আহমদুল ইসলাম চৌধুরী

বাংলাদেশ থেকে ১ লক্ষ ২৭ হাজারের মত হজ্বযাত্রী সৌদি আরব গমন করবে যদি সৌদি সরকার বিশেষ বিবেচনায় কোটা বাড়ায়। সরকারি ব্যবস্থাপনার কোটায় সরকারই ১০ হাজার জন রাখে। কিন্তু তারা কোটা মত হাজী পায় না। বাদ বাকি সমস্ত হাজী কাফেলা এজেন্সির মাধ্যমে বেসরকারিভাবে হজ্বে গমন করে থাকেন। বেসরকারি হজ্বের কাফেলা এজেন্সিও সরকারি নিয়ন্ত্রণে। কাফেলা এজেন্সিরা দেশে ধর্ম মন্ত্রণালয়, বিমান বা সৌদি এয়ার লাইন্সে এবং সৌদি আরবে ধর্ম মন্ত্রণালয় ও মোয়াল্লেমের মাধ্যমে হজ্বযাত্রীগণের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে।

হজ্বযাত্রী শুধু টাকা, আইডি কার্ড, ফটো ও পাসপোর্ট প্রদান করলে হয়ে যায়। রমজানের পর সরকারি স্বাস্থ্য ক্যাম্পে গিয়ে টিকা, ইনজেকশন দিতে হয়। যেহেতু এ সার্টিফিকেট সৌদি সরকার চায়।

কাফেলা এজেন্সির দিকনির্দেশনায় হজ্বযাত্রীগণ চট্টগ্রাম অথবা ঢাকা বিমান বন্দর হয়ে জেদ্দা বিমান বন্দরে পৌঁছবে। জেদ্দা হয়ে আগে পবিত্র মক্কা গেলে তবে দেশ থেকে রওনা হওয়ার আগে এহরাম পরিধান করতে হবে। হজ্ব তিন প্রকার। অতএব এ এহরাম পরিধান শুধুমাত্র ওমরার নিয়তে বা শুধুমাত্র হজ্বের নিয়তে অথবা ওমরা ও হজ্ব উভয়ের নিয়তে তা জেনে বুঝে করতে হবে। জেদ্দা বিমান বন্দরে হজ্ব টার্মিনালে থাকে বাংলাদেশ হজ্ব মিশনের স্বেচ্ছাসেবক। তারা এবং কাফেলা এজেন্সির স্টাফদের সহায়তায় সরকারি তথা মোয়াল্লেম বাসে করে এহরাম পরিহিত হলে পবিত্র মক্কা এহরাম বিহীন হলে পবিত্র মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। পবিত্র মদিনায় রওনা হলে তথায় পৌঁছে কাফেলা এজেন্সি নির্ধারিত ঘরে অবস্থান নিবেন। তাদের ব্যবস্থাপনায় চলবে খাওয়াদাওয়া। এখানে ৮ দিন পর্যন্ত থেকে মসজিদে নববীতে পর পর ৪০ ওয়াক্ত নামাজ পড়বেন জামাতের সাথে। রওজা পাকে সালাম পেশ করবেন। জান্নাতুল বাকীতে যেয়ারতে যাবেন। কোন একদিন সকাল বেলায় কাফেলা/এজেন্সির বাসে যাবেন মসজিদে কুবা, মসজিদে কেবলা তায়েন, সাত মসজিদ, ওহুদের যুদ্ধে শহীদগণের যেয়ারতে। পবিত্র মদিনা থেকে পবিত্র মক্কায় আসতে যুলহুলাইফা থেকে এহরাম পরিধান করবেন তবে মীকাতে এহরামের নিয়ত করে পবিত্র মদিনায় কাফেলা এজেন্সির ঘরে এহরাম পরিধান করা সুবিধাজনক।

হজ্বের আগে পবিত্র মদিনা থেকে পবিত্র মক্কা যেতে কোন এহরাম তা বুঝতে হবে। আপনি কি ওমরার নিয়ত করবেন? না হজ্বেও, নাকি ওমরা ও হজ্ব উভয়ের এহরাম পরিধান ও নিয়ত করবেন তার তরতীব জেনে নেয়া দরকার।

আপনি যদি এহরাম পরিহিত অবস্থায় জেদ্দা বিমান বন্দর থেকে পবিত্র মক্কায় আসেন তবে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে কাফেলা এজেন্সির ভাড়া করা ঘরে উঠবেন। শারীরিক ও সময়ের অবস্থাভেদে পবিত্র কাবার দিকে যাবেন তাওয়াফ সা’য়ী করে এহরামমুক্ত হতে। এতে তিন ঘন্টা বা কম বেশি লাগবে। আছে হজ্ব, ওমরার নিয়মকানুন যা ভালভাবে জেনে নেয়া দরকার। যদি আপনি তামত্তো হজ্বযাত্রী হন তবে এ এহরাম পরিধান এবং তাওয়াফ, সা’য়ী শুধুমাত্র ওমরার। এতে আপনি সা’য়ীর পর চুল কেটে এহরামমুক্ত হবেন। ৮ যিলহজ্ব হজ্ব পর্যন্ত নামাজ, তাওয়াফ ইত্যাদিতে সময়ক্ষেপণ থাকবেন। হজ্বের পর সময় থাকলে হজ্বের আগে অতিরিক্ত ওমরা না করা চাই।

কাফেলা এজেন্সির সুবিধামত হজ্বের আগে পবিত্র মদিনায় যাওয়া হলে তবে তা জেদ্দা বিমান বন্দর হয়ে সরাসরি যেতে পারাটা অতি উত্তম। সৌদি সরকারের নির্দেশ মতে আপনি পবিত্র মদিনায় হজ্বের সফরে একবার যেতে পারবেন। যদি আপনি হজ্বের আগে যান তবে পবিত্র মদিনা হতে এহরাম পরিধান করে পবিত্র মক্কায় আসবেন। আর যদি হজ্বের পরে যান তবে পবিত্র মদিনা থেকে সরাসরি জেদ্দা হজ্ব টার্মিনালে আসবেন।

পবিত্র কাবা, মিনা, আরাফাত, মুযদালেফা ১৬ বর্গ কি. মি. বিশিষ্ট এ চার স্থান নিয়ে ৫ দিন ব্যাপী হজ্ব কার্যক্রম চলে। মৌলিকভাবে তথা নবী পাক (.)’র হজ্ব কার্যক্রম ছিল ৬ দিন ব্যাপী। কিন্তু তিনি মিনায় অবস্থানকালীন ১২ যিলহজ্ব যে সমস্ত সাহাবাগণ মিনা ত্যাগ করতে চেয়েছিলেন তাদেরকে ৩ শয়তানের প্রতি ২১টি পাথর নিক্ষেপ করে সূর্যাস্তের পূর্বে মিনা ত্যাগ করার অনুমতি দিয়েছিলেন। এতে বর্তমানকালে ৮১২ যিলহজ্ব ৫ দিন ব্যাপী হজ্ব কার্যক্রমই রেওয়াজে পরিণত।

পাঁচদিন ব্যাপী হজ্ব কার্যক্রমে ৯ যিলহজ্ব আরাফাত এবং ৯ যিলহজ্ব দিবাগত রাত মুজদালেফা বাদে হজ্ব কার্যক্রমে বাকী ৪ দিন মিনা কেন্দ্রিক।

মিনা একটি পাহাড়বেষ্টিত ছোট উপত্যকা। উত্তরদক্ষিণ একটু কোণাকোণি ৫ কি.মি. পূর্বপশ্চিম ২ কি.মি. বলা যায়। মিনার একদম উত্তরপ্রান্তে তথা পবিত্র কাবার ৫ কি.মি. দূরত্বে ৩ শয়তানের অবস্থান। মিনার দিক থেকে গেলে প্রথমে ছোট শয়তান, অতপর মেঝ শয়তান, তারপর বড় শয়তান। এ এক ইতিহাস যা মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (.) ও তাঁর মহান পুত্র হযরত ইসমাঈল (.)-কে কেন্দ্র করে।

মিনায় সৌদি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দিকনির্দেশনায় মোয়াল্লেমগণ তাঁবুর ব্যবস্থা ও খাবারের আয়োজন করে থাকে। একালে হজ্ব কার্যক্রমে সৌদি সরকার খুব কড়া অবস্থানে। আগেকার মত সৌদি আরবে অবস্থানকারী বিদেশিরা হজ্ব করা সহজ নয়। সৌদি নাগরিকদেরও নিয়মের মধ্যে এসে মোয়াল্লেমের নিয়ন্ত্রণে হজ্ব করতে হবে। বিশ্বের যে সমস্ত দেশের নাগরিক সৌদি আরব প্রবেশ করতে ভিসা লাগে না তাদেরকেও হজ্ব করতে হলে নিয়মের মধ্যে এসে মোয়াল্লেমের মাধ্যমে হজ্ব করতে হবে।

বর্তমানকালে মিনার ভিতরে তাঁবুতে অবস্থান করতে হলে মোয়াল্লেমকে বড় অংকের টাকা প্রদান করতে হবে। বাংলাদেশের সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৫/৭ হাজার হাজী এবং চট্টগ্রামের মেয়র কাফেলাসহ কয়েকটি এজেন্সিবাদে বাদ বাকী বাংলাদেশের প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার হাজী হজ্বে মিনার দক্ষিণে মুজদালেফায় অথবা মিনার পূর্ব সংলগ্ন পাহাড়ের ঐ পাড়ে মোয়াল্লেম তাঁবুতে অবস্থান নিয়ে থাকেন। যেহেতু এসব জায়গায় মোয়াল্লেমের তাঁবুর রেইট কম।

সৌদি আরবের মুফতিগণের ফাতওয়া তথা অভিমত, মিনায় জায়গা সংকুলান হচ্ছে না বিধায় মিনার বাইরে অবস্থান করাটাও গ্রহণযোগ্য।

হজ্বে তিন ফরজ ও ছয় ওয়াজিব। বাকি সব সুন্নত ও মুস্তাহাব। হজ্বের প্রথম ফরজ এহরাম পরিধান করা, দ্বিতীয় ফরজ ৯ যিলহজ্ব আরাফাত ময়দানে অবস্থান করা তৃতীয় ফরজ ১০১২ যিলহজ্বের মধ্যে পবিত্র কাবা তাওয়াফ করা। হজ্বের ছয় ওয়াজিবের মধ্যে () ৯ যিলহজ্ব দিবাগত মুজদালেফায় অবস্থান করা () তিন দিনব্যাপী শয়তানের প্রতি পাথর নিক্ষেপ করা () তামত্তো ও কেরাণ হাজীর দমে শুকরিয়া তথা হজ্বের কোরবানী করা () মাথার চুল ফেলানো (মহিলাগণের সামান্য কাটা) () ফরজ তাওয়াফের পর সা’য়ী করা () হজ্বের পর পবিত্র মক্কা ত্যাগ করার পূর্বে তাওয়াফ করা।

পাঁচদিনব্যাপী হজ্ব কার্যক্রম কাফেলা এজেন্সির পৃষ্ঠপোষকতায় সৌদি মোয়াল্লেমগণের নিয়ন্ত্রণে। প্রতি মোয়াল্লেম ৪/৫ হাজার হাজী নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

হজ্ব ও যেয়ারত উপলক্ষে পবিত্র দুই নগরীতে আপনার অবস্থান, ঘর ও কক্ষের মান, দূরত্ব পাঁচদিনব্যাপী হজ্ব কার্যক্রমে সেবার মান সব কিছু নির্ভর করবে কাফেলা এজেন্সিকে প্রদানকৃত আপনার টাকার অংকের উপর। টাকা অনুপাতে কাফেলা এজেন্সিরা আপনাকে সেবার মান দিবে এটাই স্বাভাবিক। তবে তারা হজ্বের তথা এ পবিত্র ধর্মীয় সফরে আপনাকে তদারক, মুরব্বিয়ানা, দিকনির্দেশনা দান করবে যাতে আপনি সুষ্ঠুভাবে হজ্ব সম্পাদন করে দেশে ফিরে আসতে পারেন। মহান আল্লাহ পাক হজ্বযাত্রীগণের হজ্ব কবুল করুক। আমিন॥

লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামলেখক ও গবেষক

LEAVE A REPLY