অপু দত্ত

রাতে যখন পাহাড়কে পাহাড় পেরিয়ে দার্জিলিং শহরে প্রবেশ করছি তখন নিমিষেই ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে রাতের আলোতে বসতিগুলো দেখে সত্যিই মুগ্ধ হচ্ছি। আমরা সবাই অবাক চোখে দেখছি সেই দৃশ্য। শীত তখন জেঁকে বসেছে। সবার গায়ে দুটি করে গরম কাপড়। দার্জিলিং শহরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত ৮টা। হোটেল খুঁজে উঠে পড়লাম। রাতে খাবার যখন খেতে বের হলাম তখন নিস্তব্ধ এক নগর।

বছর চারেক ধরে ঘুরে বেড়ানোর নেশাটা আমার মধ্যে জেঁকে বসেছে। সুযোগ পেলে এদিক ওদিক ঘুরতে যাওয়া এখন নেশাই বলা যায়। আর তাইতো গেলো বছরের শেষে ঘুরে এলাম হিমালয়ের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ছবির মতো সুন্দর স্বপ্নপুরী দার্জিলিং থেকে। পাহাড়ে থাকি বলে প্রায় দার্জিলিংএর নামটা শুনতে হয়। সাজেককে দার্জিলিং এর সাথে তুলনা করা হয়। তাই নিজে স্বচক্ষে দেখাটা জরুরি ছিল। ৪ বন্ধু মিলে গত ১৭ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১০টার গাড়িতে রওনা হই। পরের দিন সকাল ৭টায় বেনাপোল সীমান্তে পৌঁছে যাই। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে ওপারে গিয়ে আবার একই গাড়িতে উঠে রওনা দিলাম কলকাতার উদ্দেশ্যে। (তবে দার্জিলিং যাওয়ার জন্য বুড়িমারি সীমান্তই উত্তম। অল্প সময়ের মধ্যে পৌঁছে যাবেন)

দুপুর দেড়টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম কলকাতা শহরে। বাস কাউন্টারে নেমে ট্রেনের টিকেট কেটে কলকাতার আশপাশে এক চক্কর দিলাম। ডলারকে রুপিতে পরিবর্তনের কাজটাও শেষ করে ফেললাম। যেহেতু আগে থেকে টিকেট কাটিনি তাই ট্রেন পেয়েছি রাত দশটার। পরের দিন দুপুরে পৌঁছে গেলাম জলপাইগুড়ি স্টেশনে। সেখানে দুপুরের খাবার শেষ করে সাড়ে ৩টার দিকে রিজার্ভ গাড়িতে রওনা হলাম দার্জিলিং শহরে।

এমনিতে টানা পরিশ্রমের কারণে ভীষণ ক্লান্ত সবাই। কিন্তু রাতে যখন পাহাড়কে পাহাড় পেরিয়ে দার্জেলিং শহরে প্রবেশ করছি তখন নিমিষেই ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে রাতের আলোতে বসতিগুলো দেখে সত্যিই মুগ্ধ হচ্ছি। আমরা সবাই অবাক চোখে দেখছি সেই দৃশ্য। শীত তখন জেঁকে বসেছে। সবার গায়ে দুটি করে গরম কাপড়। দার্জিলিং শহরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত ৮টা। হোটেল খুঁজে উঠে পড়লাম। রাতে খাবার যখন খেতে বের হলাম তখন নিস্তব্ধ এক নগর।

পরের দিন সকাল থেকে ঘোরাঘুরি শুরু। সকালে নাস্তা সেরে রওনা হলাম (ঔধবটফটহটভ ুমলর্ভটধভণণরধভথ অর্ভ্রর্ধর্লণ) দেখতে। এভারেস্ট যারা যেতে চায় তাদের জন্য এটি তীর্থযাত্রার মত। সাথে রয়েছে মিউজিয়াম। মিউজিয়ামের সামনে কণভড়ধভথ ূমরথটহএর একটা স্ট্যাচু রয়েছে। ১৯৫৩ সালের ২৯ মে প্রথম কোন ব্যক্তি হিসেবে এভারেস্ট জয় করে। মিউজিয়াম দেখে এরপর গেলাম চিড়িয়াখানায়। সেখানে আছে নানা প্রজাতির পশু পাখি। চিড়িয়াখানা ঘুরে গেলাম কণভড়ধভথ ৗমডপ পাহাড় দেখতে। ৫০ রুপিতে এ বিশাল পাথরে ওঠার স্বাদটা নিলাম। ভিন্ন অনুভূতি।

তারপর এসেছি ক্যাবল কারে ওঠার জন্য। একদম নতুন অভিজ্ঞতা ছিল। তাই উত্তেজনার কমতি ছিল না। ১শ ৭৫ রুপিতে টিকেট কেটে লম্বা লাইন শেষে তিন বন্ধু, সাদা, রনি আর মিনহাজকে নিয়ে উঠে পরলাম ট্যুরিস্ট ক্যাবল কারে। সব মিলে ৪ কিলোমিটারের যাত্রা। নামতে ২ উঠতে ২ কিলোমিটার। উপর থেকে চা বাগান, আঁকা বাঁকা রাস্তা, দার্জিলিং শহর দেখতে কি যে ভালো লেগেছে বোঝাতে পারবো না।

পরের গন্তব্য গঙ্গামায়া পার্ক। আঁকা বাঁকা রাস্তা পেরিয়ে গঙ্গামায়া পার্কে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সূর্য অস্ত যাওয়ার উপক্রম। পাহাড়ের নিচে এই পার্কের অবস্থান। অনেক সুন্দর জায়গা। এই গঙ্গামায়া পার্কের কথা একটু পর বলছি। তার আগে বলি রক গার্ডেনের কথা। মূলত একটা ঝর্ণাকে টার্গেট করে এই রক গার্ডেনের সৃষ্টি। এই ঝর্ণাটিকে ধরেই চমৎকার করে গার্ডেনটি সাজানো হয়েছে। সিঁড়ি বেয়ে আপনি ঝর্ণার উপরে উঠতে পারবেন। চারপাশে রয়েছে সাপের মত আঁকা বাঁকা রাস্তা। এবার গঙ্গামায়ার কথা বলি। রক গার্ডেন আর গঙ্গামায়া হচ্ছে সৃজনশীল চিন্তাভাবনার বর্হিপ্রকাশ মাত্র। পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে যদি এমন চিন্তা করা যেত তাহলে সারাবিশ্বের মানুষ এখানে হুমড়ি খেয়ে পড়তো। শুধু সংশ্লিষ্টদের সুনজর প্রয়োজন। রক গার্ডেনের মধ্যে দিয়ে শেষ হলো প্রথম দিনের সফর।

সন্ধ্যায় দার্জিলিং শহরের আশপাশটা ঘুরলাম। সারাবিশ্বের মানুষের পদচারণায় মুখর দার্জিলিং। ঠাণ্ডায় সবাই কাবু। তিনটা সোয়েটার গায়ে দিয়েও শীত নিবারণ করা কঠিন। হোটেলে এসে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পরলাম খেতে। খাবারের বৈচিত্রতা মুগ্ধ করার মত। খরচও কম। যদিও সেখানে লুচি, আলুর দম, টক দই কিংবা আলু পরটা বেশি চলে। তবে আপনি নিজের পছন্দ মত খাবারও সেখানে পাবেন।

দ্বিতীয় দিনের ঘুরতে যাওয়ার সময়সীমা মাথায় নিয়ে ঘুমোতে গেলাম। আমাদের গাড়ির ড্রাইভারের নির্দেশ ভোর সাড়ে ৩টার মধ্যে সূর্য উদয় দেখার জন্য বেরিয়ে পড়তে হবে। গন্তব্য হলো টাইগার হিল। হাড় কাঁপানো শীতে সকালে যখন ঘুম ভাঙলো কোনভাবে নিজেকে গরম কাপড়ে মুড়িয়ে নিচে যখন নামলাম তখন রাজ্যের শীত আমার শরীরে। তখনও আলো ফোটেনি। টাইগার হিলের কাছাকাছি যেতেই দেখি হাজারো মানুষের ভিড়। টিকিট কেটে সবাই যাচ্ছে সূর্য উদয় দেখতে। আমরাও চায়ে চুমুক দিয়ে রওনা হলাম। কিন্তু ঠাণ্ডার কারণে শরীর চলছে না।

সূর্য উদয় আমি আগেও দেখেছি কিন্তু টাইগার হিলে যেভাবে সূর্য উদয় দেখেছি এটি আমার জন্য সেরা মুহূর্ত। পূর্ব দিকে আস্তে আস্তে লাল আভা দেখা যাচ্ছিল। আস্তে আস্তে লাল আভার পরিমাণ বাড়তে লাগলো। এক সময় সূর্যি মামা উঁকি দিলো। সাথে সাথে সবাই চিৎকার করে উঠল। আনন্দ উল্লাস। এই সময় মনে থাকবে বহুদিন। সেখান থেকে গন্তব্য হলো বাতাসিয়া লুপ। বাতাসিয়া লুপে রয়েছে শহীদ সেনাদের স্মরণে শহীদ বেদি। এখান থেকে পুরো দার্জিলিং শহরের ভিউ দেখা যায়।

পথে নাস্তা শেষ করে আমাদের গন্তব্য ছিল জাপানি পিস প্যাগোডা ও জাপানি মন্দির। দুটোই একই স্থানে অবস্থিত। দৃষ্টিনন্দন স্থাপনায় মুগ্ধ করবে যে কাউকে। আর যে দৃশ্য দেখার জন্য আমরা দার্জিলিং আসার পর থেকে অস্থির হয়ে আছি সেই দৃশ্যের দেখা মিললো জাপানি মন্দির থেকে। বিশ্বের তৃতীয় উচুঁ পর্বত কাঞ্চনজঙ্ঘা। নিচে দার্জিলিং শহর আর বীরদর্পে দাঁড়িয়ে থাকা কাঞ্চনজঙ্গা দেখে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ। এরই সাথে আমরা দার্জিলিং সফর শেষ করলাম। দুপুরের খাওয়া শেষ করে গন্তব্য এবার কালিমপঙ। দার্জিলিং থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত এই জায়গাটি। চলতি বছর জেলায় পরিণত হবে বলে জেনেছি। রাতে কালিমপং পৌঁছে হোটেলে উঠলাম। সকালবেলা ৯টি স্পট ঘোরার জন্য গাড়ি ঠিক করে বেরিয়ে পড়লাম।

একে একে ঘুরলাম বৌদ্ধ মন্দির, হনুমান মন্দির, দূর্গা মন্দির, ডেলো পার্ক, আর্মি ভিউ পয়েন্ট, বৌদ্ধ মনেস্টারি, অর্কিডের বাগান, ২ একর জায়গার উপর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মঙ্গল ধাম, লাভার্স পয়েন্ট। তবে উত্তেজনাটা পেয়েছি এই কালিমপঙএ। কারণ স্বপ্নের প্যারাগ্লাইডিং করেছি এখানে। প্যরাশুটে ভর করে আকাশে উড়েছি প্রায় ১৫ মিনিট। এ এক অন্যরকম অনুভূতি। যারা পরবর্তীতে কালিমপঙ যাবেন তারা একবার হলেও চেষ্টা করবেন প্যারাগ্লাইডিং করতে।

বিকালেই আমরা শিলিগুঁড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। পরে সেখান থেকে কলকাতা। কলকাতা শহরটা আমার কাছে পুরাতন ঢাকা শহরের মত লেগেছে। কলকাতায় ভিক্টেরিয়া পার্ক, ভারতীয় জাদুঘর আর কলকাতা শহর দেখতে দেখতে কাটিয়ে দিলাম তিনটা দিন। সব মিলে দশদিনের ভারত সফর শেষে এবার ফেরার পালা। ২৭ তারিখ ভোরে পৌছে যাই ঢাকায়।

নোট: পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং দার্জিলিং এর মধ্যে অনেক মিল আছে। শুধু পার্থক্য সেখানকার কর্তৃপক্ষ দার্জিলিংকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন স্পটে পরিণত করতে পেরেছে। আর অপার সম্ভাবনা থাকার পরও পার্বত্য চট্টগ্রামকে এখনো আমরা পর্যটক বান্ধব করতে পরিনি। তাই পর্যটন বিকাশে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ নজর দেয়ার অনুরোধ করছি।

LEAVE A REPLY