আজ হাজার রজনীর চেয়েও শ্রেষ্ঠ রজনী, পবিত্র লাইলাতুল কদর। ২৬ রমজান দিবাগত রাত্রিটি মুসলিম বিশ্বে লাইলাতুল কদর হিসাবে পরিচিত। আরবি ভাষায় ‘লাইলাতুন’ অর্থ রাত্রি। আর ‘কদর’ অর্থ সম্মান বা মর্যাদা। তাই লাইলাতুল কদরের অর্থ সম্মানিত বা মহিমান্বিত রজনী। এর অন্য অর্থ হলভাগ্য, পরিমাণ ও তকদির নির্ধারণ করা। এ রাত্রিকে লাইলাতুল কদর হিসেবে নামকরণ করার কারণ হলো, এ রজনীর মাধ্যমে উম্মতে মুহাম্মদীর সম্মান বৃদ্ধি করা হয়েছে বা এ রাতে মানবজাতির তাকদির পুন:নির্ধারণ করা হয়। তাই এই রজনী অত্যন্ত পুণ্যময় ও মহাসম্মানিত। আল্লাহ তাআলা যে মহিমাময় রাত্রিকে অনন্য মর্যাদা দিয়েছেন, যে একটি মাত্র রজনীর ইবাদতবন্দেগিতে হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও অধিক সওয়াব অর্জিত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, উম্মতে মুহাম্মদীর পরম সৌভাগ্য যে কালপরিক্রমার ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর মাহে রমজানে সেই মহিমান্বিত ও শ্রেষ্ঠ রজনী লাইলাতুল কদর পুনরায় কল্যাণ, শান্তি ও মুক্তির সওগাত নিয়ে মুসলমানদের জীবনে ফিরে আসে।

এই রাত্রে মানবজাতির তকদির পুন:নির্ধারণ করা হয়। যেমনআল্লাহ তায়ালা সূরা আদদুখানের ৪ নং আয়াতে বলেন, এই রাত্রে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়। এই রাতে পরবর্তী এক বৎসরের অবধারিত ভাগ্যলিপি ব্যবস্থাপক ও প্রয়োগকারী ফেরেশতাদের নিকট হস্তান্তর করা হয়। এতে প্রত্যেক মানুষের বয়স, মৃত্যু, রিজিক, বৃষ্টি ইত্যাদির পরিমাণ নির্দিষ্ট ফেরেশতাদের লিখে দেওয়া হয়। মহান আল্লাহতায়ালা লাইলাতুল কদর উপলক্ষে অবতীর্ণ করেছেন একটি পরিপূর্ণ সূরাসূরাতুল কদর। সেই সূরায় তিনি বলেন, ‘ইন্না আনযালনাহু ফি লাইলাতিল কদর’অর্থাৎ আমি এটি (মহাগ্রন্থ আল কুরআন) কদরের রাত্রিতে অবতীর্ণ করেছি।

লাইলাতুল কদরের যাবতীয় কাজের ইঙ্গিত দিয়ে এ রজনীর অপার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে অন্যত্র ইরশাদ করেছেন, ‘হামীম! শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের, নিশ্চয়ই আমি তা (কোরআন) এক মুবারকময় রজনীতে অবতীর্ণ করেছি, নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়।’ (সূরা আদদুখান, আয়াত: ) কদরের রাতে অজস্র ধারায় আল্লাহর খাস রহমত বর্ষিত হয়। এ রাতে ফেরেশতারা ও তাঁদের নেতা হযরত জিবরাঈল (.) পৃথিবীতে অবতরণ করে ইবাদতরত সব মানুষের জন্য বিশেষভাবে দোয়া করতে থাকেন। এ রজনীতে এত অধিক সংখ্যক রহমতের ফেরেশতা পৃথিবীতে অবতরণ করেন যে সকাল না হওয়া পর্যন্ত এক অনন্য শান্তি বিরাজ করতে থাকে। হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে, ‘শবে কদরে হযরত জিবরাঈল (.) ফেরেশতাদের বিরাট এক দল নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং যত নারীপুরুষ নামাজরত অথবা জিকিরে মশগুল থাকে তাঁদের জন্য রহমতের দোয়া করেন।’ (মাযহারি)

সর্বমানবের জীবন দর্শনস্বরূপ আল কুরআন রমজান মাসের এই দিনে নাজিলের কারণে তার গুরুত্ব ও তাৎপর্য বেড়ে গেছে বহুগুণ। আর এই রাত্রির মহিমা সম্পর্কে সেই একই সূরায় বলা হয়েছে, ‘লাইলাতুল কাদরি খায়রুম মিন আলফি শাহর’ অর্থাৎ কদরের রাত্রি সহস্র মাস হতে উত্তম। এই রাত্রির ইবাদতবন্দেগি হাজার রাত্রির ইবাদতের সমান যার মাধ্যমে উম্মতে মুহাম্মদীর শ্রেষ্ঠত্ব ও অপরিসীম মর্যাদারই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এইজন্য বলা হয়, লাইলাতুল কদর উম্মতে মুহাম্মদীর (.) জন্য আল্লাহ তায়ালার এক বিশেষ নিয়ামত। এই রাতে অজস্র ধারায় আল্লাহর খাস রহমত বর্ষিত হয়। এই রাতে ফেরেশতারা ও তাদের নেতা হযরত জিবরাইল () পৃথিবীতে অবতরণ করে সকাল অবধি ইবাদতরত সব মানুষের জন্য বিশেষভাবে দোয়া করতে থাকেন। তাই এই রাত সম্পর্কে নবী করীম () বলেন, ‘যে ব্যক্তি এই রাত্রিটি ইবাদতবন্দেগির মাধ্যমে অতিবাহিত করবে, আল্লাহ তার জীবনের সব গুনাহখাতা মাফ করে দিবেন’ (বুখারি)

লাইলাতুল কদরের ফজিলত অপরিসীম। হাজার মাস ইবাদতে যে সওয়াব হয়, কদরের এক রাতের ইবাদত তার চেয়ে উত্তম। এ রজনীতে যে বা যারা আল্লাহর আরাধনায় মুহ্যমান থাকবে, মহান স্রষ্টা তাঁর ওপর থেকে দোজখের আগুন হারাম করে দেবেন। রাসুলুল্লাহ (.) ইরশাদ করেছেন, ‘সমস্ত রজনী আল্লাহ তাআলা লাইলাতুল কদর দ্বারাই সৌন্দর্য ও মোহনীয় করে দিয়েছেন, অতএব তোমরা এ বরকতময় রজনীতে বেশি বেশি তাসবিহতাহলিল ও ইবাদতবন্দেগিতে রত থাকো।’ অন্য হাদিসে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের কবরকে আলোকিত পেতে চাইলে মহিমান্বিত লাইলাতুল কদর রাতে জেগে রাতব্যাপী ইবাদতবন্দেগিতে কাটিয়ে দাও।’ সুতরাং আল্লাহর অশেষ রহমতে আবৃত এ রাত যাতে বৃথা না যায়, সে জন্য রাতব্যাপী ইবাদতবন্দেগি, তাসবিহতাহলিল এবং অন্তরের আকুতিভরা প্রার্থনার মাধ্যমে রাহমানুর রাহিমের অসীম করুণা ও ক্ষমা ভিক্ষা করা বান্দার জন্য খুবই জরুরি।

সুতরাং মিলাদকিয়াম করা, ইবাদত বন্দেগি করার দ্বারা এ রাতে তারাবিতাহাজ্জুদসহ অধিক নফল নামাজ, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর জিকির, একাগ্রচিত্তে দোয়া এবং অতীত পাপমোচনে বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য পরিবারপরিজনকে উদ্বুদ্ধ করা উচিত।

অতএব, এই রাত্রিটি কিয়াম, তারাবিহতাহাজ্জুদসহ অধিক নফল নামাজ আদায়, পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, জিকিরআজকার, তাসবিহতাহলিল ও দরুদ শরীফ পাঠ, দানখয়রাত ইত্যাদি আমলের মাধ্যমে অতিবাহিত করা আবশ্যক। এছাড়া একাগ্রচিত্তে দোয়া এবং অতীত পাপমোচনে বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য সকলকে উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন। কেননা হযরত আয়েশা (রা) রাসুলুল্লাহ (.)কে জিজ্ঞাসা করেন, ‘হে রাসূলুল্লাহ! আমি যদি লাইলাতুল কদর পাই তখন কী করব? তিনি বললেন, তুমি বলবে : আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুওউন, তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি’ অর্থাৎ, হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল। আপনি ক্ষমা করে দিতে ভালোবাসেন। তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন।’

লাইলাতুল কদর গোটা মানবজাতির জন্য অত্যন্ত পুণ্যময় রজনী। এ রাত বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহর অশেষ রহমত, বরকত ও ক্ষমা লাভের অপার সুযোগ এনে দেয়। এ রাত হচ্ছে মহান আল্লাহর কাছে সুখ, শান্তি, ক্ষমা ও কল্যাণ প্রার্থনার এক অপূর্ব সুযোগ। এ রাতে অবতীর্ণ মানবজাতির পথপ্রদর্শক ও মুক্তির সনদ পবিত্র কোরআনের অনুপম শিক্ষাই ইসলামের অনুসারীদের সার্বিক কল্যাণ ও উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি, ইহকালীন শান্তি ও পারলৌকিক মুক্তির পথ দেখায়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের লাইলাতুল কদর সঠিকভাবে পালন করবার তাওফিক দিন এবং আমাদের নামাজরোজাকে কবুল করুন। আমিন।

LEAVE A REPLY