. মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষা পদ্ধতির নানা অসঙ্গতির বিষয়ে বার বার লিখেছি। দেশের শিক্ষার অস্থিরতার বিষয়ে সচেতনজন এবং শিক্ষাবিদদের চিন্তার কোন অন্ত নাই। ইংরেজি ‘ডমটডদ’ এর অর্থ প্রস্তুতির জন্য কোন শিক্ষার্থীকে বা ছাত্রকে পড়ানো বা শেখানো। শিক্ষাব্যবস্থার নানা সমস্যার বর্তমান সময়ে একটি বড় সমস্যা কোচিং সেন্টার। শিক্ষাবিদরা এই ব্যবস্থাকে মূল ব্যবস্থার অন্তরায় হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। কোচিং শব্দটি ব্রিটিশ পদ্ধতি অনুসরণকারী আমাদের দেশের চিহ্নিত স্কুলগুলোতে একটি বিশেষ অর্থে, সম্ভবত ব্রিটিশ শাসনের সূচনা থেকেই প্রচলিত।

সাধারণ অর্থে আমরা ছোটকাল থেকে শুনে আসছি বিদ্যালয়ের নির্বাচনী পরীক্ষার পর এসএসসি পরীক্ষার পূর্ব পর্যন্ত যে ক্লাস তা কোচিং। কোচিং ক্লাস স্কুল কর্তৃক আনুষ্ঠানিক স্বীকৃত ব্যবস্থা ছিল। যাকে শিক্ষাব্যবস্থার একটি অংশ হিসাবে বলা যেত। বর্তমান সময়ে পূর্বের কোচিং এর সংজ্ঞা বদলে গেছে। আজকাল বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা, কিংবা উচ্চতর শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক ভিত্তিতে যে আয়োজন করে থাকে তাকে কোচিং বলে। এখানেই শিক্ষাবিদদের সাথে কোচিং ব্যবস্থার দূরত্ব ও বির্তক।

এই দেশের শিক্ষা, শিক্ষক, শিক্ষাব্যবস্থাপনা, আর্থসামাজিকরাজনৈতিক অবস্থাই কোচিং সৃষ্টির মূল উৎস। এদেশ নয়, উপমহাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষতিকর এবং আত্নঘাতী কাজ হল শিক্ষাখাতে অপ্রতুল বিনিয়োগ। স্বল্প বেতনে শিক্ষক পরিকল্পিতভাবে স্কুলে অসম্পর্ণ ও দূর্বল শিক্ষা দিয়ে তাঁর বাড়িতে অর্থের বিনিময়ে ছাত্র পড়ানোর আয়োজন করে। বিদ্যালয়ে উপযুক্ত শিক্ষা না পেয়ে ছাত্ররা শিক্ষকের বাড়িতে যেতে শুরশু করে।

প্রাইভেট ব্যবস্থা পাকিস্তান আমলেও ছিল। তবে তা ছিল স্বল্প পরিসরে। এই ব্যবস্থাকে আমাদের অতীত এবং বর্তমান সমাজ কোন কালেই কোনভাবে গ্রহণ করেনি এবং সুন্দরভাবে মেনে নেয়নি। স্বাধীন দেশে পরীক্ষার কেন্দ্র গুলোতে নকলের মহোউৎসবের ফলে শিক্ষার্থী শিক্ষাগ্রহণের চেয়ে নকলকে বেশি মাত্রায় গ্রহণ করার ফলে প্রাইভেট ব্যবস্থার সামাজিক ভিত্তি গড়ে উঠে। আজ আর কোচিং ব্যবস্থা শুধু প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। এটির পরিধি আরো বিস্তৃতি লাভ করেছে। আজকের আলোচনা শিক্ষাব্যবস্থায় কোচিং এর নানা প্রভাব। এই বিষয়টি কেস স্টাডির সাহায্যে তুলে ধরতে চাই।

কেস স্টাডি :

রিফার সামনে জেএসসি পরীক্ষা। জীবনে আর সব পড়ালেখার মতো নয় এটি। তাই উৎকণ্ঠিত রিফা অনুভব করে একটু শিক্ষাগত সহায়তা আর গাইডেন্সের। বন্ধুদের সঙ্গে তাল মিলিয়েই বড় আপু রশুমা ওকে পাঠান নামকরা এক কোচিং সেন্টারে। কিন্তু একগাদা টাকার বিনিময়ে নামমাত্র কিছু মডেল টেস্ট নিয়ে দায় সারে কোচিং সেন্টার। পরে আপার তাগাদায় তৈরি করা পড়াশোনার গাইডেন্সে তৈরি হচ্ছে রিফা আগামী পরীক্ষার জন্য। কিন্তু একবুক স্বপ্ন নিয়ে যাওয়া কোচিং তাকে কি দিল? এভাবে শুধু রিফা নয় হাজারো শিক্ষার্থী প্রতারণায় পড়ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু প্রতিকারের ব্যবস্থা কি? কে বা তা করবে?

কেস স্টাডি :

সুপ্তির ২০১৬ সালে এস এস সি পরীক্ষা। বিদ্যালয়ের অন্য ১০ জন শিক্ষার্থী থেকে সে আলাদা। শিক্ষকরাও চায় এস এস সিতে ভাল ফলাফল করুক সুপ্তি। বাবামা আত্মীয় ও ব্যতিক্রম নয়। তাই একবুক ভরসা নিয়ে সুপ্তি বিদ্যালয়ের শিক্ষা ও ক্লাসের বাইরে বছরের শুরুতে পড়ছে একটি কোচিং সেন্টারে। কিন্তু আশাতীত ফলাফল পাওয়া তো যায়নি বরং আজ তার মন্তব্য সে যেন সময় ক্ষেপন করল।

কেস স্টাডি :

সুলতানার গৃহশিক্ষক বা কোচিং সেন্টারের সহায়তা নাই। কিন্তু হাজার খানেক পরিক্ষার্থীকে পেছনে ফেলে শুধু ঘরে অভিভাবকের অনুপ্রেরণায় ভর্তি পরীক্ষায় ফাস্ট হয়েছে সুলতানা। তার বন্ধুদের অনেকেই ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে কোচিং সেন্টারে যাওয়াআসা করেও ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়নি। যারা সুযোগ পায়নি তাদের অনেকের মত সুলতানা যদি কোন সহায়তা না নিয়েই ফাস্ট হতে পারে তবে কোচিং আমাদের দিল কি ?

কেস স্টাডি :

চাকরীজীবি শহীদ। একসময় নানা কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়ে ক্লাস করে বিসিএস করার জন্য ঘুরাঘুরি করেছে, ব্যাংকে টিকার জন্য শুধু কোচিং নয়কোচিং সেন্টার থেকে শিক্ষক এনে বাসায়ও পড়ালেখা করেছে। বিসিএসের আগে ক’জন বন্ধু কোচিং সেন্টারের সহায়তা নিলেও এবার শহীদ কোন কোচিং সেন্টারে ভর্তি হননি। দেখা গেল নিজ তাগিদ আর প্রচেষ্টা তাকে চাকরি পরীক্ষার বাধা পেরোতে সহায়তা করেছে এবং বিসিএস টিকে বর্তমানে সরকারি কলেজে চাকুরী করছে। তার মত কোচিং সেন্টার প্রশ্ন ফাঁস না করলে মূলত চাকুরীতে টিকানোর মত পড়ালেখা করাতে পারে না।

কোচিং সেন্টার আসলে এক ধরনের বিকল্প শিক্ষাদান পদ্ধতি। স্কুলকলেজের ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ায় সামান্য বাড়তি সাহায্যের মহৎ উদ্দেশ্যের বাক্য উচ্চারণ করে কোচিং এর যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে উচ্চতর শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা, একাডেমিক কোচিং থেকে শুরু করে এখন আইএসএসবি এমনকি চাকরির পরীক্ষায় পর্যন্ত সাফল্যের গ্যারান্টিয়ার বনে গেছে কোচিং ব্যবসায়ীরা। মূলত এই বনে যাওয়ার জন্য দারুণভাবে দায়ী আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কোন নীতি না থাকা।

আমার উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্টত বুঝা যায় যে, কোচিং ব্যবস্থা আদতে কোন উপকারে অবদান রাখতে পেরেছে কিনা জানা যায়নি তবে অপকার করেছে হাজারো শিক্ষার্থী এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। কিন্তু যারা এই ব্যবস্থা গড়ে তুলছে আমি তাদের দোষ দিচ্ছি না। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০১৫ সালে এমপিও ভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান সমূহে বছরে ৮০ দিন একাডেমিক ক্যালেন্ডার ভুক্ত ছুটি, ৪৫ দিন শিক্ষকদের ধর্মঘট, ৫২ দিন শুক্রবার, ৩টি পরীক্ষার জন্য ন্যূনতম ৪৫দিন। তাহলে পরিসংখ্যান কি দাঁড়ায় ? বছরে তাহলে কতদিন ক্লাস হয়েছে? শিক্ষার্থী বা কি শিখেছে? এই অবস্থায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক বিকল্প হিসাবে কাকে বেঁছে নিবে? অবশ্যই কোচিং সেন্টার অথবা গৃহ শিক্ষক এটাই স্বাভাবিক।

যেভাবে বলি না কেন সত্যি কথা বলতে কিস্কুলে ভাল পড়ালেখা হয়নি বলেই তো ছাত্রছাত্রীরা কোচিং করাকে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বেছে নিয়েছে। আরেকটি সত্য এই যে, প্রাইভেট পড়ার কালচার প্রথম সূচিত হয় উচ্চ শ্রেণীর মধ্য থেকেই। বরাবরই বিত্তবানরা তাদের সন্তানদের লেখাপড়া নিশ্চিত করতে বহু টাকার বিনিময়ে হলেও প্রাইভেট টিউটর রাখেন। কিন্তু যাদের বিত্তবৈভবের অভাব রয়েছে, তারা তো আর মূর্খ থাকতে পারে না। তাদেরকে টার্গেট গ্রুপ ধরে অল্প খরচে, এক সঙ্গে বেশকিছু ছাত্রছাত্রী একত্র করে একটি ব্যাচ তৈরির মাধ্যমে পড়াতে শুরু করাই ছিল মূলত কোচিং ব্যবসার শুরু। ব্যাচে পড়ানোর ধারণা থেকে উৎপত্তি হলেও আজ আর স্কুলকলেজে পাঠ অব্দি নেই তারা। দিন দিন হয়েছে তাদের বিতৃতি। আর এসব কোচিংএ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র সদ্য পাস করা বেকার যুবকরা একদু’শো টাকার বিনিময়ে ক্লাস নিয়ে থাকেন। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে শুধু পড়ুয়া কিছু মেধাবী ও স্বল্প মেধাসম্পন্ন ছাত্র দ্বারা চালিত এসব কোচিংয়ে কোন অভিজ্ঞ শিক্ষক না রেখেও উচ্চ হারে টাকা নেয়া হয়ে থাকে। তারা সপ্তাহে হয়তো ২/৩ দিন ক্লাস নেয়। একটি ক্লাসে অনেক সময় ৩০/৪০ জনের কোচিংও দেয়া হয়ে থাকে। অতএব স্কুলের ক্লাস আর কোচিংয়ের মধ্যে তেমন কোন ব্যবধানই থাকে না। পার্থক্য যা থাকে তা কেবল বেতনের হারে।

৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিক পত্রিকার নির্বাচিত চিঠিতে লেখক এমন এক কোচিং সেন্টার প্রতিষ্ঠার যে বিবরণ দিয়েছে তা পড়লে রীতিমত হতভাগ হওয়া ছাড়া আর কি বা করার থাকে? শিক্ষকরা যদি কোচিং বাদ দেয়ার বিষয়টি শুনে তাহলে কর্তৃপক্ষের বিরশুদ্ধে শুধু আন্দোলনে যাবে না বরং অন্য যা যা করা দরকার তাও করতে সামান্যতম দ্বিধা করবে বলে মনে হয়নি অভিজ্ঞতা থেকে। এহেন অবস্থার মুক্তির জন্য প্রয়োজন প্রত্যেক শিক্ষকের আন্তরিক স্বদিচ্ছা তথা শিক্ষার্থীকে পরিপূর্ণ মানুষ করার স্ব মানসিকতা। এছাড়া কোন ক্রমেই বর্তমান পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না বরং পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হবে।

সম্প্রতি সারাদেশের সকল সংবাদপত্র একটি সংবাদ দিয়েছে যে কয়েকটি কোচিং সেন্টার এমবিবিএস পরীক্ষা প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাওয়ায় যে বির্তক সৃষ্টি হয়েছিল, তার সমাপ্তি কি শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় ও শ্রমকে মূল্যায়ন করতে পারবে? তবে এই ঘটনার সাথে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের জড়িত থাকার বিষয়টি কি উড়িয়ে দেয়া যায়? তবে এ অনৈতিক কাজটির পেছনে যারা যারা আছে, তাদের মধ্যে কোচিং সেন্টার ব্যবসায়ীরা অন্যতম। নগরীর অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ওই কোচিং ব্যবসায়ীদের অবশ্যই শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত বলে মনে করেন কেউ কেউ। প্রায় একযুগ আগে থেকেই শুরশু হয়েছিল তাদের এসব অনৈতিক, অসুস্থ প্রতিযোগিতা। তাদের মাধ্যমে কতভাবে যে পরীক্ষায় দুর্নীতি চলত, তার লেটেস্ট প্রমাণ সম্ভবত এমবিবিএস এর প্রশ্নপত্র ফাঁস। আমরা এই অবস্থা থেকে মুক্তি চাই। সরকার চাইলে পারেন এই ব্যবস্থার একটি সুরাহা দিতে, জাতিকে মুক্ত করতে।

LEAVE A REPLY