জয়দীপ দে

এক উইকএন্ডে খুব সকালে এমআরটি ট্রেনে চেপে চেন্নাই ফোর্ট স্টেশনে গেলাম। সেখান থেকে হাঁটা দূরত্বে মাদ্রাজ মেডিকেল। স্টেশন থেকে বেরুতেই দেখি সাদা নার্সিংয়ের পোশাক পরা ঝাঁকে ঝাঁকে মেয়েরা হাসপাতালের দিকে ছুটছে। চেহারা দেখে মনে হলো এরা এখনো নার্স হয়ে ওঠেনি। পড়াশোনায় আছে। এই মেয়েগুলোই চেন্নাই’র ভাগ্য উন্নয়নের অন্যতম নিয়ামক।

ক’ দিন আগে গিয়েছিলাম মাদ্রাজ মেডিকেল হাসপাতালে যাকে বর্তমানে রাজীব গান্ধী জেনারেল হাসপাতাল নাম দেয়া হয়েছে। উপমহাদেশের অনেক ইতিহাসের সাক্ষী এ হাসপাতাল দেখার ইচ্ছে ছিল অনেক দিনের। এখানে প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা আম্মা হেলথ চেকআপ নামে একটি স্বাস্থ্য পরীক্ষার স্কিম চালু করেছেন। সেটা এখন দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। সেটা দেখা ও সেবা গ্রহণের জন্যই আসা। এখানে এক থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত ৩ ধরনের স্কিমে হেলথ চেক আপ করা যায়।

এক উইকএন্ডে খুব সকালে এমআরটি ট্রেনে চেপে চেন্নাই ফোর্ট স্টেশনে গেলাম। সেখান থেকে হাঁটা দূরত্বে মাদ্রাজ মেডিকেল। স্টেশন থেকে বেরুতেই দেখি সাদা নার্সিংয়ের পোশাক পরা ঝাঁকে ঝাঁকে মেয়েরা হাসপাতালের দিকে ছুটছে। চেহারা দেখে মনে হলো এরা এখনো নার্স হয়ে ওঠেনি। পড়াশোনায় আছে। এই মেয়েগুলোই চেন্নাই’র ভাগ্য উন্নয়নের অন্যতম নিয়ামক। এদের আন্তরিকতা আর বিশ্বস্ততার কারণে চেন্নাইকে আজ ভারতের চিকিৎসার রাজধানী বলা হয়। চিকিৎসা সেবা দিয়ে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করছে তামিলনাড়ু সরকার। এদেশের গরিব মানুষরা মেয়ে জন্ম নিলে স্বপ্ন দেখে কষ্ট করে হলেও সায়েন্সে মেট্রিকটা পাস করাবে। তারপর নার্সিংয়ে পড়াবে। নার্স হতে পারলেই ভাগ্য বদলে যাবে। বর্তমানে চেন্নাইর নার্সরা আরবআফ্রিকা ও দূরপ্রাচ্যের দেশে দাপটের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। বছর বছর এদের চাহিদা বাড়ছে।

আম্মা চেকআপের জন্য মাদ্রাজ মেডিকেলের প্রবেশ দ্বারের পাশে একটি দালানের নিচতলা ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আড়াই থেকে ৩ হাজার স্কয়ার ফিট জায়গা হবে। সকাল সাড়ে সাতটা থেকে এখানে কাজ শুরু হয়। আমরা সোয়া সাতটায় গিয়ে দেখি আট দশজন সেবা প্রত্যাশী ইতোমধ্যে এসে পৌঁছে গেছেন। চেকআপ সেন্টারের কর্মকর্তা কর্মচারীরাও। প্রথমে আমরা বাইরে দাঁড়ালাম। ৫ জনের একেকটা দল করে ভেতরে ডাকল। ঝকঝকে তকতকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ। দেয়ালগুলো খুব রুচিশীল টাইলস দিয়ে সাজানো। ফলস সিলিং। ক্লিনাররা ধোয়া মোছার উপরেই আছে। এটা যে একটা সরকারি প্রতিষ্ঠান তা বিশ্বাস হয় না। খুব নিয়মতান্ত্রিকভাবে একটার পর একটা টেস্ট করে গেলেন তারা। প্রথমে রক্তের নমুনা নেয়া হলো। তারপর ইসিজি, এবডোমেনের আল্টা সাউন্ড টেস্ট, ফিজিক্যাল টেস্ট, বুকের এক্সরে, বোন স্ক্যান, ইকো কার্ডিওগ্রাম। এক দফা সব চেক আপের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভারি ব্রেকফাস্ট খেতে দিল। পেট ভরে খেলাম। দুই ঘণ্টা পর আবার রক্তের নমুনা নেয়া হলো। এর পর মিলল ছুটি।

এতোগুলো টেস্ট করতে প্রায় সাড়ে ৪ ঘণ্টা লেগে গেলো। কিন্তু মোটেও বিরক্তি লাগল না। বড়ো ডিসপ্লের টিভি আছে। পত্রিকা আছে। আছে এসি’র মিষ্টি বাতাস। সবার জন্য বসার পর্যাপ্ত আসন। সবচেয়ে বড় কথা হাসপাতালের কোন ডাক্তার বা কর্মচারীকে কারো সাথে জোরে কথা বলতে দেখলাম না। বিরক্তি কিংবা অসহিষ্ণু ভাব নেই কারো মধ্যে। এদেশেও মানুষের ভিড় আছে। লেখাপড়া না জানা মানুষের অবিবেচক সুলভ আচরণ ও প্রশ্ন আছে। কিন্তু কালো কালো মেয়েগুলো মিষ্টি হেসে ঠাণ্ডা মাথায় তা ট্যাকেল করছে। ফিজিক্যাল টেস্টের সময় একজন ডাক্তারের সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলতে হলো। তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমার শরীরের বিভিন্ন তথ্য জানতে চাইলেন। এমন কি আমার ব্যক্তিগত জীবনযাপন সম্পর্কেও। দেখলাম যথেস্ট সম্মান ও ধৈর্য্য ধরে কথাগুলো শুনছেন। শেষ বার যখন রক্তের নমুনা নিচ্ছিল, তখন মেডিকেল এসিস্টেন্ট ভদ্রলোক হেসে বললেন, কি করমণ্ডল এক্সপ্রেস? আমি বললাম, নোবাই এয়ার। স্টেট গেস্ট।

বাংলা মুলুকের লোক দেখলে চেন্নাইর লোকজন করমণ্ডল এক্সপ্রেস বলে টিটকারি মারে। কারণ এই দ্রুতগামী ট্রেনে করে প্রতিদিন হাজার মানুষ কলকাতা থেকে চেন্নাই আসে। এর একটা বড় অংশ বাংলাদেশি এবং ক্যানসারের রোগী। অনেকেই তাই একে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস বলে। ইন্ডিয়ান রেলওয়ে একে যথেস্ট গুরুত্ব দেয়। এই ট্রেনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পাসিং দেয়া হয় যাতে কোনভাবে লেট না করে। আরো মজার ব্যাপার এই ট্রেনের কোন সাপ্তাহিক বন্ধ নেই।

আজ গিয়েছিলাম টেস্টের রিপোর্ট নিতে। বেশ ভয়ে ভয়ে গেলাম। কি জানি কি রিপোর্ট আসে। বড় কোন সমস্যা দেখা দিলে ট্রেনিংটাই ভেস্তে যাবে। রিপোর্ট দেখে তো আমি তাজ্জব। বিশাল একটা ব্যাগে ভরে রিপোর্ট দিয়েছে। ব্যাগটা খুলে দেখি এর মধ্যে ১১ টি কাগজ, একটি এক্সরে ও একটি বুকলেট। প্রথম পৃষ্ঠায় দেখলাম রক্তের বায়োকেমেস্ট্রি রিপোর্ট। এতেই ২৬ পদের তথ্য দেয়া আছে! প্রত্যেকটি পাতায় এ রকম তথ্যের ছড়াছড়ি। এতোগুলো রিপোর্ট মাত্র ৩ হাজার রুপিতে! বাংলাদেশি টাকায় সাড়ে ৪ হাজার টাকা। সহগামী একজন বললেন বাংলাদেশে হলে এটা বারো থেকে পনের হাজার টাকার মামলা ছিল। চেন্নাই অ্যাপোলোতেও ৯ হাজার রুপির কম নেয় না। তাও সব রিপোর্ট করায় না। রিপোর্ট নিয়ে চলে আসতে চাইলাম। কিন্তু চেকআপ সেন্টারের লোকজন বাধা দিল। তাদের ডাক্তার আছে। তারা রিপোর্ট দেখে পরামর্শ দেবে।

রিপোর্ট নিয়ে চেকআপ সেন্টারের মেডিকেল বোর্ডের সামনে গেলাম। তারা আমার রিপোর্টে দুটো লঘু সমস্যা খুঁজে পেলেন। এর মধ্যে একটা হলো রক্তে ভিটামিন ডি’র পরিমাণ কম। কি করা লাগবে তার পরামর্শ দিয়ে দিলেন। আমরা ৮১০ জন এক সঙ্গে ছিলাম। সমস্যাক্রান্ত সবাইকে কোন না কোন বিভাগে রেফার করে দেয়া হলো। বিনা ফিতে আউট ডোরে ডাক্তার দেখালেন তারা। যাদের সমস্যা গুরুতর মনে হলো তাদেরকে জরুরি ভিত্তিতে টেস্ট করানো হলো। কাউকে কাউকে পাঠানো হলো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে। মাত্র তিন হাজার টাকায় যেন কমপ্লিট একটা হেলথ সাপোর্ট। অবিশ্বাস্য। অভাবনীয়। এজন্যই বোধহয় মৃত্যুর পরও জয়ললিতাকে চেন্নাইবাসী এতো শ্রদ্ধা করে। আম্মা বলতে তারা অজ্ঞান।

আম্মা চেক আপ করাতে করাতে ভাবছিলাম, আচ্ছা এ রকম একটা চেক আপ স্কিম চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কি চালু করতে পারে না। সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী সিটি কর্পোরেশনের যে চিকিৎসা সেবার অবকাঠামো দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছেন তাতে এ ধরনের স্কিম চালানো কোন ব্যাপারই না। আশা করি ব্যবসায়িকভাবেও লাভজনক হবে। জয়ললিতা প্রবর্তিত এই আম্মা চেকআপ কেবল চেন্নাইবাসীর উন্নত স্বাস্থ্য সেবাই দিয়ে যাচ্ছে না, সমান্তরালে সরকারে ভালো রাজস্ব আয় হচ্ছে। এই আয়ের একটা অংশ হাসপাতালের চিকিৎসক কর্মচারীদের পেছনে ব্যয় করা হচ্ছে।

LEAVE A REPLY