mirkasem

আজাদী ডেস্ক ।।

মানবতাবিরোধী অপরাধী জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। ফাঁসির রায়ের পুনর্বিবেচনা চেয়ে মীর কাসেমের রিভিউ আবেদন খারিজ করে মঙ্গলবার সকালে এ রায় ঘোষণা করেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ। অন্য বিচারপতিরা হলেনবিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও মোহাম্মদ বজলুর রহমান। সর্বোচ্চ আদালতের সর্বশেষ এ রায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হলো মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী কিলিং স্কোয়াড আলবদর বাহিনীর তৃতীয় শীর্ষ নেতা মীর কাসেমের মামলার আইনি লড়াই। তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রায় কার্যকরের বিষয়টিও চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছালো। সর্বশেষ ধাপে এখন কেবলমাত্র অপরাধ স্বীকার করে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারবেন তিনি। এ জন্য তিনি সাতদিন সময় পাবেন। প্রাণভিক্ষা না চাইলে বা চাওয়ার পর আবেদন নাকচ হলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে আর কোনো বাধা থাকবে না। আইন অনুসারে তখন সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যেকোনো সময় ফাঁসির রায় কার্যকর করবে কারা কর্তৃপক্ষ। মুক্তিযুদ্ধকালীন চট্টগ্রামের ত্রাস কাসেম রাজনৈতিক ও আর্থিক ক্ষেত্রে অসাধারণ ধূর্ততার স্বাক্ষর রেখে অত্যন্ত দ্রুততায় নিজের ও দলের উন্নতি ঘটান, পরিণত হন জামায়াতের আর্থিক মেরুদণ্ডে।

পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

এদিকে সকালে রায় ঘোষণার পর বিকেল সোয়া ৫টার দিকে ২৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। প্রধান বিচারপতি নিজে রায় লেখার পর অন্য বিচারপতিরা এতে একমত পোষণ করে স্বাক্ষর করেন। এরপর সন্ধ্যায় রায়ের অনুলিপি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পৌঁছানো হয়েছে। সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে রায়ের অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের সহকারী রেজিস্ট্রার মেহেদী হাসান ট্রাইব্যুনালে নিয়ে যান। এরপর অনুলিপিটি ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা আনুষ্ঠানিকতা শেষে কারাগারে পাঠাবেন । গতকাল রাতেই সেটি কারাগারে পৌঁছুনোর কথা। এ ছাড়া রায়ের একটি করে অনুলিপি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হবে।

প্রতিক্রিয়া

রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় কাসেমের প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, যে সাক্ষ্য প্রমাণ তৈরি করা হয়েছে, আদালত সেই মিথ্যা প্রমাণের উপর ভিত্তি করে সাজা দিয়েছেন। আদালতের আর গত্যান্তর ছিল না। আইনটি এমনভাবে করা হয়েছে যে ‘হিয়ার, সে’ এভিডেন্সও মানতে হবে।

কাসেম এখন প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি নাসে প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, ‘ওইখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন, আই অ্যাম এ লইয়ার, ফাইটিং ফর ল। অন্যদিকে রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, যে আশা নিয়ে সমগ্র জাতি ছিল এবং আমি ছিলাম, আজ তা পূর্ণ হয়েছে।

বিডিনিউজ বাংলানিউজ বিবিসিসহ বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার খবরে বলা হয়, গত ২৮ আগস্ট দ্বিতীয় দিনের মতো মীর কাসেমের রিভিউ শুনানি শেষে আদালত রায় ঘোষণার জন্য ৩০ আগস্ট দিন ধার্য করেছিলেন। এর আগে ২৪ আগস্ট মীর কাসেমের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব রিভিউ শুনানি পেছানোর আবেদন করলে আপিল বেঞ্চ তা গ্রহণ না করে তাকে শুনানি শুরু করতে বলেন। তখন খন্দকার মাহবুব শুনানি শুরু করলে আপিল বেঞ্চ আংশিক শুনানি নিয়ে ২৮ আগস্ট পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করেন। গত ২৫ জুলাই মীর কাসেমের আইনজীবীর সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বেঞ্চ শুনানি ১ মাস পিছিয়ে ২৪ আগস্ট রিভিউ শুনানির দিন ধার্য করেছিলেন।

মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মীর কাসেম আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সেই রায়ের বিরুদ্ধে মীর কাসেম আলী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করেন। ২০১৬ সালের ৮ মার্চ দেওয়া আপিলের রায়ে মীর কাসেম আলীকে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল থাকে। এরপর ২০১৬ সালের ১৯ জুন আপিলে বহাল থাকা মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ করেন মীর কাসেম আলী। মোট ৮৬ পৃষ্ঠার ওই রিভিউ আবেদনে ১৪টি যুক্তি তুলে ধরে মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস চান তিনি।

রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ৩০ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় মীর কাসেম আলীর পক্ষে আপিল করেন জয়নুল আবেদীন তুহিন। মীর কাসেমের পক্ষে ১৮১টি যুক্তি দেখিয়ে মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস চেয়ে এ আপিল করা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতায় ছাত্রসংঘের বাছাই করা সদস্যদের নিয়ে গঠিত সশস্ত্র আলবদর বাহিনীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের কমান্ডার হিসেবে মীর কাসেম আলী মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটান, তা ট্রাইব্যুনালের রায়ে প্রমাণিত হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় ট্রাইব্যুনালের আদেশে ২০১২ সালের ১৭ জুন মীর কাসেম আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেই থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

এর আগে গত ৬ জানুয়ারি জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখে রায় ঘোষণা করেন আপিল বিভাগ। এ মামলা এখন পূর্ণাঙ্গ রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। এটি আপিলের ষষ্ঠ রায়।

এ ছাড়া আপিলে চূড়ান্ত পাঁচটি রায়ের পর চারটিতে জামায়াতের দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। আপিলের আরেক রায়ে জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। এ রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি গত ৩১ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয়। রায় রিভিউ চেয়ে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষ এরই মধ্যে আবেদন দাখিল করেছে।

প্রশ্ন এখন প্রাণভিক্ষা : সর্বোচ্চ সাজার রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন খারিজের মধ্য দিয়ে জামায়াতের অর্থ যোগানদাতা হিসাবে পরিচিত যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলীর দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের শেষ হয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে এখন কেবল রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারবেন তিনি। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে দণ্ডাদেশ পাওয়া সব আসামিই শেষ সুযোগ হিসেবে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারে। একাত্তরের হত্যাকারী মীর কাসেমকেও সে সুযোগ দেওয়া হবে।

সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, নিয়ম অনুযায়ী, রিভিউ খারিজের রায়ের তিনটি প্রত্যায়িত অনুলিপি পাঠাতে হয় বিচারিক আদালত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। সেগুলো ট্রাইব্যুনাল, কারা কর্তৃপক্ষ ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের জন্য। পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দুই পক্ষের আইনজীবীকেও অনুলিপি দিতে হয়। ট্রাইব্যুনাল ওই রায় পাওয়ার পর সেই আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কারা কর্তৃপক্ষকে আদেশ দেয়। আদেশে ট্রাইব?্যুনালের বিচারকদের সই নিয়ে রায়ের কপিসহ পাঠানো হয় কারা কর্তৃপক্ষ, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ে। এরপর কারা কর্তৃপক্ষ আসামি কাসেমকে রিভিউ খারিজের রায় ও আদেশ পড়ে শুনিয়ে জানতে চাইবেতিনি প্রাণভিক্ষা চান কি না।

দণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, তিনি (কাসেম) যদি মনে করেন প্রাণভিক্ষা চাইবেন, তার দরখাস্ত রাষ্ট্রপতির কাছে প্রেরণ করা হবে। রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের পরই দণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হবে। রাষ্ট্রপতি যদি প্রাণভিক্ষা দেন সেটা আলাদা কথা। আর যদি না দেন তাহলে দণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হবে। আর প্রাণভিক্ষা না চাইলে যে কোনো সময় দণ্ড কার্যকর করা যাবে। এই দণ্ড কার্যকরের এখতিয়ার সম্পূর্ণ সরকারের। তবে তার আগে স্বজনেরা কারাগারে গিয়ে কাসেমের সঙ্গে সাক্ষাত করতে পারবেন। প্রাণভিক্ষার আবেদনের নিষ্পত্তি না হলে ফাঁসি কার্যকর করা যাবে না। চিকিৎসার জন্য বর্তমানে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ দেশে ফিরবেন আগামী ৪ সেপ্টেম্বর। এর মধ্যে মীর কাসেম ক্ষমার আবেদন করলে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে কিনা জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি যেখানেই থাকুন না কেন, তাকে এটা অবহিত করা যায়। সেটাতে কোনো অসুবিধা নাই।’

রাষ্ট্রপতি বিদেশে থাকলেও প্রাণভিক্ষার নিষ্পত্তি সম্ভব

যুদ্ধাপরাধে ফাঁসির আসামি মীর কাসেম আলী প্রাণভিক্ষা চাইলে বিদেশে বসেই রাষ্ট্রপতি তার নিষ্পত্তি করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।সচিবালয়ে মঙ্গলবার সাংবাদিকদের প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, এমন তো কথা নাই যে বিদেশে থাকলে উনি (রাষ্ট্রপতি) ফাইল দেখতে পারবেন না, এ রকম তো আইনের মধ্যে নাই। তারা যদি ক্ষমা চেয়ে দরখাস্ত করে, সেটাকে ত্বরিত নিষ্পত্তি করার ব্যবস্থা আইনে যেটা আছে সেটাই করা হবে। স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য গত রোববার লন্ডনে গেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। আগামী ৪ সেপ্টেম্বর তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে।

যুদ্ধাপরাধীদের আগের রায়গুলো কার্যকরের প্রক্রিয়া তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘(প্রাণভিক্ষার আবেদনের জন্য) সাত দিনের অপেক্ষা আমরা করে থাকি। আমাদের কাছে মনে হয় সাত দিন অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত সময়। মন্ত্রী বলেন, দণ্ড কার্যকরের জন্য রায়ের অনুলিপি আপিল বিভাগ থেকে বিচারিক আদালত হয়ে কারাগারে যেতে হবে, সেজন্য অপেক্ষা করতে হবে। মীর কাসেমের রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার অধিকার আছে। সেটা যদি তিনি প্রয়োগ করেন, তবে সেটা রাষ্ট্রপতির কাছে পৌঁছাবে, সেই প্রক্রিয়া শেষ হলেই রায় কার্যকর হবে।

LEAVE A REPLY