ফেরদৌস আরা আলীম

আর আমার মতো আদ্যিকালের বদ্যিবুড়িরা ঘুরে ফিরে সেই সেকালের সেমুই পায়েস, পোলাওকোর্মায় টেবিল সাজিয়ে বসে থাকেন নিজে একা। ছোটরা দেখে সরে যাবে, শুধু এই? ওদের দেখার চোখে চ্যানেলে চ্যানেলে কত আয়োজন ঘোরাফেরা করে, এসবে ওদের মন ভরার প্রশ্ন তো আসেই না, দেখার আনন্দও হয় না। এত বিভাজন সত্ত্বেও ঈদ তো ঈদই।

ঈদোৎসব সমাগত। রোজার ঈদের সঙ্গে খুব স্বাভাবিক, রোজার সম্পর্ক অচ্ছেদ্য। প্রতিদিনের রোজার শেষে দিনান্তে ইফতারের আনন্দ অপার। সে আনন্দ তিরিশ দিন পরে নিয়মের নতুনত্বে ধরা দেয় বা বাঁধা পড়ে ঈদের দিনের শুরুতে। এও এক আনন্দ; বছর ঘুরে যা কিনা আবার ফিরবে রমজান মাসে তিরিশ রোজার প্রতিদিনের ইফতারে। এমন আনন্দচক্রে বাঁধা মুসলমানের ধর্মীয় জীবন যাপনে ঈদোৎসব মহাআনন্দের, পরম আনন্দের। এ আনন্দ কিন্তু অকারণ নয়। এ আনন্দের সমস্তটাই ইবাদত। এতে ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ নিহিত রয়েছে। সুতরাং আল্লাহতাআলার বিধান এবং রাসূল (.) এর নির্দেশিত পথের বাইরে ঈদের আনন্দ নেই, থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। সেক্ষেত্রে ঈদ যথার্থ এবং যথাযথ আনন্দ নিয়ে আসে তাদের জন্য যারা রমজান মাসের কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করেন, করতে সক্ষম হন। ঈদের নামাজও সে কারণেই সালাতুল শুকর অর্থাৎ কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নামাজ। মূলত ঈদগাহ থেকেই দৃশ্যমান ঈদোৎসবের সূচনা। নামাজের উদ্দেশ্যে দণ্ডায়মান সারিবদ্ধ মানুষের দাঁড়িয়ে থাকায় বা রুকু সেজদায় উৎসবের পবিত্রতার যে রঙ ফোটে তার তুলনা নেই। কোলাকুলিগলাগলিতে জাগে উৎসবের আনন্দের রঙ, হৃদয়ের রঙ; মানুষ যদি সত্যিই এভাবে মিলতে পারতো!

ঈদ আমাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। ঈদুল ফিতর বা রোজার ঈদ রমজান বিচ্ছিন্ন কোনও একক দিবস নয়। রমজানের জাকাতের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালিত হলে অন্তত ঈদের দিনটিতে ঘরে ঘরে ঈদের আনন্দ বিরাজ করতো। কিন্তু ঈদের ভোর থেকেই চোখে পড়ে সাহায্যপ্রার্থী মানুষের ভীড়, হাটেবাটে সর্বত্র। আমাদের এবারের ঈদ উদযাপিত হচ্ছে দুর্যোগ কবলিত বাংলাদেশে। হাওরাঞ্চলের মানুষের আহাজারি শেষ না হতেই পাহাড়ে ভূমিধসের অবর্ণনীয় দুর্যোগের শিকার অসংখ্য মানুষ। কোনও কোনও এলাকায় আগাম বন্যার হাতছানি। খোদ বন্দর নগরীর এক বিশাল এলাকা জলজটে নাকাল। এরই মধ্যে জমজমাট ঈদের খবর আসছে ঝলমলে বিজ্ঞাপনের হাত ধরে। ঈদের শপিং এ প্রতিবেশী দেশ তো ডালভাত, দূরের বহু দেশে যাচ্ছে আমাদেরই স্বজন বন্ধুজনেরা অনেকে, পরিবারসহ এমনকি। ছুটির দিনসংখ্যা বেড়ে গেলে বাইরে যাঁরা ঈদের আনন্দ খুঁজতে যান তাঁদের সংখ্যা আরও বাড়বে নিশ্চয়ই।

ঈদের প্রধান আনন্দউপকরণ দুটি। খাবার এবং পোশাক। সারা বছর যে খাবারের বা যে পোশাকের আয়োজন সম্ভব হয় না সেটাই ঈদের জন্য তুলে রাখার কথা সবাই ভাবলে ব্যাপারটা কঠিন হতো না। কিন্তু এখন খাবারে এবং পোশাকে মৌসুমে মৌসুমে ভিন্ন রুচি, ভিন্ন স্বাদের আনন্দ ছাড়া জীবন অচল। এক্ষেত্রে ঈদের জন্য কি আর বাকী থাকে? পোশাকের জন্য এঁরা তাই ব্র্যান্ডের খোঁজ রাখেন, অনলাইন শপিং করেন। খাবারের জন্য অনেকে বড় বড় হোটেলরেস্তোরাঁর শরণাপন্ন হন। এদের ঈদের সঙ্গে দর্জিবাড়ির পোশাকের ঈদ বা ঘরের খাবারের ঈদের তুলনা হয়? অন্যদিকে দর্জিবাড়িও কি সব এক? কেউ আমরা এক দেড়শ টাকার ব্লাউজ পরি, কেউ হাজার দেড় হাজারের দর্জি বাড়ি খোঁজেন। রান্নার ক্ষেত্রেও কমবয়সী অত্যুৎসাহী মায়েরা আছেন, ত্বরিৎগতিতে কেকপেস্ট্রি পিৎজায় বা চিকেন মাটনের নতুন নতুন পদে চমকে দিচ্ছেন পরিবারের সদস্যদের, সমমনা বন্ধু স্বজনদের। আর আমার মতো আদ্যিকালের বদ্যিবুড়িরা ঘুরে ফিরে সেই সেকালের সেমুই পায়েস, পোলাওকোর্মায় টেবিল সাজিয়ে বসে থাকেন নিজে একা। ছোটরা দেখে সরে যাবে, শুধু এই? ওদের দেখার চোখে চ্যানেলে চ্যানেলে কত আয়োজন ঘোরাফেরা করে, এসবে ওদের মন ভরার প্রশ্ন তো আসেই না, দেখার আনন্দও হয় না। এত বিভাজন সত্ত্বেও ঈদ তো ঈদই। অন্তত শিশুদের মনে তো ঈদের আনন্দ, নির্ভেজাল নিরঙ্কুশ ঈদের আনন্দ থাকারই কথা। সোনালী দিনের একটা গান মনে পড়ে গেল। ‘সেই মন কোথায় তোমার/ যে মন দিয়ে তুমি আমার এ মন নিয়েছিলে/ কিছুই না দিয়ে অনেক কিছুই দিয়েছিলে সেই মন কোথায় তোমার? অমল মুখোপাধ্যায়ের এ গানের উদ্দিষ্ট মনটা আজ খুঁজছি আমাদের শিশুদের মধ্যে। কোথায় সেই শৈশব, চিরায়ত শৈশব, যে শৈশব শুধু ঈদের মধ্যেই ঈদের আনন্দ খুঁজে পায়।

গত ১ জুন ছিল আন্তর্জাতিক শিশু দিবস। এ উপলক্ষে সেভ দ্য চিলড্রেনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে বিশ্বজুড়ে ৭০ কোটি শিশু তাদের স্বাভাবিক শৈশব হারিয়ে ফেলেছে। প্রতিবছর ৮০ লক্ষ শিশু মরে যাচ্ছে। প্রতি ৬ শিশুর ১ শিশুর শিক্ষাহীন; আজ ২ কোটি ৮০ লক্ষ শিশু গৃহহীন। অকারণে আপনমনে হাতের ফুলটি দলিত মথিত করার মতো করে আমরা আমাদের শিশুদের জীবন ছিন্ন ভিন্ন করে দিচ্ছি। সেভ দ্য চিলড্রেনের সাম্প্রতিক জরিপ বলছে শহুরে শিশুরা তো বটেই গ্রামাঞ্চলেও শিশু তার চিরায়ত শৈশব হারিয়ে ফেলছে। হারিয়ে যাচ্ছে, ফুরিয়ে যাচ্ছে শিশুর শৈশবকাল। রবীন্দ্রনজরুল, শরৎবিভূতিদের সাহিত্যে শিশুদের যে প্রাণবন্ত শৈশব, খলুই ভর্তি জ্যান্ত মাছের মতো খলবল করা শৈশব আজ গল্প হয়ে গেছে।

মূলত বিশ্ব জুড়ে শৈশব হারানো বা খোয়ানোর দিক থেকে ১৭২ টি দেশের মধ্যে আমাদের অবস্থান ১৩৪ তম। দক্ষিণ এশিয়া ভারত, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা এমনকি মিয়ানমারেরও নিচে আমাদের অবস্থান। আমাদের কন্যা শিশুদের অবস্থা আরও নাজুক। এসব জরিপে গড় হিসেবের একটা ব্যাপার থাকে। সে হিসেবে যেহেতু যুদ্ধরত নাইজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা বা মালির মতো দেশও রয়েছে, রয়েছে নির্মম যুদ্ধের খেলায় আরও বহু দেশ সুতরাং সান্ত্বনার একটা সুযোগ আমাদের থাকার কথা। কিন্তু আমাদের বিরাজমান সামাজিক বাস্তবতায় সান্ত্বনার কোনও সুযোগ নেই। শিথিল পারিবারিক বন্ধনের ছত্রছায়ায় নিজেদের স্বার্থান্ধতার কারণে, নিজেদের মধ্যকার নানান বিরোধের কারণে মাবাবা যখন সন্তানের শৈশব শুধু নয়, খোদ সন্তানকেই হত্যা করছে, যখন অপরাধীরাও নিষ্পাপ শিশুদেরকেই তাদের সহজ টার্গেটে পরিণত করছে তখন শিশুরা কোথায় দাঁড়াবে? আমাদের শিশু অধিকার ফোরাম বলছে, গত পাঁচ বছরে কেবল মাবাবার হাতেই প্রাণ হারিয়েছে আমাদের ১১৭টি শিশু। সব মিলিয়ে শিশু হত্যার পরিসংখ্যান ভয়াবহ। অপহরণ, ধর্ষণ, পর্ণোগ্রাফিতে ব্যবহৃত শিশু, নবজাতকের উদ্ধারকৃত লাশ এবং নিখোঁজ শিশুদের সংখ্যানা থাক, যারা গেছে, গেছে। কিন্তু যারা আছে তাদের শৈশব ফিরিয়ে দেবার দায় কাদের? শৈশববিহীন শিশুতো সেই বিরল ব্যাধি আক্রান্ত শিশু যাকে ৮ বছর বয়সে ৮০ বছরের মতো দেখায়। আসলে শৈশবহীন শিশু বলে কিছু নেই। তার জীবনে কোনও আনন্দই থাকার কথা নয়। ঈদও নয়। তার পিঠে পাঠ্যপুস্তকের বোঝার মতো, আনন্দবিহীন শিক্ষার মতো ঈদের আনন্দ চাপিয়ে দেওয়া যাবে কি? সে তা নেবে কি? নিতে পারে কি?

আজকের তুলনায় কি গরিব, আহা কি গরিবই না ছিল আমাদের যাপিত জীবনের ছবি। কিন্তু কি অধীর আগ্রহে আমরা ভাইবোনেরা অপেক্ষা করেছি মাইল আটেক দূরের শহর থেকে আমাদের পিতা ঈদের সওদাপাতি নিয়ে ফিরবেন। এক প্রস্থ করে জামাতো হবে সবার কিন্তু সে তো যার যার। আমরা একযোগে, একমনে অপেক্ষা করতাম গ্রামাফোনের নতুন একটি রেকর্ডের জন্য। গ্রামাফোনে দম দিয়ে পিন লাগিয়ে বসে আছি। কখন নতুন রেকর্ডটা হাতে আসবে আর আমরা গান শুনবো। নতুন গান। সে আনন্দের তুলনা কোথায়? আনন্দ সেই পথে এগুলো না বলেই তো যত বিপত্তি। শিশুকে ভোলাতে চেয়েছি দামী খেলনায়, খাবারে এবং পোশাকে। খেলনা, খাবার বা পোশাক সবই পুরানো হয়, বাতিল হয় শুধু দামটা জেগে থাকে শিশু মনে। অর্থমূল্যের কাছে জীবনের অমূল্য আনন্দধন বিকিয়ে যায়।

আসুন, সহজ হই। সহজ সম্পর্ক গড়ি। পরিবারের ভেতরেবাইরে সবাই মিলে আসুন, শিশুকে তার হারানো শৈশব ফিরিয়ে দিই। ঈদোৎসব নেমে আসুক ঘরে ঘরে, শিশুর শৈশবের মতো।

LEAVE A REPLY