিয়নের নন্দিপুর, সরকারতালুক, ছত্তরুয়া, দক্ষিণ অলিনগর প্লাবিত হয়েছে। ৩নং জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মকছুদ আহমদ চৌধুরী জানান, ইউনিয়নের খিলমুরারী গ্রামের পুরোটাই প্লাবিত হয়েছে। অনেকের বসত ঘর তলিয়ে বসতির অযোগ্য হয়ে পড়েছে কাঁচা ঘরবাড়ি। প্রায় অর্ধশত পরিবার ইতিমধ্যে কোনভাবে ঝুপড়ি বেঁধে আশ্রয় নিয়েছে উঁচু স্থানে। তিনি ইতিমধ্যে প্রশাসনের কাছে সহযোগিতা ও চেয়েছেন বলে জানান।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বুলবুল আহম্মেদ জানান, পাহাড়ি ঢলে উপজেলার ১’শ হেক্টর জমির গ্রীস্মকালীন সবজির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জলাবদ্ধতা থাকলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে। এছাড়া পাহাড়ি ঢলের পানিতে পলি মাটি থাকায় তা কৃষি জমির জন্য সহায়ক হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

LEAVE A REPLY