আজাদী প্রতিবেদন

মাত্র দু’ সপ্তাহেরও কম সময়ে আবারো ডুবল শহর চট্টগ্রাম। আবারো জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ পোহাতে হল নগরবাসীকে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট মৌসুমী নিম্নচাপের প্রভাবে গত রোববার বিকেল থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। সর্বশেষ গতকাল ভোররাত থেকে টানা কয়েক ঘন্টার ভারী বর্ষণে ডুবে যায় শহরের নিম্নাঞ্চল। এতে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতার। বিশেষ করে সকাল নয়টা পর্যন্ত শহরের কোথাও কোমর সমান এবং কোথাও হাঁটু সমান পাানি জমে থাকতে দেখা গেছে। দুপুরের দিকে কয়েকটি এলাকায় পানি কমে এলেও আগ্রাবাদসহ আশেপাশের এলাকাগুলোতে বিকেলেও পানি ছিল হাঁটুর উপর।

জলাবদ্ধতার জন্য সকালে সড়কে যান চলাচল ছিল কম। এতে চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষােক ভোগান্তিতে পড়তে হয়। আবার কোথাও বৃষ্টির পানি জমে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হয়, এতে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে সৃষ্টি হয় যানজট। বিভিন্ন পরিবহনে আটকা পড়েন যাত্রীরা। পাশাপাশি রিকশা, সিএনজি ড্রাইভারদের মনগড়া ভাড়া দাবি তো ছিলই।

প্রসঙ্গত, এর আগে গত ৩০ ও ৩১ মে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র প্রভাবে নগরীতে তীব্র জলাবদ্ধতা হয়েছিল। এছাড়া গত ৪ ও ২১ এপ্রিলও নগরীতে জলাবদ্ধতাজনিত সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছিল। প্রতিবারই চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাসবাণী শুনানো হয়েছিল। কিন্তু জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসীর মুক্তি মেলেনি।

আবহাওয়া অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পূর্বাভাস কর্মকর্তা শ্রীকান্টত কুমার বসাক দৈনিক আজাদীকে জানান, ‘বিকেল তিনটা পর্যন্ত (গতকাল সোমবার) পূর্ববর্তী ২৪ ঘন্টায় ১৮০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। যা দুপুর ১২ টায় ছিল ১৭৩ দশমিক ৫ মিলিমিটার, সকাল ৯ টায় ছিল ১৫১ মিলিমিটার এবং ভোর ৬ টায় ছিল ৮২ মিলিমিটার। আগামীকাল সকাল ৯ টা পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে গতকাল সকালে সাড়ে আটটায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের নিজস্ব ওয়েব সাইটে ভারী বর্ষণের সর্তকর্তা প্রকাশ করা হয়। এতে ‘চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় ভূমি ধসের সম্ভাবনা’ রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। আবহাওয়ার এক সতর্ক বার্তায় বলা হয়েছে, উত্তরপশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উত্তরপূর্ব বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থানরত নিম্নচাপটি উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে সোমবার সকাল ৬টায় ভোলা ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছিল। বেলা ১২টায় এটি স্থল নিম্নচাপে পরিণত হয়ে কুমিল্লা ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছিল। এর প্রভাবে মঙ্গলবারও (আজ) বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

গতকালের জলাবদ্ধতার চিত্র : সকাল সাড়ে আটটায় বহাদ্দারহাট মোড়ে হাঁটু সমান পানি দেখা গেছে। এখানে কথা হয় রিকশাচালক সাইদুর রহমানের সঙ্গে। দৈনিক আজাদীকে তিনি বলেন, ‘একটু আগে আমি নতুন চান্দগাঁও থানার সামনে দিয়ে আসছি। ওখানে ফ্লাইওভারের নিচে হাঁটুর উপর পানি ছিল। আমার সামনেই একটি রিকশা উল্টে যায়। রিকশার যাত্রী ছিলেন দুইজন মহিলা। তাদের ভ্যানিটি ব্যাগ পানিতে ভেসে গেল’।

শুধু বহাদ্দারহাট মোড় নয়। বহাদ্দারহাট থেকে ওয়াসা পর্যন্ত সড়কের কোথাও হাঁটু সমান আবার কোথাও আরও বেশি পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। মুরাদপুর, ২ নম্বর গেইট , জিইসি মোড় এবং ওয়াসা মোড়ে জলাবদ্ধতা ছিল বেশি। দুপুর হতে হতে এসব এলাকায় পানি নেমে যায়। সড়কটির এই অংশের মধ্যে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের কারণে সৃষ্ট জঞ্জাল পানির স্বাভাবিক গতিপথকে রোধ করে। যা এখানে হওয়া জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ।

এদিকে নগরীর আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, হালিশহর , শান্তিবাগ আবাসিক এলাকা, কমার্স কলেজ রোড, বেপারি পাড়া, আগ্রাবাদ সিডিএ, হালিশহর এলাকায় প্রায় কোমর সমান পানি দেখা গেছে। সকাল থেকে পানিবন্দি ছিলেন এসব এলাকার লোকজন। বিকেলেও ওসব এলাকার পানি নামেনি। পানি প্রবেশ করে বন্দর উপপুলিশ কমিশনারের কার্যালয়েও। গতকাল দুপুরে আগ্রাবাদ এক্সেস রোডে ডিঙ্গি নৌকা চলতে দেখা গেছে। নৌকায় রাস্তা পার হওয়ার সময় একজনকে বলতে শোনা গেছে, ‘নগর জলে নৌকা চলে।’

পানি উঠেছে আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালেও। বিকেল তিনটায় উপস্থিত হয়ে সেখানে নিচ তলার ফ্লোরে হাঁটু সমান পানি দেখা যায়। এতে হাসপাতালে আসা রোগীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা স্বরুপ দত্ত রাজু দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘ঈশাণ মিস্ত্রির হাট, পুরাতন কোর্ট মার্কেট, পোর্ট কলোনি, বন্দর ইস্ট কলোনি, হাসপাতাল কলোনিতে এখনো (গতকাল বিকেল ৫ টায়) হাঁটু সমান পানি আছে। সকালে আরো কাহিল অবস্থা ছিল।’ বৃষ্টি এবং জোয়ারের পাানি একীভূত হয়ে সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মহেশখালের বাঁধ অপসারণ না করার জন্যই এই অঞ্চলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে’।

আগাব্রাদ এক্সেস রোডে পানিতে আটকে থাকা বাসের টালক মো. সেলিম বলেন, ‘গাড়ি বন্ধ হয়ে আছে সকাল থেকে। চালাতে পারছি না।’

এদিকে চজকবাজার, ডিসি রোড, বগারবিল, চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা, ডিসি রোডস্থ নিরাপদ হাউজিং সোসাইটি, মুন্সির পুকুর পাড়, বাদুরতলা, হালিশহর, কাতালগঞ্জ, ষোলশহর ২ নম্বর গেইটসহ বিভিন্ন এলাকায় গোড়ালি থেকে হাঁটু পানি জমে যায়। পানিতে বিভিন্ন সড়ক, গলিসহ পাড়া মহল্লার বিভিন্ন ভবনের নিচতলার বাসা ডুবে যায়।

চকবাজার কাপাসগোলা আবদুল হাকিম বাইলাইনে কোমর সমান পানি দেখা গেছে গতকাল বিকেলেও। এখানে গলিতে পারাপারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ভ্যানগাড়ি। জলাবদ্ধতায় আটকে থাকা লোকগুলোকে একশ গজ দূরত্ব পার হতে দিতে হচ্ছে ৩০ টাকা।

স্থানীয় বাসিন্দা সানুমং মারমা দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘আবদুল হাকিম বাইলাইনে জেয়ারের সময়ও হাঁটুর উপর পানি থাকে। বৃষ্টি হলে তো অবস্থা আরো ভয়াবহ হয়। ১০০ হাত পার হতে ভ্যানগাড়িকে দিতে হয় ২০ টাকা।’

এদিকে চাঁন্দগাও আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মির্জা সোহেল দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘সেহেরীর পর থেকেই পানি উঠতে শুরু করে। আমি বাসা থেকে বের হয়েছি দুপুর ১২টায়। তখনো রাস্তায় হাঁটু সমান পানি ছিল।

পানি উঠেছে চাক্তাইখাতুনগঞ্জেও। চাক্তাইখাতুনগঞ্জ ব্যবসায়ি সমিতির নেতা ও সাবেক কাউন্সিলর জামাল হোসেন দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘চাক্তাইখাতুনগঞ্জে কোমর সমান পানি উঠেছে। প্রতিটি দোকান ও ভবনের নিচ তলায় পানি ঢুকেছে। আগের রাতে ব্যবসায়ীরা মালামাল সরিয়ে নেয়ায় ক্ষতি কিছুটা কম হতে পারে। তিনি জানান, এবছর এর আগে এখানে আর পানি উঠেনি।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) সুদীপ বসাক দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘মুরাদপুর, দুই নম্বর গেইট, প্রর্বতক মোড় এলাকায় তেমন পানি জমে ছিল না। আগ্রাবাদ এলাকায় একটু বেশি আছে। এটা তো সবাই জানে মহেশখালের বাঁধের কারণেই আগ্রাবাদ এলাকার এই অবস্থা।’ ‘সকাল আটটানয়টা পর্যন্ত এখানে প্রচুর পানি ছিল। এটা কি জলাবদ্ধতা নয়?’ এমন প্রশ্নে চসিকের এ প্রকৌশলী বলেন, ‘সকাল আটটা পর্যন্ত ছিল। এরপর চলে গেছে। বৃষ্টির পরিমাণ তো বেশি ছিল। পানি নামার জন্য তো সময় প্রয়োজন। খাল কাটার সুফল পাচ্ছি আমরা।’

নাগরিকদের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে আশ্বাস মেয়রের: এদিকে জলাবদ্ধতার জন্য সৃষ্ট দুর্ভোগ থেকে নাগরিকদের মুক্তি দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিলেন চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। গতকাল সকালে হালিশহর বড় পোল এলাকাসহ জলাবদ্ধতাকবলিত কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করতে এসে এ আশ্বাস দেন তিনি। তিনি দুর্ভোগকবলিত এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন এবং দুঃখ প্রকাশ করেন।

এসময় তিনি উত্তাধিকার সূত্রে জলাবদ্ধতা সমস্যা পেয়েছেন উল্লেখ করে গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, ‘সৃষ্ট জলাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে নিরসনের লক্ষ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পাওয়ার চায়নার মাধ্যমে পৃথক পৃথক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। এছাড়াও বিশ্ব ব্যাংকের সহযোগিতায় চট্টগ্রাম ওয়াসা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন মাস্টার ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ সিস্টেম চালু করতে যাচ্ছে। এসকল পরিকল্পনার মাধ্যমে কর্ণফুলী নদী থেকে নগরীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সকল খাল খনন, খালের দুই পাড়ে রাস্তা ও দৃষ্টি নন্দন সবুজায়ন এবং খালের প্রবেশ মুখে পাম্প হাউজ সহ ুইচ গেইট নির্মাণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।

মেয়র বলেন, আমরা চাক্তাই খালে পরিকল্পিতভাবে অনেক আগে থেকে মাটি উত্তোলন করছি। এটা এখনো চলমান আছে। মহেশখালেও শুরু করেছি। বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে। এটি দীর্ঘদিনের পুরোনো সমস্যা। এক বছরের মধ্যে আমি সমাধান করতে পারব এমন আশা করার যৌক্তিকতা নেই। আমাদের ইক্যুইপমেন্ট ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ পায়নি।’

মহেশখালের মুখে অস্থায়ী বাঁধের প্রভাবে এবার বেশি পানি জমেছিল উল্লেখ করে আ জ ম নাছির আরো বলেন, ‘গত বছর এভাবে পানি এখানে ওঠেনি। এ বছর পানির পরিমাণটা বৃদ্ধি পেয়েছে। এটার পেছনে মহেশখালের বাঁধ দায়ি বলে অনেকের ধারণা। যদিও এটা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে।’ মেয়র বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড, বন্দর কর্তৃপক্ষ, চসিকসহ আরও বেশ কিছু সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান বৈঠক করে সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি বাঁধটি যত দ্রুত সম্ভব অপসারণ করা হবে। জনস্বার্থে বাঁধটি তৈরি হলেও এখন সেভাবে সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। সে কারণে অপসারণের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছি। বন্দরের বোর্ড সভায় ইতোমধ্যে বাঁধ ভাঙার ব্যাপারে একমত হয়েছি। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে দ্রুত বাঁধটি অপসারণ হবে। মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে বন্দর চেয়ারম্যানের কথা হয়েছে।’

জলাবদ্ধতা নিরসনে এলাকাবাসীর সহযোগিতা চেয়ে মেয়র বলেন, ‘আমি স্থানীয়দের অনুরোধ করেছি, দেখেন জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছেন আপনারা। আপনারা যদি ময়লাআবর্জনা খালে ফেলেন, খাল দখল করেন তবে জলাবদ্ধতা যাবে না। আপনাদের সহযোগিতা প্রয়োজন। চসিক পরিকল্পিত উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী বছর এর ভালো সুফল পাওয়া যাবে।’ তিনি মহেশখাল পরিদর্শন করে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, ‘মহেশখালের অবস্থা আসলে খুব একটা ভালো নয়। অনেক জায়গা ভরাট হয়ে গেছে’।

জাইকার অর্থায়নে আগ্রাবাস এক্সেস রোড এলাকায় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে উল্লেখ করে মেয়র বলেন, ‘জাইকার অর্থায়নে প্রকল্প গ্রহণ করেছি। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে ঠিকাদার নিয়োগ ও কাজ শুরু হয়ে যাবে।’

LEAVE A REPLY